উন্নয়ন

বিপ্লব ঘটাবে পদ্মা সেতু

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৮, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

স্বপ্নের পদ্মা সেতু আরো বেশি দৃশ্যমান হয়েছে চতুর্থ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে। এর ফলে সোয়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের বৃহত্তম সেতুর ৬০০ মিটার অংশ গত রোববার দৃশ্যমান হয়েছে। অচিরেই জাজিরা প্রান্তে বসানো হবে পাঁচ নম্বর স্প্যান। এখন এটিতে রঙের কাজ চলছে এবং তা শেষ হলে ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারে বসানো হবে। নতুন বসানো স্প্যানটির আগে পদ্মা সেতুর তিনটি স্প্যানে ৪৫০ মিটার দৃশ্যমান ছিল।

গত শনিবার মুন্সীগঞ্জের মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে চতুর্থ স্প্যানটি শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে নেওয়া হয়। রোববার ভোরে এটি ৪১ ও ৪২ নম্বর খুঁটির কাছাকাছি আসে। সকাল পৌনে ৭টায় স্প্যানটি পুরোপুরি খুঁটির ওপর স্থাপন করা হয়। ৪২টি স্প্যান জোড়া দিয়ে পদ্মা সেতু তৈরি করা হচ্ছে। সেতুর প্রতিটি স্প্যান খুঁটিতে তোলার পুরো কাজ সম্পন্ন হয়েছে ভাসমান ক্রেন আর প্রযুক্তির সাহায্যে। শক্তিশালী ক্রেনের সাহায্যে স্প্যানগুলো সেতুর খুঁটির কাছে আনা হয়েছে। স্প্যানটি ১৫০ মিটার লম্বা ও ১৩ মিটার প্রস্থ এবং ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের। এটি ৩ হাজার ৭০০ টন ওজনের ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে আনা হয়। স্প্যানটি জাজিরা প্রান্তে পিলারের কাছে পৌঁছতে দুই দিন সময় লেগেছে।

এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুর মূল প্রকল্পের কাজের ৫৮ শতাংশ শেষ করেছে সেতু বিভাগ। পদ্মা বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে সেতুর কাঠামো। পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহনের পাশাপাশি ট্রেনও চলবে। সেতুতে রেললাইন বসানোর জন্য ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তিও হয়েছে। দেশের বৃহত্তম এই সেতু নির্মাণ হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে রাজধানীসহ অন্য অংশের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা সাড়ে ৩ কোটি মানুষের ভাগ্যে এ সেতু আশীর্বাদ বলে বিবেচিত হবে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় স্বপ্নের এই সেতু নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু তৈরির সক্ষমতা দেখিয়ে প্রমাণ করতে চলেছি আমরাও পারি। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ইতোমধ্যে মিথ্যা বলেও প্রমাণিত হয়েছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সার্বিক যোগাযোগের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ছাড়া এই সেতুর সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষের আবেগ-আকাক্সক্ষার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সরকারের কাছে তাদের প্রাণের দাবিও। এটা সত্য, সরকারও বিভিন্ন সময় এ সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ‘পদ্মা সেতু’র মতো বৃহত্তম প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য সত্যিকার অর্থেই চ্যালেঞ্জের। কিন্তু বাংলাদেশ সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একাগ্রতা ও সদিচ্ছার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা অসংগত নয়। কেননা, নির্মাণাধীন এ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ‘বিশ্বব্যাংক’ তাদের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ফিরিয়ে নিলে শেখ হাসিনাই বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছিলেন, এখানে কোনো দুর্নীতি নেই। প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়টিও সামনে আনার চেষ্টা করছে বিশ্বব্যাংক, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই জয় হয়েছে, যার চূড়ান্ত পর্বে নিজেদের অর্থেই নির্মিত হচ্ছে বহু আকাক্সিক্ষত এই সেতু।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলায় বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্যই পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রশ্নেও গুরুত্ববহ। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে। পদ্মা সেতুর মতো বড় একটা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ ধরনের আরো বড় অবকাঠামো নির্মাণে অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ যেমন বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম সাফল্য হিসেবে পরিগণিত হবে, তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি এসব এলাকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ জীবনমানেরও পরিবর্তন ঘটবে।

পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপ্লব হবে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের কারণে কেটে যাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলার সব দৈন্যদশা। দৈর্ঘ্যরে বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং নদীর প্রশস্ততা এবং পানিপ্রবাহের তীব্রতার বিচারে বিশ্বের তৃতীয় এই সেতুই হবে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের মাইলফলক। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পর পাল্টে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের চেহারা। পদ্মার প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে রচিত হবে উন্নয়নের সেতুবন্ধ। খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের ২১ জেলা যুক্ত হবে সরাসরি সড়ক নেটওয়ার্কে। ঢাকার সঙ্গে খুলনার যাত্রাকালীন সময় বাঁচবে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। অন্যান্য জেলার সঙ্গেও সময়ের ব্যবধান কমে আসবে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। মোংলা বন্দর চলে আসবে দেশের উন্নয়নের মূলস্রোতে। চট্টগ্রাম বন্দর এবং মোংলা বন্দর গ্রথিত হবে একই সুতায়। গ্যাস-বিদ্যুৎ-রেল এই তিনে মিলে খুলনা হয়ে উঠবে প্রকৃতপক্ষেই দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানী। এমনি একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নেই পদ্মা সেতু মুখ্যত খুলনার চাবি হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।

পদ্মা সেতুর সুফলের আওতা বাড়াতে এর ওপর দিয়ে স্থাপন করা হচ্ছে রেললাইন। এর অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকা থেকে পদ্মা বহুমুখী সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায়ই এটি সম্ভব হচ্ছে। পদ্মা সেতু হয়ে রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলগুলোয় অর্থনৈতিক জোন তৈরি করা হবে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

dilipagorola@gmail.com

"