বোধ

মানুষ মানুষের জন্য

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

কবি গোলাম মোস্তফার গ্রাম মনোহরপুর। ২০০০ সালে এই গ্রামের কৃষক বাবুলের স্কুলপড়ুয়া ছেলে আলী হঠাৎ করে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তারপর রক্তের অভাবে মারা যায় ছেলেটি। এরপর মনোহরপুর কবি গোলাম মোস্তফা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজ খান নুন, অধ্যাপক হাবিবুল ইসলাম, ইউপি মেম্বার রাশিদুল হাসান ও আনোয়ার হোসেন মিলে সিদ্ধান্ত নেন গ্রামে ব্লাড ব্যাংক গড়ে তোলা হবে। প্রথমে ৫০ জনের রক্ত পরীক্ষা করে গ্রুপ নির্ধারণের পর তাদের এ ব্যাংকের সদস্য করা হয়। কারো রক্তের প্রয়োজন হলেই ওই ডোনাররা রক্তদান করতেন। আস্তে আস্তে বিষয়টি প্রচার পায়। বাড়তে থাকে ডোনারের সংখ্যা। মনোহরপুর ছাড়াও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও এই ব্লাড ব্যাংকের সদস্য হন। ইউপি মেম্বার রাশেদুল হাসান এই ব্যাংক পরিচালনা করেন। তিনিই রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে ডোনার নির্ধারণ করেন। শৈলকুপা ছাড়াও ঝিনাইদহ, ঢাকাসহ দেশের বেশ কটি স্থানে তাদের ডোনার আছেন। প্রয়োজনে তারা সেখান থেকেও রক্তদান করেন। ০১৭১৬৮৭৪৬৭০ নম্বরে দেশের যেকোনো স্থান থেকে ফোন করলেই ওই ব্যাংকের ব্লাড ডোনার মিলবে। শহরে আরো একটি ব্লাড ডোনার গ্রুপের ২০০ সদস্য একই পন্থায় মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে বিনামূল্যে রক্তদান করেন। তবে এ ব্যাংকের কোনো নাম নেই, প্রচার-প্রচারণাও নেই। ২০০৪ সালে দন্তচিকিৎসক আমিরুল ইসলাম ও অধ্যাপক স্বপন বাগচী যৌথভাবে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দুই শতাধিক। রক্তের প্রয়োজনে খবর পেলেই হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ছুটে গিয়ে বিনামূল্যে রক্ত দিয়ে আসেন ডোনাররা। এ ব্যাংকটি পরিচালনা করেন ডা. আমিরুল ইসলাম ও স্বপন বাগচী। রক্তের প্রয়োজনে ০১৭১৬৭৪৫০৭ ও ০১৭২১৯৫১৬৬৮ নম্বরে ফোন করলে অথবা মিঠু ডেন্টাল, টিঅ্যান্ডটি রোডে এলেই রক্তের ডোনার মিলবে। এই ব্লাড ব্যাংক দুটিতে ডোনারদের ব্লাড গ্রুপের সার্টিফিকেটগুলো বান্ডিল করে বাঁধা আছে। ডোনারের নাম, ঠিকানা, রক্তের গ্রুপ ও ফোন নম্বর রেজিস্ট্রার করা আছে। রক্তের প্রয়োজনে রেজিস্ট্রার থেকে ডোনার বাছাই করা হয়। শৈলকুপা, ঝিনাইদহের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বলে রাখা আছে রক্তের প্রয়োজনে তাদের খবর দিতে।

আর্তমানবতার সেবায় মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে রক্ত দিতে হাসপাতাল বা ক্লিনিক, এমনকি দেশের যেকোনো স্থানে ছুটে যান ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দুটি ব্লাড ব্যাংকের পাঁচ শতাধিক ব্লাড ডোনার। তারা নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন এই অভিনব ব্লাড ব্যাংক। এই ব্লাড ব্যাংকের রক্ত কোনো ব্যাগে ভরে রাখা হয় না। রক্ত থাকে ডোনারের শরীরে, প্রয়োজন পড়লেই তারা স্থানীয় হাসপাতাল, ক্লিনিক বা দেশের যেকোনো স্থানে গিয়ে রক্তদান করেন। বিনিময়ে কোনো অর্থ নেন না ডোনাররা! এক প্রকার নীরবেই দীর্ঘদিন ধরে আর্তমানবতার সেবা করে যাচ্ছেন এই ব্যাংকের ডোনাররা। বর্তমানে এই ব্লাড ব্যাংক দুটির সদস্য পাঁচ শতাধিক। ব্যাংক দুটির মধ্যে তিন শতাধিক সদস্যের একটির দেখভাল করে মনোহরপুর কবি গোলাম মোস্তফা ক্লাব। অপরটি দন্তচিকিৎসক আমিরুল ইসলাম ও অধ্যাপক স্বপন বাগচীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে, সেখানেও ডোনারের সংখ্যা দুই শতাধিক। মানববিক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য উদাহরণ এই ব্লাড ব্যাংকগুলো। আর যাই হোক, রক্তের অভাবে মানুষ মারা যাবে সে লক্ষ্যেই স্থানীয়ভাবে কাজ করছেন মহান ডোনাররা। মানুষকে বাঁচাতে মানুষ আর জীবনকে বাঁচাতে জীবনই হয় সহযোগী। রোগীর মুমূর্ষু অবস্থায় অসহায় স্বজনরা রক্তের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটেন। যথাসময়ে সংগ্রহ না করতে পারলে অনেক রোগীরই অকালমৃত্যু ঘটে। এমন উদাহরণ কম নেই। জীবনবোধ আর মানবিক দায়বদ্ধতায় দায়শোধের যারা অনন্য মহতী এই উদ্যোগ নিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নয় আনা মাঝপাড়া গ্রামের ভূমিহীন মানুষের কথা। এই ভূমিহীন মানুষরা কোনো মতে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা পেলেও সমাধিস্থল নিয়ে তাদের লজ্জা আর দুর্ভাবনার শেষ ছিল না। তাদের কেউ মারা গেলে পাশের কোনো গ্রামে দয়ার আশ্রয়ে দাফন করতে হতো। এ নিয়ে কখনো কটু কথাও সহ্য করতে হতো তাদের। অবশেষে ভূমিহীন এই মানুষের সমাধিস্থল নিশ্চিত করে লজ্জার থেকে মুক্ত করলেন সেই গ্রামের স্কুলশিক্ষক এটিএম আবদুল জলিল (বুলু ভাই)। মহান এই শিক্ষক তার প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের সাড়ে পাঁচ শতক জমি ভূমিহীনদের কবর দেওয়ার জন্য দান করেছেন। এই কবরস্থানে শুধু ভূমিহীনদের দাফন করা হবে। কবরস্থানের সীমানাপ্রাচীরও তিনি নিজ খরচে করে দেবেন। মানুষের সর্বোত্তম গুণ হলো মানবিক মূল্যবোধ। মানুষ হিসেবে পরস্পরের প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতা ও দায়শোধের ইমানি দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকেরই পালন করা উচিত। সমাজের সব মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অথবা স্বতন্ত্রভাবে ছোট-বড় আঙ্গিকে সামাজিক ও মানবিক কাজ করি তাহলে সমাজের কোনো মানুষকেই অমানবিক জীবনযাপন করতে হয় না। পৃথিবীর সব মানুষকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কাজেই মানবিকতার দায় আমরা কোনোভাবেই এড়াতে পারব না। তাই আমরা যেন যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে কাজ করি। অথবা আমাদের কাজ যেন কোনো না কোনোভাবে মানুষের উপকারে আসে। কেননা মানুষ মানুষের জন্যে...।

সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতিÑ এটিও একটি সমবায়ী সংগঠন। সংগঠনের একটি সংবিধান আছে। প্রতি বছর সরকার অনুমোদিত সংস্থা সংগঠনের আয়-ব্যয়ের হিসাব অডিট করে। প্রতি তিন বছর পর ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটি নির্বাচনের মাধ্যমে সংগঠনের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা হয়। এ ছাড়া প্রতি এক বছর অন্তর বার্ষিক সাধারণ সভা হয়ে থাকে। সমিতির একটি উপদেষ্টা পরিষদ রয়েছে। রয়েছে আজীবন সদস্য। সমিতির একমাত্র আয়ের উৎস সমাজের নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অনুদান। এই সমিতি আই ক্যাম্পের মাধ্যমে ৪০ হাজার রোগীকে বিনা খরচে চোখের চিকিৎসাসেবা দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অন্ধজনে দাও আলোÑএ স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৭৮ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়। ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুছ ও বেগমগঞ্জ থানার সার্কেল অফিসার তোফাজ্জল আহম্মদসহ কিছু প্রচারবিমুখ সমাজকর্মী সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য হলো এলাকার অসহায়, দুস্থ, অন্ধজনে আলো দেওয়া। দেখতে দেখতে ৩০ বছর পার করল এ সংগঠন। এ সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতি আজ সব মহলের কাছে অনুকরণীয় একটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে সোনাইমুড়ী পৌর এলাকায় সমিতির নিজস্ব ১৪৫ শতাংশ জমি ও ব্যাংকে ২৫ লাখ টাকা আমানত আছে। এটি জাতীয় সমাজকল্যাণ অধিদফতর কর্তৃক নিবন্ধীকৃত এবং বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির একটি স্থায়ী শাখা হিসেবে কাজ করছে। ৩০ বছরে এই সমিতি ৩০টি ভ্রাম্যমাণ চক্ষুশিবির আয়োজন করে প্রায় ৪০ হাজার রোগীকে চোখের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেয়। এ ছাড়া ৫ হাজার ৮৫০ জন রোগীকে বিএনএসবির সহায়তায় মূল্যবান লেন্স প্রতিস্থাপন করে। সংগঠনের খরচে ৩৫০ রোগীকে বিনামূল্যে চশমা দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনএসবিসহ বিভিন্ন হসপিটালে ৫২০ জন রোগীকে পাঠানো হয়। সমিতির পক্ষ থেকে এলাকার প্রতিবন্ধীসহ দুস্থ ও অসহায় ৩২১ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। অন্ধত্ব দূর করার জন্য মানুষকে সচেতন করে তুলতে সমিতি নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র‌্যালি, বুকলেট ও লিফলেট প্রকাশ করে আসছে। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সফলভাবে আই ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়, সেসব স্বেচ্ছাসেবকের মধ্য থেকে প্রতি বছর ১০ জনকে সনদপত্র দেওয়া হয়। সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব মো. সাহাব উল্লাহ। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালী ও দক্ষিণ কুমিল্লার ৪০ লাখ মানুষের চোখের চিকিৎসার জন্য সোনাইমুড়ীতে একটি চক্ষু হসপিটাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করছেন ৩০ বছর ধরে। এ জন্য সোনাইমুড়ী পৌর এলাকায় ১৪৫ শতাংশ জমি কেনাসহ ব্যাংকে ২৫ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা আছে। এ ছাড়া লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সঙ্গে হসপিটাল প্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে স্থায়ীভাবে চক্ষু রোগীদের সেবা দেওয়া হবে।

অন্ধজনে দাও আলো-একটি পবিত্র স্লোগান। যারা পৃথিবীর আলো দেখেনি। পৃথিবীর আলোয় রাঙাতে পারেনি নিজেদের। না দেখার কারণে যারা উপলব্ধি করতে পারেনি পৃথিবী কত সুন্দর। জীবন কত সুখের। তাদের পৃথিবীর আলোয় উদ্ভাসিত করতে এগিয়ে এসেছে মহান এই সংগঠন। ৩০ বছরে তারা কত কত মানুষকে দেখালেন মরমি পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য। কত মানুষের জীবনবোধ পাল্টে দিয়েছেন তারা। কতজন নিজেকে আয়নায় আবিষ্কার করেছেন কতভাবে। এই উদ্যোগ তুলনাহীন। শব্দের বন্ধনে এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অসম্ভব।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

writetomukul36@gmail.com

"