গদ্যকথা

আইনের প্রতি আস্থা, মানুষের প্রতি দায়

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

ফকির ইলিয়াস

একটি রাষ্ট্রে আইনের প্রতি মানুষ শ্রদ্ধাশীল থাকবে। আর রাষ্ট্র মেটাবে মানুষের প্রতি দায়। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম শর্ত। না, মানুষ অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার হবে না। আমরা জানি, গোপন অনেক তথ্য রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে। কে চোরাকারবারি, কে দুর্নীতিবাজ সবই জানে রাষ্ট্র। মানুষ তা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। ভাবার দরকারও নেই। মানুষ শান্তি চায়। আর সে জন্য রাষ্ট্রের সমর্থন দরকার। সেই কাজটি কি সরকার করতে পারছে? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে একটি কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কথা বলি, মনে রেখে দেবেন; কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে।’ এ তথ্যগুলো কি তা মানুষ জানতে চাইছে না। জানার দরকারই বা কী?

আমরা জানি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। এর ভেতরে অনেক তথ্য ছিল। অনেক উপাত্ত ছিল। সাধারণ মানুষ তা জানতে চাননি। তারা একটি স্বাধীন দেশ চেয়েছিলেন। তারা যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। তারা বিজয়ী হয়েছিলেন। তারা কমান্ড পালন করেছেন। নীতিনির্ধারণ করেছিলেন নীতিনির্ধারকরা।

গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলা। অনেকেই বলেছেন, একরাম দাগি আসামি ছিলেন না। অনেকে বলেছেন, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে!

চট্টগ্রামে এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এটা পুরো বাংলাদেশের জন্য, বাঙালি জাতির জন্য তা একটি কলঙ্কজনক ঘটনা। নিজ সন্তানের সামনে মাকে হত্যা করা হয়েছিল। আমাদের মনে আছে, স্ত্রী বন্যা আহমেদের সামনে হত্যা করা হয়েছিল লেখক অভিজিৎ রায়কে। তার লাশ রাস্তায় পড়েছিল। মিতুর লাশও একই কায়দায় রাস্তায় ফেলে গিয়েছিল খুনিরা। অভিজিৎ হত্যা মামলার কি সুরাহা করতে পেরেছে বর্তমান সরকার! যদি পারত তাহলে তো এভাবে খুনের পর খুন হতো না।

আমরা ভুলে গেছি সাগর-রুনির কথা? আমরা ভুলে গেছি ফয়সাল আরেফীন দীপনের কথা? আরো কত নাম! কি সুরাহা করা গেল ওসব খুনের? কিছুই করা যায়নি। দেশজুড়ে চাপা ক্ষোভের আগুন।

দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। এটি সরকারের একটি বড় কাজ। কারণ, বাংলাদেশে মাদক ব্যবসা, বিক্রি ও চালানের একটি বড় রুট হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে বেশ কয়েক বছর থেকেই। সরকার মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এদের কেউ কেউ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা পড়ছে। দেশের বিশিষ্টজনরা এটাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ বলছেন। আমার কথা হচ্ছে, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হচ্ছে না কেন?

আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাদকবিরোধী অভিযান দেখি। একসঙ্গে একই চেইনের এক শ, দুই শ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিচার হয়। সাজা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এমনটি হয় না কেন?

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে কথার বিপরীতে কথা সারা দিন চলতেই পারে। কিন্তু তাতে সমাধান নেই। সমাধান হচ্ছে কাজে। সমাধান হচ্ছে অ্যাকশনে। সরকার কেন বিহীত করতে পারছে না? দেশে অন্যায় ও অবিচারের কোনো স্থান হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা একটি মাদক, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গঠন করতে চাই।’

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কর্মকা- তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকারের বাস্তবমুখী কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হয়েছে।’ তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা এ সাফল্য ধরে রাখতে চাই।’ কানাডায় এসে জি-৭ সম্মেলনেও একই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তাদের শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, তাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবাও দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আমরা সমগ্র বিশ্বকে পাশে পাইনি। কেউ আমাদের পাশে ছিল, কেউ ছিল না। কিন্তু এবার আমরা সবাইকে পাশে পেয়েছি।’ তার সব কথাই জাতির জন্য আশাজাগানিয়া। কিন্তু দেশে মানুষ আইনি বিচার নিয়ে এত হতাশ কেন? কেন তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন?

একটি দানবশক্তি দেশের মানুষের অশান্তির কারণ হচ্ছে কেন? বাংলাদেশের মানুষকে এই দানবশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কোনো গোষ্ঠীর উসকানিতে দেশের তরুণরা যেন বিপথগামী না হয়, সেটাও লক্ষ রাখতে হবে। যেসব কাজে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, এ রকম প্রতিটি কাজে সরকারের সাহায্য দরকার। এ সাহায্য নেওয়ার মানসিকতা নিয়েই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এ দেশে কারা ‘যেকোনো মূল্যে’ ক্ষমতা দখল করতে চায়Ñতা এখন আর মোটেই লুকানো কিছু নয়। সরকারকে তা মনে রেখেই এগোতে হবে। বাংলাদেশে কেন খুন তামাদি হয়ে যাচ্ছে? কত দিন লাগবে একটি রহস্য খুঁজে পেতে?

একরাম হত্যা নতুন করে ভাবার দরজা খুলে দিয়েছে। মনে রাখতে হবে, টেররিস্টরা কৌশল পাল্টাচ্ছে। এরা যদি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মিশে গিয়ে রাষ্ট্রের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়Ñতা রুখবে কে? তাই সরকার ও তার বাহিনীকেও কৌশল পাল্টাতে হবে। এ ছাড়া মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। আর যেহেতু একটি পক্ষ সরকারকে হেনস্তা করার জন্য মাঠেই আছে, তখন তা ভুলে গেলে চলে কী করে? সামনেই নির্বাচন। তাই বছরটি নানা কারণেই আলোচিত। এই আলোচিত সময়ে আওয়ামী লীগই তবে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ? এমন প্রশ্নটি আসছে, নানা কারণে।

গত চার মাসে দুবার বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। এ সময়ে দেখেছি, ব্যানার আর ফেস্টুনের রং ঝালানো দৃশ্যগুলো নির্বাচনকে ঘিরে। উদাহরণ হিসেবে সিলেটে ঝোলানো ব্যানারগুলোর কথা বলি। একটি ব্যানারে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, আবুল মাল আবদুল মুহিত, এরপর আরো কোনো নেতা, তার পর যিনি শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, সেই নেতার ছবি। ফেস্টুনে পুরো সিলসিলার ছবি। অমুক থেকে অমুকের হাত ধরে অমুক তারপরে অমুক এভাবে সাজানো। এ দৃশ্য বাংলাদেশ জুড়ে। এর মাজেজা কী? বাংলাদেশের রাজনীতি কি এমন ছিল? এত সিলসিলার নেপথ্যে কী মতলব? আমাকে খুব বেশি ভাবিয়েছে। একটি বিষয় খুব স্পষ্ট, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় আসছে। এটা আমেরিকা যেমন চাইছে, তেমনি চায় ভারতসহ অন্য মিতশক্তিগুলোওÑএটাই আপাতত আমার ধারণা। এর ব্যত্যয় হতে পারে! এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে রাজনীতি। ফলে অন্য কোনো দল বা কর্মীদের মধ্যে খুব বেশি উত্তাপ নেই। চারদিকে একটি চাপা ভাব। কেউ যেন মুখ খুলছে না! এটা কী ধরনের ভীতি, নাকি শান্তিপূর্ণ অবস্থা! অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ এগোচ্ছে। দখলের প্রতিযোগিতা, শুদ্ধ রাজনীতির পথকে রুদ্ধ করছে। মানুষ চেপে যাচ্ছে অনেক কিছু। তার পরও বলতে হয়, মানুষ শান্তি চাইছেন। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিরাপত্তা পায়। এর বেশি আর কী চাওয়ার আছে!

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

oronik@aol.com

"