ঈদ

নিরাপদে বাড়ি ফেরা

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৮, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অনেক মানুষকে ঢাকায় বসবাস করতে হয়, যাদের সবারই কোনো না কোনো গ্রামে বা মফস্বল শহরে স্থায়ী বাড়ি। ঈদ উপলক্ষে বাড়িতে গিয়ে সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করবে এটাই স্বাভাবিক এবং এই অদম্য বাসনা যেখানে সুরধারায় প্রবাহিত হওয়ার কথা, সেখানে মন থাকে এক সার্বক্ষণিক আতঙ্কে! বাড়িতে এলেই সুস্থভাবে, নিরাপদভাবে যেতে পারবে কিনা। ছয় ঘণ্টার পথ কত ঘণ্টা লাগবে? এ রকম অসংখ্য প্রশ্ন ওঠানামা করে মনে। তবু আশা থাকে যেভাবেই হোক যেতে হবে। এই হলো ঘরমুখো মানুষের ঈদে ফেরার বাস্তবতা।

এ ঈদে নাড়ির টানে মানুষ ছুটে নিজ বাড়িতে পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে। কারণ বছর শেষে আনন্দের দিনটি সবাই একসঙ্গে ভাগাভাগি করে নেবে। পাশাপাশি তাদের এ বাড়ি ফেরার জন্য বাস-ট্রেন-লঞ্চ ইত্যাদি সুনিশ্চিত ও নির্বিঘেœ যাতায়াত করতেও চাই কর্তৃপক্ষের কঠোর তত্ত্বাবধান। ঈদের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ঘরমুখো মানুষের মধ্যে বাড়ি ফেরা নিয়ে ততই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বাস ও লঞ্চের টিকিট অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। বাড়তি টাকা আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লোকাল বাস, ট্রাক এবং ট্রেনের ছাদ বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছে তারা। টার্মিনালগুলোয় শুরু হয়েছে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের টিকিট নিয়ে বাণিজ্য। এক কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে ছুটছে অন্য কাউন্টারে। প্রতিটি কাউন্টারে বাড়ছে ঘরমুখো যাত্রীদের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগই কাউন্টারের টিকিট কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। এখন ঈদের টিকিট যেন সোনার হরিণ। প্রতি বছরের মতো এ বছরও যাত্রী হয়রানি এবং ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ এবং গাড়ি সার্ভিস রাস্তায় নেমে পড়েছে। এবারের ঈদেও চলাচল করবে দক্ষিণাঞ্চলে হাজারের অধিক ফিটনেসবিহীন চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ, যা এর আগে মেরামত করা প্রায় শেষ পর্যায়ে।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ যাতায়াতের ক্ষেত্রে যাত্রীরা বিড়ম্বনার শিকার হন। বিশেষ করে ঈদ এবং কোরবানিতে বেশি হয়ে থাকে। কারণ নৌ এবং সড়কপথে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটে। যাতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় জীবন্ত মানুষের প্রাণহানি হয়ে থাকে। ঈদ, কোরবানিসহ ধর্মীয় উৎসবে বাড়ি ফেরা নাগরিক অধিকার। মানুষ যাতে বাড়ি ফিরতে যাতায়াত পথে হয়রানির শিকার না হন, সেটি দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের। এ ছাড়াও জনগণের জানমালের এবং জীবনের নিশ্চয়তাও সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। এ ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের যাতে বিড়ম্বনার শিকার হতে না হয়, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যেমন দেখার দায়িত্ব, তেমনি সরকারেরও দেখতে হবে, পাশাপাশি জনগণের দায়িত্বও কম নয়। কারণ একটি পরিবারের যেমন দায়িত্ব পরিবারের প্রধানের, তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সরকারের। এ জন্য সরকারকেই জনগণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি যাত্রী ভাড়া হতে হবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।

শুধু দুর্ঘটনার ভয় নয়, রয়েছে নৌ এবং সড়কপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি। সারা বছরই নৌ-সড়কপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি হয়ে থাকে কমবেশি। কিন্তু ঈদে হঠাৎ করেই ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যেই দেখেছি নগর, মহানগর ও মহা-সড়কে ছদ্মবেশী লোকদের আনাগোনা। যাত্রী নিরাপত্তার পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রতি বছর ঈদের মৌসুমে ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যায় বলে জানা গেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সড়কপথে যাতায়াত বেশি হলেও দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক এবং নৌপথে বেশি যাতায়াত করে থাকেন মানুষ। ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলী, সদরঘাট লঞ্চটার্মিনালসহ বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চস্টিমার এবং বাস-ট্রেনের নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথেষ্ট দুর্বল। এ কারণে নৌ এবং সড়কপথে ডাকাতি-চাঁদাবাজির ঘটনায় ঈদের ঘরমুখো মানুষরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আতঙ্ক এবং ঝুঁকি নিয়েই যাত্রীরা গন্তব্যের উদ্দেশে পাড়ি দেন। পুলিশ ও বিআইডব্লিউটির দেওয়া তথ্য মতে, গত ছয় বছরে নদীপথে অর্ধসহস্রাধিক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। গত দশ বছরে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন যাত্রী, লঞ্চ শ্রমিক, আনসারসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। এ সময় একাধিকবার পুলিশ ও আনসার সদস্যদের অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা মেঘনা নদীতে ভয়াবহ ডাকাতির শিকার হয়েছে এমভি হিমি, এমভি তিন কন্যা, এমভি মায়ের দোয়া, এমভি দুই ভাই, এমভি জুঁই এমভি শরাইল, এমভি নুরে জামান, এমভি সাগর সুলতান, এমভি শাহ পরান, এমভি মতিহার, এমভি নড়িয়াস, এমভি মিশুসহ অসংখ্য জাহাজ। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৬ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে অন্তত ৬ হাজার ৫৫ মানুষের প্রাণ। ৪ হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় এসব মানুষ মারা গেছে। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৯১৪ জন। হাত-পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন ৯২৩ জন। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫০০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬০০ জন নিহত ও ২১ হাজার ৮৫৫ জন আহত হয়েছেন, যা ২০১৬ সালের তুলনায় বেশি। এতে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ৩৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, নিহত ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং আহত ২৭ দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছে।

ঢাকা মেট্রো পুলিশের সূত্রানুযায়ী গত ১৫ বছরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭০ হাজার। এতে মারা গেছেন ১৫ হাজার মানুষ। অন্যদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ সেলের হিসাব মতে, ২০০০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪২ হাজার ৪৫৭টি। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩৩ হাজার ৪৫ জন। আহত হয়েছেন ২৯ হাজার ৭৮৭ জন। সরকারি হিসাবে প্রতিদিন মারা যান ১২ জন। বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চের মতে, বিশ্বে প্রতি বছর ১২ লাখ মানুষ দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এ হার ৪০-৫০ গুণ বেশি। একটি দুর্ঘটনায় যদি একটি পরিবারের একজন কর্মক্ষম লোকও মারা যান, তাহলে সেই পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো সময় পুরো পরিবারটিই পথে বসতে বাধ্য হয়।

প্রত্যেক বছরই কমবেশি নৌ-সড়ক দুর্ঘটনার কথা শুনতে বা দেখতে হয়। এমনকি তাতে আমাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন হয়তো থাকছেন। এ ধরনের সংবাদ নতুন নয়। প্রত্যেক বছরই আমরা মেঘনা পারে স্বজন হারানোর আর্তনাদ শুনতে পাই। বেশির ভাগই দুর্ঘটনার কারণ চালকের অদক্ষতা, নকশা ত্রুটি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন। আজ পর্যন্ত কোনো চালক কিংবা মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তদন্ত কমিটির তদন্ত শেষ হতে না হতেই একটি মহল বিষয়টি ধামাচাপা দেয়। আর সরকারকে এতে তেমন মাথা ঘামাতে দেখা যাচ্ছে না। যেকোনো ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিক তদন্ত কমিটির নামে আইওয়াশ করে দায়সারাভাবে দায়িত্ব শেষ করেন। নৌপথে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ও লাখ লাখ টন পণ্য পরিবহন হলেও আজও গড়ে ওঠেনি আধুনিক নৌপরিবহনব্যবস্থা। সারা দেশে প্রায় ২০ হাজারের মতো নৌযান চলাচল করলেও বেআইনিভাবে চলাচলরত নৌযানের সংখ্যা অন্তত আট থেকে সাড়ে আট হাজার। ফলে নৌরুটে যাত্রীরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। তাই এ মুহূর্তে বাংলাদেশে দরকার নৌসড়ক পথের একটি নিয়মতান্ত্রিক আইনিব্যবস্থা। যার মাধ্যমে শুধু জরিমানা নয়, বরং ঘটনাস্থলেই বিচার বাস্তবায়ন হবে। এতে কিছুটা হলেও নৌ এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। এ ছাড়া সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও সচেতন হতে হবে, হতে হবে দায়িত্ববান মানুষ।

আমরা যা লিখি বা বলি তা মনে হয় কখনোই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে যায় না। যদি যেত তাহলে হয়তো এমন বুকফাটা কান্না, লাশের মিছিল এবং স্বজনদের আহাজারি আমাদের দেখতে হতো না। কিন্তু কে শোনে কার কান্না বা ব্যথা। আসলে যার স্বজন চলে যায়, সেই কেবল হারানোর যন্ত্রণা বুঝতে পারেন। সত্যি কথা বলতে আমরা যে স্তরেরই হই না কেন, আমাদের দায়িত্বের কাছে কারোরই দায়বদ্ধতা নেই বলেই এত দুর্ঘটনা। আমাদের সব ক্ষেত্রে দায়িত্বে গাফিলতির ভাব থেকেই যাচ্ছে। সরকারের একার পক্ষে কোনো কিছুই মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। নিজ নিজ দায়িত্ববোধ থেকে আমাদের এসব দুর্ঘটনা রোধে এবং যাতে না হয়, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসা উচিত। এ ক্ষেত্রে আমাদের স্বভাব ও মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক

msi.khokonp@gmail.com

 

"