ইয়াবা

অভিযান এবং অতঃপর...

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

দেশজুড়ে বাড়ছে মরণ নেশা ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন। গত কয়েক বছরে সারা দেশের গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা। তরুণ-কিশোররা পর্যন্ত ইয়াবাসক্ত হয়ে পড়েছে। ইয়াবাসক্তের কারণে ঘর ভাঙছে, বাড়ছে পরিবারে অশান্তি। ইয়াবার ভয়াল পরিণতি ও ছড়িয়ে পড়ার খবর গণমাধ্যমে নিত্যদিন প্রচারিত হয়ে আসছে। প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের টনক এত দেরিতে নড়ার কারণ কী। এখন শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে অনেক মাদক ব্যবসায়ী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তার পরও জনমনে শঙ্কা নিবারণ হচ্ছে না। সর্বসাধারণের অভিমত, মাদক প্রবেশের সব পথ সবার আগে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সে যত বড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন, তাকে শিগগির বিচারের আওতায় আনতে হবে। আর এ অভিযান সারা বছরজুড়ে চলমান থাকার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। বিলম্বিত হলেও এ অভিযান জনমনে আশা জাগিয়েছে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন দেখতে চায় দেশবাসী। যদিও দেশজুড়ে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে গেছে মাদকের ভয়াবহতা। অধিক মুনাফার লোভে এই মাদকসেবীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যবসায়ীর সংখ্যাও। খবরে জানা গেছে, একসময়ের নিঃস্ব নিদানরা মাদক ব্যবসার কারণে আজ কোটিপতি। দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক খবরটি হলো, যারা ইয়াবা প্রতিরোধে কাজ করবেন, সেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ সদস্যের অনেকেই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। খবরে প্রকাশ, আত্মীয়স্বজনরা জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতার অপব্যবহার করার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের ভয়ে অস্থির। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের তৈরি সমন্বিত তালিকা অনুযায়ী সার দেশে ইয়াবা ব্যবসায়ীর সংখ্যা ১২২৫ জন। ক্ষমতার অপব্যবহারে যারা এই মরণ নেশাকে পুঁজি করে বাণিজ্যের পসরা সাজিয়ে হাজার কোটি টাকা লুফে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের সম্ভাবনাময় তরুণসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে পারবে কি এ সরকার? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে? চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবা হলো মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। এই মাদকটি একাধারে মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্র আক্রমণ করে। এই মাদক একটি আলোকিত জীবনের সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতল থেকে ক্রমেই মৃত্যুর কাছে নিয়ে যায়। ইয়াবা এমনই এক ভয়ংকর মাদক, যার প্রভাবে মানুষ চরম হিংস্র হয়ে খুন পর্যন্ত করতে পারে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সময়ের রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশ ইয়াবাসক্ত। কেউ কেউ অন্য মাদকদ্রব্য গ্রহণ করলেও সুযোগ পেলে ইয়াবা সেবন করছে। তার চেয়েও ভয়ের খবরটি হচ্ছে ইয়াবা সেবনকারীদের বেশির ভাগের বয়স ১৪-৩০ বছরের মধ্যে, যারা তরুণপ্রাণ, যারা নতুনের জাগরণে পৃথিবীকে পাল্টে দেবে তাদের মেধা ও মননে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে জনমনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) কাজ কী তাহলে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৯৯৭ সালে ইয়াবা ট্যাবলেটের আবির্ভাব ঘটলেও ২০০০ সাল থেকে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এ দেশে ইয়াবার চালান আসতে শুরু করে। আবার বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশীয় চোরাচালানি ও প্রভাবশালীরা নিত্যনতুন কৌশল পাল্টে পাচারকারীদের দিয়ে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের গ্রামপর্যায়ে। ফলে ইয়াবাসক্ত হচ্ছে দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সব শ্রেণি-পেশার মানুষসহ যুবসমাজ।

ইয়াবা তরুণ-কিশোর প্রাণকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক জব্দের খবর আসছে। তবে নিশ্চয়ই এর বাইরেও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট হাতবদল হচ্ছে। এসব ইয়াবা মিয়ানমার সীমান্তের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে নিত্যনতুন কৌশলে ঢাকাসহ সারা দেশে পাঠাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। বিমানে, জাহাজে, লঞ্চে, ট্রেনে, বাসে থেকে এখন কুরিয়ার সার্ভিসেও ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা। পুরুষ, নারী এমনকি শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে ইয়াবা বিস্তার কাজে। বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে প্রকাশ, নাফ নদীর ১৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা ব্যবহার হচ্ছে ইয়াবা পাচারের প্রধান রুট হিসেবে। তাহলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই ১৪ কিলোমিটার নজরদারিতে রাখতে পারছে না আমাদের বিজিবি! র‌্যাব-পুলিশ সূত্র বলছে, বর্তমান সময়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন কৌশলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিচ্ছে। গাড়ির ইঞ্জিন, কম্পিউটারের সিপিইউ, মাছের পেট, বাচ্চাদের প্যাম্পার্স, জুতা, কাঁঠাল, তরমুজ, মিষ্টিকুমড়ার মধ্যে অভিনব কায়দায় ইয়াবা ঢুকিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পাচার করে। অর্থাৎ গোয়েন্দাদের গোয়েন্দাগিরিও কাজ করছে না ইয়াবাগিরির সঙ্গে। অবাক করা খবরটি হচ্ছে, ইয়াবা বহনকারীরা নিজেই জানে না তারা কার ইয়াবা বহন করছে। সাত-আটজনের হাত বদলে ইয়াবা পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। বিভিন্ন তথ্য-তালাশে দেখা গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের প্রায় ৪০টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন আসছে ইয়াবা। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ করে মাসে প্রায় ১০ কোটি ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে। কিছু চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও সিংহভাগ পাচার হচ্ছে এখন নৌ ও আকাশপথে।

একটি গল্পে যার আবিষ্কার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মান প্রেসিডেন্ট এডলফ হিটলার তার মেডিকেল চিফকে আদেশ দিলেন দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাদের যাতে ক্লান্তি না আসে এবং উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে বা বিমানের পাইলটের নিদ্রাহীনতা, মনকে উৎফুল্ল বা চাঙা রাখার জন্য একটা কিছু আবিষ্কার করতে। টানা পাঁচ মাস রসায়নবিদদের চেষ্টায় মিথাইল অ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি হয় একটি ওষুধ, যার নাম ইয়াবা। এই ইয়াবার ওষুধে হিটলারের উদ্দেশ্য সফল হয়। গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ইয়াবার আনন্দ আর উত্তেজনা আসক্ত ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে ভুলিয়ে দেয় জীবনের সব যন্ত্রণা। তারা বাস করে স্বপ্নের জগতে। মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভয়ানক মাদক সেবন করলে মনে উৎফুল্লভাব তৈরি হয়, মুড হাই হয়ে যায়। অজানা আনন্দের সম্মোহনে জীবন ধ্বংসকারী সেই ইয়াবাহ কালক্রমে ভয়ংকর মাদক হিসেবে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের দুষ্টচক্রে যুগে যুগে দেশের তরুণসমাজকে বিপথগামী করার জন্য নিষিদ্ধ, ভয়াল মাদকের আগ্রাসন ঘটায় এক শ্রেণির দুষ্কৃতকারী ও অর্থলোভী ব্যবসায়ী। সে ধারাবাহিকতায় হেরোইন- ফেনসিডিল, ডান্ডি মাদকের পর দেশে এখন বহুল আলোচিত নেশার নাম ইয়াবা। এডলফ হিটলারের পরিচয় বিশ্বের মানুষ যেভাবে জানেন, তাদের জন্য এটি হয়তোবা নতুন এবং ভয়ংকর খবর। হিটলার ধ্বংস হলেও রেখে গেছে তার বিধ্বংসী উদ্ভাবন। আমাদের জন্য ভয়ংকর খবরটি হচ্ছে ইয়াবা সম্পর্কে তরুণ ও কিশোর সমাজে একটি ভুল বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, যার কারণে কিশোর ও তরুণদের দেহ-মনে এই ভয়ানক মাদক মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। তরুণ ও কিশোরদের কাছে ইয়াবা কর্মোদ্দীপক, ক্লান্তিবিনাসী এবং যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট হিসেবে বেশ পরিচিত। অন্যপক্ষে উইকিপিডিয়া বিশ্বকোষের তথ্য মতে, ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনে পার্শ¦প্রতিক্রিয়া হেরোইনের চেয়েও মারাত্মক। নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, ফুসফুস ও হার্টের সমস্যাসহ নানা রোগ দেখা দেয়। কমে যায় স্মরণশক্তি। বৃদ্ধি পায় হতাশাজনিত নানা অপরাধপ্রবণতা। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত ইয়াবা সেবনে হার্ট-অ্যাটাক, কিডনি নষ্ট, ফুসফুসে টিউমার ও ক্যানসার হতে পারে। এটি সেবনে শান্ত ব্যক্তি হিংস ও আক্রমণাত্মক হতে পারে।

আমরা জানি, রাজধানীর একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ঐশী নামের ছাত্রী কয়েক বছর আগে ইয়াবা আসক্ত হয়ে তার পুলিশ অফিসার বাবা ও মাকে নির্মমভাবে খুন করেছে। ইয়াবাসক্তের কারণে এ রকম বহু নির্মম ঘটনা ঘটেছে। দেশে নীল, লাল ও গোলাপি রঙের তিন ধরনের ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। জানা গেছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এক বছরে প্রায় তিন কোটি পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির সূত্র মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়, তা বেচাকেনা বা হাতবদল হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ। সে হিসেবে ২৭ কোটি ইয়াবা প্রশাসনের দৃষ্টি এড়িয়ে মাদকসেবীদের হাতে পৌঁছায়! তার মানে ইয়াবা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ইয়াবা আসক্তি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা অনেক সহজ। তাহলে প্রথম সমাধান ইয়াবা আগ্রাসন থেকে দেশের যুবসমাজকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সামগ্রিক প্রতিরোধ। বলতে দ্বিধা নেই, ইয়াবার ব্যবহার সমাজে এমন পর্যায়ে চলে গেছে, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ইয়াবা প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

mukul36@gmail.com

"