নিবন্ধ

গণতন্ত্র ও রাজনীতির বাস্তবতা

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জুন ২০১৮, ০০:৩৩

জি. কে. সাদিক

কোনো মতবাদ বা পক্ষ হেরে যাওয়া মানে সে মতবাদের বা পক্ষের জনপ্রিয়তা নেই বা গ্রহণযোগ্যতা নেই, বিষয়টা এমন নয়। আর পরাজিত মতবাদ বা পক্ষ একেবারেই পরিত্যায্য তাও না। কারণ জয়-পরাজয়ের অনুপাতটা ৫১:৪৯ হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে হয়ও। সে জন্যই গণতন্ত্রে বিরোধী দল বা মতের গুরুত্ব রয়েছে। ভিন্ন মতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ ও মূল্যায়ন করা বড় মানসিকতার পরিচয়। প্রত্যেক গণতন্ত্রকামী মানস মানেই পরমতসহিষ্ণু, পরমত শ্রদ্ধাকারী ও মূল্যায়নকারী। তবে গ্রহণ বা বর্জন সেটা ভিন্ন বিষয়। গণতন্ত্রে বিরোধী মত বা দল মূলত গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকার দলের সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করে দেশের কল্যাণ ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করে। এ জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী মত বিশেষ গুরুত্ব পায়। একপেষে আলোচনায় ত্রুটি ধরা পড়ে নাÑযতক্ষণ না ভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে সমালোচনাভিত্তিক ব্যাখ্যা না দেয়। ঠিক এ কাজটাই করে থাকে বিরোধী পক্ষ বা দল। যদি বিরোধী পক্ষ বা মত বা দল বলে কিছু না থাকে, সেখানে সমালোচনা, ত্রুটি বা দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ ও সংশোধন প্রস্তাবÑ এসব প্রসঙ্গ অবান্তর। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতির শুভা হলো জনগণ ও রাজনৈতিক দল। একাধিক তথা অনেক রাজনৈতিক দল থাকবে প্রত্যেক দলের দলীয় ম্যানোফেস্টো থাকবেÑযেখানে জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ সাধনে প্রতিযোগিতা ও অধিকতর গ্রহণযোগ্যতার নিমিত্যে জনগণের সামনে পেশ করার কৌশলী প্রতিযোগিতা থাকবে। প্রত্যেক দলেরই ভিন্ন মতাদর্শ থাকবে। তবে দুটি জায়গায় তাদের ঐক্য থাকবে। দেশর ও জনগণের কল্যাণ এ দুটি বিষয় এক ও অভিন্ন। এ দুটি বিষয়কে বিভিন্নভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরে জনসংযোগ আদায়ের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে প্রত্যেক দলই সাধ্যমতো তৎপরতা চালাবে এবং চালানোর পরিবেশও থাকবে। এই যে প্রচারণা ও জনসংযোগ, এটা দলের কাজ আর জনগণ তাদের বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের ও তাদের কল্যাণের জন্য যে পক্ষকে উপযোগী মনে করবে, তাদের হাতেই ক্ষমতা তুলে দেবেন। যদি ক্ষমতা পেয়ে অব্যবহার করে, তখন জনগণই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন করে আবার ক্ষমতা কেড়েও নেবেন। গণতন্ত্রের এই যে রূপ ও পরিক্রমা, তার মূলে হলো জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। যদি বিরোধী দল, গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনমতের কোনো মূল্যায়ন না থাকে, তাহলে কীভাবে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে? আর যে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক নয়, তথা জনগণের নয়, সে রাষ্ট্রে জনমতেরই বা কী গুরুত্ব থাকতে পারে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক হতে হবে। গণতন্ত্রের শিক্ষা নিতে হবে, বুঝতে হবে ও গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। জনগণের কাছে গণতন্ত্রের শিক্ষা ও এর প্রতিক্রিয়া তথা শুভ-অশুভ দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। যার মাধ্যমে জনগণকে নিজের অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে গণতন্ত্রমনা করে তুলতে হবে। এ দায়িত্বও রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়। ওপরে যে কথাগুলো বললাম, এগুলো গণতন্ত্র সম্পর্কে একদমই প্রাথমিক ধারণা। গণতন্ত্র বিষয়টি ব্যাপক ও বৃহৎ। যার সব আয়োজন রাষ্ট্রের জনগণকেন্দ্রিক। তাই গণতন্ত্রে সমস্ত ক্ষমতার উৎস জনগণ। যারা নিজের পছন্দমতো শাসক বাছাই করেন ভোটের মাধ্যমে।

১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানি বুলেটের বিপক্ষে ব্যালটের বিপ্লব ঘটিয়েছিল। যে বিপ্লব জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশ। তাই বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে গণতন্ত্র ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতার ক্ষোভ থেকেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সৃষ্টি। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑএই চারটি বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রথম শপথ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আজ পর্যন্ত পূর্ণ গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ একটা দেশ আমরা পাইনি। জাতীয়তাবাদ নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছেÑবাঙালি নাকি বাংলাদেশি। স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র নিয়ে দেশের জনগণের সঙ্গে প্রহসন শুরু হয়েছে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম করে স্বাধীন দেশে এত পরিমাণ রক্তপাত হয়েছে, যা সাবেক পাকিস্তান আমলেও হয়নি (স্বাধীনতাযুদ্ধের হত্যাকা-ের আগে)। তথাপি এ দেশের মানুষ সমাজতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি একটা চলমান নাটক। কারণ যে বা যারাই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কথা বলে, তারাই ধর্ম নিয়ে বেশি রাজনীতি করে বা করেছে। যেসব রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাজনীতির হাল ধরে আছে, এর মধ্যে এমন একটা দল পাওয়া মুশকিল, যে দলে গণতন্ত্রের শিক্ষা আছে বা গণতন্ত্রের চর্চা হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে দলীয় প্রধান থেকে নামকাওয়াস্তে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পরস্পরের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের দেশের একদল অন্যদলের কাছে দেশবিরোধী চক্র বলে পরিচিত। যেকোনো রাজনৈতিক দলের এমন একটা জনসভা পাওয়া যাবে না, যেখানে বিরোধী পক্ষ বা পক্ষগুলোকে দেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তানের দালাল, ভারতের দালাল বা এর চেয়ে নিচু বাক্য দিয়ে ঘায়েল করতে চেষ্টার ত্রুটি করে না। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও যদি কোনো দল পাকিস্তানের দালাল বা ভারতের হিসেবেই এ দেশে রাজনীতি করে, তাহলে বলতে হয় স্বাধীনতার পক্ষ দল কোথায়? মেধার রাজনীতি বা বুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতির চর্চা যখন না থাকে, তখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অস্ত্র আর গালি ছাড়া কিছু থাকে না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর একই অবস্থা। বিরোধীপক্ষকে বুদ্ধির রাজনীতি দিয়ে কাবু করতে অপারগ হয়ে অস্ত্র আর পেশি শক্তিই শেষ ভরসা। যে যখন পায় অস্ত্র আর শক্তির জোরে বিরোধী পক্ষ দমন করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বক্ষমতার মালিক জনগণ নীরব দর্শক। কারণ দেশে শাব্দিকভাবে গণতন্ত্র কথাটি বিরাজমান থাকলেও প্রয়োগ নেই। ক্ষমতায় যেতে ভোটের প্রয়োজন আনুপাতিক হারে খুবই কম থাকায় প্রত্যেক দলই দেশের জনগণের প্রতি চরম আস্থাহীন। যদি তা-ই না হয়, তাহলে ভোটের আগে প্রধান দলগুলো কেনই বা বিদেশে দৌড়ায় মদদের আশায়?

দেশীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক দাবি করা প্রত্যেকটি দল তাদের অযৌক্তিক, অগণতান্ত্রিক, ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য গণতন্ত্রের ও জনগণের দাবির দোহাই পাড়ে। আর এটাই হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি। প্রত্যেক দলই নিজের কাজের বৈধতার জন্য জনগণের ‘ট্যাগ’ লাগায়। যেটা তাদের মিথ্যাচার বৈ কিছু না। প্রকৃত গণতন্ত্র বনাম আমাদের দেশীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির তুলনা করলে প্রত্যেক গণতন্ত্রকামী মানুষ হতাশা ছাড়া কিছু পাবে না। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলগুলো যখন দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের শিক্ষা ও চর্চা করবে; নিরেট দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করবে; শোষক নয়, শাসকের ভূমিকা পালন করবে, তখনই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সম্ভব। আর এর জন্য চাই শিক্ষা ও বুদ্ধিভিত্তিক তথা মেধার রাজনীতি। আমি গণতন্ত্রে বিরোধী মতের গুরুত্ব নিয়ে কথাগুলো বলেছি এ জন্য, সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে সরকার মরণাভিযান চালাচ্ছে, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করে এলেন, আবার সামনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হবে। কিন্তু সংসদে পক্ষে-বিপক্ষে কোনো যুক্তি পাল্টা যুক্তি ওঠেনি, উঠবেও না। কারণ সবার জানা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

sadikiu099@gmail.com

"