পরিবেশ

জলবায়ু পরিবর্তন ও তার প্রভাব

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

‘ইউএনইপি অ্যাডাপ্টেশন গ্যাপ’-এর ২০১৩ সালের রিপোর্টে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বা ফলাফলের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খরচের পরিমাণ এখনকার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যাবে। আর বর্তমানে যা ধারণা করা হচ্ছে, তার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়বে ২০৫০ সাল নাগাদ। অন্যদিকে ওই রিপোর্টটিতে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ার সীমা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন মানুষের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে নামতে থাকবে খরচের হারও। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাবদাহ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ২০১৪ সালের মূল্যায়নে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বড় অংশে দাবদাহ ক্রমাগত বাড়ছে। একইভাবে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ভারী বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেড়েছে এবং কিছুদিন পরপরই বিশ্বের নানা জায়গায় একই উদাহরণ সৃষ্টি হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ফসলহানি হবে, পরিবেশ রিফিউজির সৃষ্টি হবে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-সাইকোনের প্রকোপ বেড়ে যাবে, অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হবেÑসেটি বাংলাদেশের দোষে যতটা তার চেয়ে বেশি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে। কিন্তু এই গ্রিন টেকনোলজির কনসেপ্টকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি ও টেকনোলজি অনুদান বা ধার হিসেবে আনতে হবে। অভ্যন্তরীণ স্থিতাবস্থা আনতে চাই ফান্ড। আর তা আদায়ে বিশ্ব ফোরামে নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হবে আমাদের। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাবে জলবায়ু উদ্বাস্তু তৈরি হবে এবং ফলে ঘটবে মাইগ্রেশন। কিন্তু এত মানুষের ঠাঁই হবে কোথায়? অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শিতা, মানুষের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বন উজাড় হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ আহরিত হচ্ছে নির্বিচারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব, যথাÑঝড়-ঝঞ্জা, জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বাড়ছে। সিডর ও আইলার নিষ্ঠুরতা সে কথাই প্রমাণ করে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কবলিত বাংলাদেশের এসব প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ঠেকানোর ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। দুর্যোগ ঠেকা দিতে না পারলে জলবায়ু উদ্বাস্তু তৈরি হবে এবং তা হবে বিশেষভাবে উপকূলীয় নিচু অঞ্চল এ সমস্যায় পড়বে। ভারত, বাংলাদেশ এবং বিশেষভাবে বিশ্বের দ্বীপ দেশগুলোর মানুষরা। এ তালিকায় মালদ্বীপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতো চরম হুমকির মুখে আছে।

জাতিসংঘের এক হিসাব মতে, যদি জলবায়ুর উষ্ণতা এ গতিতে বাড়তে থাকে, তাহলে সমুদ্র ও নদীর স্তর বৃদ্ধির ফলে কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে অভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত হবে। এর কুপ্রভাব পড়বে ভারত এবং বাংলাদেশে। উপরন্তু ভারত/বাংলাদেশের মতো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর জন্য বিপদ আরো বেশি। উষ্ণতার এ হার যদি অব্যাহত থাকে, তবে মোট স্থলভাগের অনেক এলাকার ভূমি বিলীন হবে। ফলে তা সীমিত ভূমির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলবে। পরোক্ষ প্রভাব আরো ব্যাপক মরুময়তা, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ রয়েছে আরো নানা আপদ। জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে। ফলে উৎপাদন কমে যাবে। অন্যদিকে রয়েছে অধিক জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ। সম্পদের সংকট আর জনসংখ্যার আধিক্য মিলে দেখা দেবে এক অপরিহার্য দুর্ভোগ। বিজ্ঞানীদের নানা গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে এটা স্পষ্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের মতো ধনী দেশগুলোর এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়তো তাদের খুব একটা গায়ে লাগবে নাী কিন্তু দরিদ্র কোনো দেশের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির কথা একবার ভেবে দেখুন! এই টাকা তাদের বার্ষিক জিডিপির একটি বড় অংশ। কাজেই তাদের অর্থনীতির ওপর কেমন প্রভাব পড়বে! আর ঘুরেফিরে সেই দেশের মানুষের ওপরই তো গিয়ে পড়ে সব ভোগান্তি। বছরের প্রায় দশ মাস গরম থাকা, শুধু গরম বললে ভুল হবে। তীব্র গরম। বছরে কোনো রকমে দুই মাস তাপমাত্রা একটু কম থাকে, যার মধ্যে এক মাসকে আমরা এখন শীতকাল বলে ধরে নিই। সেটি সাধারণত নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এক মাস পর শীত আসবে, অথচ তখনো সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে। বছরের মাঝখানে কারণে-অকারণে শুরু হয় অতিবৃষ্টি, যার ফলাফল হলো বন্যা। এ বছর যেমন শরৎকালেও ১৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এসব ঘটনাকে গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন। এসবের ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদন কমছে, বাড়ছে নিত্যনতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অসুখ-বিসুখ। সেই সঙ্গে পাল্টা দিয়ে বাড়ছে ঘরহারা মানুষের সংখ্যা। ফলাফল হিসেবে শহরাঞ্চলে বস্তিবাসীর সংখ্যাও বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আশঙ্কা জানিয়েছে, এই শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় অনেক এলাকা ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। এ কারণে ঘর হারাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। এ কারণে চলতি বছরে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়ে গেছে এবং ব্যাপক প্রাণহানি হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, কোনো জায়গায় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের পরিমাণ ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। সেখানে গত ৩০ বছরে সারা বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে এক ডিগ্রি। এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস পরিমাণ ও তীব্রতা বেড়ে গেছে। গত এক দশকে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু ও মোরা। এ ধরনের আঘাতের সংখ্যা যে বাড়বে তা বলা চলে নির্দ্বিধায়!

মানবজাতি উন্নতির চরম শিখরে অবস্থান করলেও, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা মূলত মানুষেরই সৃষ্টি। বর্তমানে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভারসাম্য রক্ষা করে না চললে এ সমস্যাই যে বর্তমান সভ্যতার ধ্বংসের কারণ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই আমাদের এখনই জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

abuafzalsaleh@gmail.com

"