ঈদ

উৎসব যুগে যুগে

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৮, ০০:০০

মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ

সূর্য ডোবার পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। গ্রামে-গঞ্জে, মাঠের কিনারায়, বাজারে, বাড়ির আঙিনায়, শহর-নগরে, রাস্তায়, ভবনের ছাদে সবখানে ছেলে-মেয়ে নারী-পুরুষের ভিড়। সবার চোখ পশ্চিম আকাশের দিকে। অনুসন্ধানী চোখ খুঁজে ফেরে বহু কাক্সিক্ষত সেই আনন্দের উৎস এক ফালি রুপালি চাঁদ।

ঈদুল ফিতরের বার্তার মধ্য দিয়ে অফুরান আনন্দের জোয়ার বয়ে আনে এই শাওয়ালের চাঁদ। এক মাসের কৃচ্ছ্রসাধনের পর আসা এ ঈদের খুশির কোনো তুলনা নেই। গোটা মুসলিম জাহানেই পড়ে যায় উৎসবের সাড়া। রাত পোহালেই ঘুম থেকে উঠে নতুন জামাকাপড় পরে ফিরনি-সেমাই মুখে দিয়ে ঈদগাহের পানে শিশু-কিশোর পুরুষদের ঢল নামে। নামাজ আদায়ের পর ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনের পরম টানে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও দাওয়াত-পাল্টা দাওয়াত দেওয়া চলে। সারা বছর অপেক্ষার পর ঈদুল ফিতরের এ আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। দীর্ঘ একমাস কঠোর সংযম, আত্মত্যাগ, সাধনার পর আনন্দ উচ্ছলতা, সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসার প্রতীক ও সহমর্মিতার অমøান আলোকময় দিন ঈদ। এই ঈদের আনন্দের মধ্যে আছে সামাজিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও আল্লাহর রহমতের ফল্গুধারা। বছরের এই দিনে ধনী-গরিব, বড়-ছোট ভেদাভেদ অনেকটাই মুছে যায়। অসাম্য, অন্যায়, অবিচার ভরা সমাজের বহু মানুষের মনেই উদারতা পাখা মেলে। নিঃস্ব, দুস্থ, অসহায় মানুষ কিছুটা সাহায্য সহযোগিতা পায়। কেবল ঈদের দিনেই নয়, পরের দু-এক দিনও বজায় থাকে এ আনন্দের রেশ।

আমাদের প্রিয়নবী (সা.) ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় হিজরিতে সর্বপ্রথম ঈদ উদ্যাপন করেন। উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রতিটি জাতি ও ধর্মের এক একটি বড় ধর্মীয় উৎসব আছে। তৎকালীন আরব জনগোষ্ঠীও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু তাদের উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল কিছু অনৈতিকতা ও অশ্লীলতা। রাসুল (সা.) তাই সেগুলো পরিত্যাগ করে বিশ্ব মুসলিম যাতে নির্মল পবিত্র আনন্দের মধ্যে একটি দিন অতিবাহিত করতে পারে, সে ব্যবস্থা করলেন। রাসুল (সা.) যখন মক্কা থেকে মাদিনায় হিজরত করলেন তখন মাদিনাবাসীদের মধ্যে বিশেষ দুটি দিবস ছিল, সে দিবসে তারা খেলাধুলা করত। রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন এ দুটি দিনের তাৎপর্য কী? মাদিনাবাসীরা উত্তর দিল, আমরা জাহেলি যুগ থেকে এ দুদিনে খেলাধুলা করে আসছি। তখন প্রিয়নবী (সা.) বললেন, ‘মহান রাববুল আল-আমীন এ দুদিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন তোমাদেরকে দান করেছেন। আর সেই দিন দুটি হল, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর, (আবু দাউদ : ১১৩৪)।’ রাসুল (সা.)-এর সেই ঘোষণার অব্যবহিত পর থেকে সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজে ঈদ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। তিনি ঈদ উৎসবকে মুসলমানদের প্রধান উৎসব হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

পূর্বে এখানকার মতো অত্যাধুনিক মাইকের ব্যবস্থা ছিল না। তাই কোনো ঘোষণা ঢোল পিটিয়ে লোকদের জানান হতো। ঈদের দিনে ভোরে ঢোল বা টিকারা বাজিয়ে দূর দূরান্তের মানুষদের খবর দেওয়া হতো ঈদের জামাতে শরীক হতে। ঈদের দিনে গ্রাম-গঞ্জে সাধারণ রান্না হতো গুড়ের ক্ষীর বা সুজি। তবে সুজি রান্না হতো সাধারণ গৃহে। সে সময় নতুন জামাকাপড়ের বেশি আধিক্য ছিল না। দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের পুরাতন জামাকাপড় পরিষ্কার করে ঈদের মাঠে আসতেন। নামাজা শেষে মুনাজাতের মধ্যে থাকত মুসলিম বিশ্বের কল্যাণ কামনাসহ মুসলমানদের উন্নতি কামনা, যা আজও বহমান।

এখনকার মতো তখনো ছিল ঈদকে নিয়ে মহাব্যস্ততা। ছোটবড় সবার জন্য নতুন জামাকাপড় কেনাকাটা, বিশেষ খাবারের আয়োজন করা, আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করা। ঈদের দিনে বন্ধুবান্ধব, সমবয়সীদের সঙ্গে আনন্দে উৎসবে মেতে উঠে তাদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া, শুভেচ্ছা, আশীর্বাদ, দোয়া নেওয়া ও সালাম নেওয়া-দেওয়া ইত্যাদি। ঈদের অনুষ্ঠানের সেকালের সঙ্গে একালে এসেছে বিস্তর ব্যবধান। যদিও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঠিকই আগের মতো বহাল। ঈদের দিন সকালে আপন-পর, ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে পরস্পরকে শুভেচ্ছা ও আলিঙ্গন করে এক মুসলমান অপর মুসলমান ভ্রাতার হৃদয়ের উষ্ণতা অনুভব করে। ঈদের খাবারেও এসেছে বৈচিত্রতা। কোর্মা, পোলাও, বিরানী, কাবাব, দই প্রভৃতি আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে সামর্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যতটা সম্ভব ভালো খাবার আয়োজনে সচেষ্ট হয়। যারা শহর থেকে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য পেশায় নিয়োজিত থেকে কর্মসংস্থানে ব্যস্ত, তারা ঈদের দিন উপলক্ষে ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি এসে ঈদ উৎসবকে তাৎপর্যময় করে তোলেন।

রাজধানী ঢাকা বা বড় বড় শহরের মতো মফস্বল শহরে কিংবা গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে নানান বিনোদনমাধ্যম। বর্তমান ঈদ উৎসব অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত রূপ লাভের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। আমরা ঈদ উৎসবকে পরিণত করেছি বিলাসের উৎসবে। এদিনে আমরা খাওয়ার নামে বাহুল্য খরচ করি কিংবা অপচয় করি, যা বাঞ্ছনীয় নয়। সব আনন্দেই ভারসাম্য ও পরিমিত থাকবেÑ এটাই ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু এই আনন্দ উৎসব মুহূর্তে নিজেদের ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে আমরা বিভিন্ন গর্হিত কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছি। ত্যাগের উৎসব এখন পরিণত হয়েছে ভোগের উৎসবে। আমরা যেভাবে আনন্দ উৎসবে মত্ত হয়ে উল্লাসের প্রস্তুতি নিতে থাকি, তাতে মনে হয় এটি ঈদ উৎসব নয়, বরং কোনো বিজাতীয় উৎসব। অথচ এ সময়েও একজন মুমিনের উচিত আল্লাহকে স্মরণ করা। সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা। প্রিয়নবী (সা.) ঈদের দিন বিশেষভাবে পাড়া-প্রতিবেশীর খোঁজখবর নিতেন, তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করতেন। ঈদের ময়দানে যে দান-সদ্কা সংগৃহীত হতো, তা তিনি ইনসাফ মতো বণ্টন করে দিতেন গরীব-মিসকিনদের মধ্যে। তার সময়ে সর্বস্তরের মানুষই ছিল ঈদের আনন্দে সমান অংশীদার।

ঈদুল ফিতরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, ফিতরা আদায় করা। কি পরিমাণ অর্থ সদকা বা ফিতরা দিতে হবে তার নির্দেশ কোরআন-হাদিসে রয়েছে। সুতরাং, যার কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যতীত এ পরিমাণ ধনসম্পদ থাকে, যা থেকে জাকাত দেওয়া ওয়াজিব। এমন ব্যক্তির জন্য সদকায় ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। জাকাতের পরিমাণ হলো, ‘রুপা ৫৯৫ গ্রাম (৫২.৫০ ভরি) কিংবা স্বর্ণ ৮৫ গ্রাম (৭.৫০ ভরি) অথবা স্বর্ণ বা রুপা যে কোনো একটির নিসাবের মূল্য পরিমাণ অর্থসম্পদ বা ব্যবসা সামগ্রীকে জাকাতের নিসাব বলে।’ সুতরাং কোনো ব্যক্তির কাছে মৌলিক প্রয়োজন পূরণের পর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ তার মালিকানায় থাকে এবং চন্দ্র মাসের হিসাবে এক বছর তার মালিকানায় স্থায়ী থাকে, তাহলে তার ওপর এ সম্পদ থেকে ৪০ ভাগের এক ভাগ জাকাতরূপে প্রদান করা ফরজ। সদকায় ফিতর ও জাকাতের ভেতর সামান্য পার্থক্য রয়েছে। জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ ‘মালে নামি‘ অর্থাৎ বৃদ্ধি পায় এমন সম্পদ হতে হবে। কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে এমনটি নয়। জাকাতের সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হতে হয়; কিন্তু সদকাতুল ফিতর তাৎক্ষণিক ওয়াজিব হয়। উভয়ের ক্ষেত্রে সম্পদ ঋণ থেকে মুক্ত এবং প্রয়োজন অতিরিক্ত হতে হবে। (তাহতায়ি : ৩৯৪)। অপ্রাপ্ত শিশুর সদকায় ফিতর বাবার পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব। আর যদি সন্তান নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার সম্পদ থেকে সদকায় ফিতর আদায় করতে হবে। এমনিভাবে পাগল সন্তানের সদকায় ফিতরের বিধানও। (ফতওয়ায় আলমগির : ১/১৯২)। সন্তানের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বাবার পক্ষ থেকে

সদকায় ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়। তবে বাবা

যদি সন্তানের পক্ষ হয়ে আদায় করে দেন, তাহলে তা

আদায় হয়ে যাবে। তদ্রুপ স্বামী স্ত্রীর সদকায় ফিতর আদায় করেন, তাহলেও তা হয়ে যাবে। তাই এ বিষয়ে স্ত্রী থেকে অনুমতি নিক কিংবা তার অজান্তে হোক, (দুররে মুখতার : ৩/২৮৫)। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই দান করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।

ঈদ মানুষের মনে প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে নিবৃত করে মানুষকে মিলনের পথে আকর্ষণ করে। দানে-উদারতায় প্রসারিত করে, অহংকারের ঊর্ধ্বগতিকে কমিয়ে শ্রেণিভেদের বা শ্রেণিবৈষম্যের দৃষ্টিকে সংযত করে। ঈদের শিক্ষা হলো, নিরহংকার হওয়া, প্রসারিত হওয়া, ত্যাগ ও দানের মহিমায় উত্তীর্ণ হওয়া। ঈদের আনন্দ, মাধুর্য ও উদ্দীপনা নিয়ে প্রতি বছর মুসলিম জাহানে ঈদ আসে, আসবে অনাগত কাল। আমাদের জীবনে ঈদের এ আনন্দ ব্যাপক বিস্তৃৃত হোক, হোক অর্থবহ, মানুষের জীবনে সামান্যতম সুখ-শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করুক, এই আমাদের কামনা। সবাইকে ঈদ মুবারক!

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

ahmadabdullah7860@gmail.com

"