পর্যালোচনা

রোহিঙ্গা সংকটে অসংলগ্ন মিয়ানমার

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

মীর আবদুল আলীম

মিয়ানমার ইস্যুতে সবাই পজেটিভ কথা বলছেন। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সারা বিশ্ব থেকে সহায়তার কথা শুনছি আমরা, কিন্তু মিয়ানমার অনড়। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। রোহিঙ্গা সংকট কাটছে না। এমন প্রশ্নই সামনে আসা স্বাভাবিক-‘যারা বলছেন তারা সবাই কি রহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তরিক?’ তা না হলে মিয়ানমার এতে শক্তি পায় কোথা থেকে? মিয়ানমারের শক্তির উৎসই বা কী? সবকিছুর পরও আশার আলো দেখছি আমরা। ৩০ জুনের রাতে নিরাপদ, স্বতঃস্ফূর্ত ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশে আসেন। একই দিন বাংলাদেশে আসেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) চেয়ারম্যান পিটার মাউরা। আসেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ পোটিয়ার ইয়াংলিসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রায় একডজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। জাতিসংঘসহ বিশ্বের চার সংস্থার প্রধানের ঢাকা সফর নিঃসন্দেহে তাৎপর্যময় ঘটনা।

সন্তুষ্টির কথা হলো সফরকারীরা রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা এবং মিয়ানমার কর্তৃক যে নির্মমতা ঘটানো হয়েছে, তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরো চাপ দেওয়ার কথা নতুন করে বলেছেন। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব গুতেরেস বলেছেন, ‘আমরা মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছি। আমাদের এই চাপ আরো বাড়াতে হবে যাতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কী করা উচিত, তা মিয়ানমার বুঝতে পারে।’ এক অর্থে বলা যায়, এটা জাতিসংঘ মহাসচিবের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর একটি সমন্বিত সফর। সন্তুষ্টির কথা হলো, তারা রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা এবং মিয়ানমার কর্তৃক যে নির্মমতা ঘটানো হয়েছে, তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। যে যাই বলি, যেভাবেই বলিÑকৌশলে, চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই একমাত্র সমাধান। এ জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা জরুরি। নতুন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, শুধু তাদের নিয়ে ভাবলেই চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বহু বছর ধরে রোহিঙ্গা নাগরিকরা এখানে এসেছেন। তাদেরও এ দেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে হবে। কাজটি অনেক কঠিন। এ ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই একমাত্র সমাধান। এসব মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে সেখানে পাঠানোই হতে পারে একমাত্র সমাধান। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বিবৃতি দিয়েছেন। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হয়েছে। এমন আলোচনা বহু বছর ধরেই হচ্ছে কিন্তু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বেদনাদায়ক এবং কষ্টের। এক বৃহৎ বাড়তি জনগোষ্ঠী লালন-পালন মোটেও সহজ নয়। বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। সমঝোতার মাধ্যমে এর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ও তাদের আশ্রয়দান কেবলই মানবিকতার নয়। মানবিকতার দোহাই দিয়ে দেশি-বিদেশি একটি কুচক্রী মহল বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে এক গভীর সংকটে। একদিকে সাম্প্রদায়িক মুসলিম ইস্যুতে তাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানের দাবি তুলছে মুসলমান সম্প্রদায়। অন্যদিকে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের পেশকৃত প্রস্তাবে চীনের ভেটোকে সমর্থন জানিয়েছে। নীরব ভূমিকায় রয়েছে অন্য মুসলিম দেশগুলো। অবশ্যই আমাদের বুঝেশুনে পা বাড়াতে হবে। ভাবতে হবে মিয়ানমার কেবলই মিয়ানমার নয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর-রাখাইনে অলআউট ক্র্যাকডাউন শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেখানে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখতে চায় না তারা। তাদের লক্ষ্যেই রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গা মুসলিমশূন্য করা। তাই করেছে। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাড়িঘরে আগুন লাগায়। নারী-শিশু নির্বিচারে হত্যা করে। চলে নির্বিচারে নারী ধর্ষণ। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, রাখাইনে লাশ আর লাশ। রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের প্রতিবাদের মুখেও গণহত্যা অব্যাহত গতিতে চলে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তাদের শক্তির উৎস কোথায়?

হত্যা, ধর্ষণ চালিয়েই ওরা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করছে। বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের জন্য বোঝা বৈকি! বাড়তি এই জনগোষ্ঠীকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ? মিয়ানমারের ৬ লাখ ৭৬ হাজার বর্গমাইল ও লোকসংখ্যা ৭ কোটি আর বাংলাদেশের আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গমাইল ও লোকসংখ্যা ১৬ কোটি। আর রোহিঙ্গারা বসতি স্থাপন করছে বাংলাদেশে। মিয়ানমার গোপনে গোপনে তার সামরিক শক্তিও বাড়াচ্ছে। মিয়ানমারের একটিভ সেনা সদস্য ৪ লাখ ৯২ হাজার ও বাংলাদেশের ৪ লাখ ১০ হাজার। মিয়ানমারের বাটল ট্যাংক ৮০০টি বাংলাদেশের ৬০০টি। মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান ১২৮টি, বাংলাদেশের ৮০টি। মিয়ানমারের এটাক হেলিকপ্টার ১০০টি ও বাংলাদেশের মাত্র ২৯টি। মিয়ানমারের যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা ৭,৪৬,০০০ আর বাংলাদেশের ৫,৪৭,০০০। মিয়ানমারের পক্ষে প্রকাশ্য ভূমিকায় রয়েছে কিছু দেশ। বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াবে কোন দেশ? এসব বিষয় আমাদের ভাবনায় আনতে হবে।

মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সরকারের যে চুক্তি হয়েছে, তা কার্যকর করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সংশ্লিষ্ট করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ সব মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের রাখাইনে নিজ বাড়িঘরে ফিরে যেতে মিয়ানমার সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। অতি সম্প্রতি জানালেন বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে অন্তর্ভুক্ত করতে এত দিন মিয়ানমার রাজি হচ্ছিল না। এখন এ ব্যাপারে তাদের সম্মতি জ্ঞাপন অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। আন্তর্জাতিক চাপ এভাবেই অব্যাহত রাখতে হবে যেন মিয়ানমার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকবেন বলে জোর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরো চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের পূর্ণ মর্যাদায় তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনে রাজনৈতিক সমাধান ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিবের এসব বক্তব্যকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, বিশ্বব্যাংক রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বাংলাদেশকে ৪৮ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার তথ্য জানিয়ে বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবেন। এতে রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণের একটি সংস্থান হবে নিশ্চয়ই; তবে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি। আমরা আশা করছি তাদের এ সফর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশাবাদে আমরা আশান্বিত হতেই পারি। আমরা চাই দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। এ জন্য বিশ্ববাসী আমাদের পাশে থাকুক-এটাই কায়মনে প্রত্যাশা করি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

newsstore13@gmail.com

"