বিশ্লেষণ

বোরো ধান ও খাদ্য নিরাপত্তা

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের শতকরা ৫৪ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে। তাই বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের বাজারমূল্য। গত বছর বোরো মৌসুমে মার্চ-এপ্রিল মাসে অকালবন্যায় বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় হাওড়াঞ্চলের পাকা বোরো ধান। সরকারের হিসাব মতে, ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪ হাওড়ের দুই লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির বোরো ধান ডুবে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির ফসল। তবে, কৃষকদের হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। এ ছাড়াও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ জন্য পুরো বছরই বাজারে ধান-চালের দাম ছিল বেশি। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ মৌসুমে নতুন উদ্যোমে বোরো ধানের চাষ করেছিলেন হাওড়াঞ্চলসহ সারা দেশের কৃষকরা। চারা রোপণের শুরুতে তীব্র শীতের কারণে রোপণকৃত চারা হলুদ হয়ে মারা গেলে অনেক কৃষককে মরা চারার শূন্যস্থান পূরণ করতে হয়। কিন্তু এবারও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি বোরোধান চাষিদের। দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা ও সকালে শিশির পড়ার কারণে মৌসুমের শেষ দিকে এবারও দেখা দেয় সর্বনাশা ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব। ফলে এ বছরও বোরো ফসল নিয়ে আতঙ্কে দিন অতিবাহিত করছেন হাওড়াঞ্চলসহ সারা দেশের চাষিরা। এখন পর্যন্ত সারাদেশে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ বোরো ধান কাটা হয়েছে। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও ঝড়োবাতাসে অধিকাংশ ধান গাছ হেলে পড়েছে। কোথাও কোথাও তলিয়ে গেছে পাকা ধান। এই অবস্থায় ধান কাটার জন্য শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি ও তিনবেলা খাবার দিয়েও ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তরা বলছেন, ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাবে হাওড়াঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে শুধু সুনামগঞ্জেই এবার বোরোর ফলন ১০ শতাংশ নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে স্থানীয়দের কথা, রোগটির বিস্তার ঠেকাতে না পারলে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

সিলেট বিভাগের চার জেলার হাওড়াঞ্চল এবং দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসহ ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, জামালপুর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরসহ অনেক জেলায় এ বছর কম-বেশি ব্লাস্টের প্রাদুর্ভার দেখা দিয়েছে। তবে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি সুনামগঞ্জে। গত দুবছর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশে বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ দেখা দেয়। বিশেষ করে ব্রিধান-২৮ জাতের বোরো ধানে এ রোগের আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হয়। ফলন ও গুণগত মান বিবেচনায় স্বল্প জীবনকালের ধানের এ জাতটি কৃষকের কাছে খুবই জনপ্রিয় ও সমাদৃত। তথ্য মতে, বোরো মৌসুমে দেশের আবাদি ৪১ ভাগ জমিতে এবং আউশ মৌসুমে ২৯ ভাগ জমিতে ব্রিধান-২৮ এর চাষ হয়। ব্রিধান-২৮ ছাড়াও এ বছর বিআর-২৬, ব্রিধান-২৯, ব্রিধান-৫০, ব্রিধান-৬১ ও ব্রিধান-৬৩ সহ অন্যান্য জাতের ধানেও ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা যায়। তবে উচ্চফলনশীল বোরো ধানের জাতের মধ্যে ব্রিধান-৫৮ ও ব্রিধান-৬৩ জাতে ব্লাস্ট রোগ পরিলক্ষিত হয়নি। এ ছাড়া যেসব কৃষক ভাই রোগ প্রতিরোধের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেছেন, তাদের জমিতে এ রোগের আক্রমণ কম হয়েছে। পাতা ব্লাস্ট, গিঁট ব্লাস্ট ও শীষব্লাস্টের মধ্যে নেক বা শীষব্লাস্ট ধানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এ রোগের আক্রমণে শতকরা ৮০ ভাগ। এমনকি শতভাগ পর্যন্ত ফলন নষ্ট হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এ রোগের অনকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়াতে গত দুই বছর ধানে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দিনের বেলা গরম, রাতে ঠান্ডা ও সকালে শিশির, জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহার এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম পটাশ সার ব্যবহারের কারণে এ রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ধান বিজ্ঞানীদের মতে, এ রোগ দমনে জমিতে জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। জমিতে পানি ধরে রাখতে হবে। রোগমুক্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। রোগসহনশীল জাতের চাষ করতে হবে। সুষম মাত্রায় সার প্রযোগ করতে হবে। আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া সারের প্রয়োগ সাময়িক বন্ধ রেখে প্রতি হেক্টরে ৪০০ গ্রাম ট্রুপার বা নেটিভো নামক ছত্রাকনাশক ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দুইবার স্প্রে করতে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের ‘কমোডিটি আউট লুক : ২০১৮’-তে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দফা বন্যায় গত বছর দেশের চাল উৎপাদন বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখখীন হয়। এতে চালের উৎপাদন কমে যায় ১৯ লাখ মেট্রিক টন। এর প্রভাবে দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছয় বছরের মধ্যে সর্ব নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক তুলে দেওয়াসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে; যার ফলশ্রুতিতে চালের আমদানি বেড়ে যায় ৩৬ গুণ। তবে আমদানির উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব চালের বাজারে দেখা যায়নি। ফলে প্রায় এক বছর ধরেই অস্থির ছিল দেশের চালের বাজার। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২০১৫ ও ২০১৫ সালে দেশটিতে চালের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে তিন কোটি ৪৫ লাখ ও তিন কোটি ৪৬ লাখ মেট্রিক টন। দুই দফা বন্যার কারণে গত বছর চালের উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩ কোটি ২৭ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন কমে প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ। এর আগে ২০১০ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ১৭ লাখ মেট্রিক টন। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন কোটি ৩৮ লাখ মেট্রিক টনে। এ ছাড়া ২০১২ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৪৪ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসেবে চালের উৎপাদন গত ৬ বছরের মধ্যে সর্ব নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বাড়তে থাকে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল এক কোটি ১১ লাখ মেট্রিক টন। পরের ১০ বছরে দেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে ২৮ লাখ মেট্রিক টন। ফলে সেবছর ১৯৮০-৮১ সালে দেশে চাল উৎপাদিত হয় এক কোটি ৩৯ লাখ মেট্রিক টন। একইভাবে পরবর্তী তিন বছরে চালের উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ৪০ লাখ, ৭২ লাখ ও ৬৬ লাখ মেট্রিক টন। এতে ২০১০-১১ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় তিন কোটি ১৭ লাখ মেট্রিক টনে।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসেবেও গত অর্থবছরে দেশে ধানের উৎপাদন কমেছে। সংস্থাটির মতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদিত হয় তিন কোটি ৪৭ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় তিন কোটি ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন হ্রাস পায় ৯ লাখ মেট্রিক টন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, গত বছর কয়েক মাসের ব্যবধানে দুটি বন্যার প্রভাব পড়ে চালের বাজারে। যদিও বন্যা বেশি স্থায়ী না হওয়ায় চালের ক্ষতি হয় তুলনামূলকভাবে কম। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারের মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়টি। আর এর সুযোগ নেন কিছু ব্যবসায়ী। ফলে আমদানি দ্রুত বাড়লেও চালের দামে তা কোনো প্রভাব পড়েনি। গত বছরে দেশে চালের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ মেট্রিক টন। অথচ, এর আগের বছর দেশে চাল আমদানি হয়েছিল মাত্র এক লাখ মেট্রিক টন। এ হিসেবে এক বছরে চালের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ গুণ। এর আগে ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ১৩ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছিল।

চলতি বছর বোরো মৌসুমে ১০ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এ বছর সরকারিভাবে ধানের কেজি প্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ টাকা এবং চালের কেজি প্রতি দাম দির্ধারণ কার হয়েছে ৩৮ টাকা। ২ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে এই ধান-চাল সংগ্রহ করা হবে। এবার বোরো চালের কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ৩৬ টাকা এবং ধানের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে কেজিপ্রতি ২৪ টাকা। গত বছর ২৪ টাকা কেজি দরে সাত লাখ টন ধান এবং ৩৪ টাকা কেজি দরে আট লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হয় সরকারিভাবে।

গত বছর থেকে দেখা যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বৈশাখের শুরু থেকেই সারা দেশে অতিবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার জন্য কৃষক সময় মতো বোরো ধান কেটে শুকাতে পারছেন না। অনেক সময় শিলাবৃষ্টির কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বোরো ধান। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বোরো মৌসুমে আমাদের এমন জাত উদ্ভাবন করতে হবে; যেগুলো ফাল্গুনের শেষে পাকে এবং কৃষক চৈত্র মাসের মধ্যে মাড়াই করে ও শুকিয়ে নিরাপদে গোলাজাত করতে পারেন এবং জাতগুলো হতে হবে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট

netairoy18@yahoo.com

"