বিশ্লেষণ

মিয়ানমারের চুক্তি ও বাস্তব প্রেক্ষিত

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৮, ০০:০০

মো. মাঈন উদ্দিন

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এত ক্ষুদ্র ভূখ-ের দেশে এত এত মানুষের জীবনপ্রবাহ সত্যিই কঠিন। তদুপরি আমরা আমাদের মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। শুধু তাই নয়, স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দিতে যখন আমরা অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছি, তখনই এক দুঃস্বপ্ন আমাদের পেছন থেকে টেনে ধরতে চাচ্ছে। গত বছরের শেষের দিকে মিয়ানমার সেনাদের নিপীড়নের মুখে বাঁধভাঙা বানের স্রোতের মধ্যে দলে দলে রোহিঙ্গা মুসলিমরা এ দেশে তাদের জীবন বাঁচাতে আসতে থাকে। আমরাও আমাদের হৃদয় দুয়ার খোলে দিয়েছি এসব অসহায় মানুষের জন্য। আশ্রয় ও খাবার দিয়ে তাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছি। তাদের দেশের লাখ লাখ জনগণ এ দেশে ঠেলে দিয়েছে উপরন্তু মিয়ানমার সেনারা আমাদের বিভিন্ন উসকানি দিয়েছে সীমান্তে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে। যাতে বাংলাদেশকে দোষারোপ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ চতুরতার পরিচয় দিয়েছে। অসীম ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। কিন্তু এর পর যা হয়েছে তা মিয়ানমারের স্বভাবজাত স্বভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আশার বেলুন ফুলিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। একরোখা, একঘরে, বর্বর মিয়ানমার আন্তর্জাতিক বিশ্বের চাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে এগুলো করেছে শুধু। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনের নামে তারা করেছে সময়ক্ষেপণ।

গত ৬ জুন বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে একটি আশার খবর পাওয়া গেল। রাখাইনে সেনা নিপীড়ন ও নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘের সঙ্গে চুক্তি করেছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে এ সমঝোতা চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এত দিন ধরে দেশটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে তীব্র অনীহা প্রকাশ করে আসছিল। এমনকি মিয়ানমারের ডি-ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চিও রাখাইন সংকটে জাতিসংঘের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই বলে জানান। জানা যায়, চুক্তিটিকে ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক এবং মানবিক সমন্বয়কারী নাট ওসৎবি। এই সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে অনেক কাজ হবে এবং সেই কাজগুলোকে অবমূল্যায়ন করা উচিত হবে না জানিয়ে ওসৎবি বলেন, আমরা আনুমানিক সাত লাখ রোহিঙ্গার ব্যাপারে কথা বলেছি। যারা শুধু মিয়ানমারে ফিরবেই না বরং সম্পূর্ণ নিরাপত্তা পাবে। তারা মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পর সামাজিক পরিচয় এবং সব কাজে যোগ দিতে পারবে। একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে।

জাতিসংঘ বলছে, এই চুক্তির ফলে শরণার্থী এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলো রাখাইনে প্রবেশের অনুমতি পাবে এবং রাখাইনের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারবে। এ ছাড়া সঠিক তথ্য সরবরাহ করা এবং এসব সংস্থা রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য রাখাইন উপযুক্ত কি নাÑসে বিষয়েও সিদ্ধান্ত দিতে পারবে। এই হলো চুক্তি করা দুই পক্ষের কথা ও আশা। তবে বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তারা এ বিষয়ে মিয়ানমারের দৃঢ় অঙ্গীকারের অভাব এবং সংখ্যালঘুদের ওপর কয়েক দশকের আগ্রাসনকে দায়ী করেছেন। এ ছাড়া ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার যে আইন করা হয়েছেÑরোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরাতে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলেও মনে করছেন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বার্মা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক কিউ উইন। তিনি বলেন, বার্মিজ সরকার কি গ্যারান্টি দিতে পারে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত আসার পর আবার একই সমস্যার মুখোমুখি হবে না? এ মানবাধিকারকর্মী ব্রিটিশ গণমাধ্যম টাইমের কাছে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে এই চুক্তিতে সই করেছে মিয়ানমার। কিন্তু তারা এটি কখনোই রক্ষা করবে না। এর আগে গত নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করে মিয়ানমার। তবে পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের নামে নানা ছলছুতোর আশ্রয় নেয় দেশটি। বিশ্লেষকরা অভিযোগ করে আসছেন, মিয়ানমারের শর্তানুযায়ী বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই মিয়ানমারে ফেরার অনুমতি পেতে ব্যর্থ হবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গারাও রাখাইনে তাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের ভীতি এবং নিরাপত্তার অভাবের কথা জানায়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার। দেশটির সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে চার দশক ধরে পাশের বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যের একটি নিরাপত্তাচৌকিতে কথিত আরসার হামলার অভিযোগ তুলে সেনা অভিযানের নামে যে নৃশংসতা শুরু করে, তাকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার-বিষয়ক কমিশন জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সমস্ত অভিযোগই স্বভাবজাতভাবে অস্বীকার করে আসছে।

এখন কথা হলো, গত ৬ জুন জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমার যে চুক্তি করেছে, এ চুক্তির বাস্তবায়ন করতে এলেই কী মিয়ানমার আন্তরিকÑএ বিষয়ে অনেকের মতো আমিও গভীর সন্দিহান। অনেকের মতো আমারও ধারণা, আন্তর্জাতিক চাপ থেকে নিজের গা বাঁচাতে অনুরোধের ঢেঁকি গিলেছে মিয়ানমার। এত এত অবিশ্বাস, সন্দেহ, উদ্বিগ্নতা সত্ত্বেও আমরা আশা করি, মিয়ানমারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ভালোবাসা নামক মানস-পাপড়ি ডানা মেলুক। কথার সঙ্গে কাজের মিল ঘটুক। জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমার সম্প্রতি সইকরা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করুক মিয়ানমার। রোহিঙ্গা নামক অবহেলিত জনগোষ্ঠী ফিরে পাক তাদের ভিটা-বাড়ি, মান-ইজ্জত। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলুক আগত ও অনাগত রোহিঙ্গা শিশুটি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

moin412902@gmail.com

"