নিবন্ধ

অমৃতটুকু অবশিষ্ট থাক

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য্য

সমাজটা নষ্ট হচ্ছে। একটি সমাজ এবং তার পারিপার্শ্বিক ঘটনা যখন ক্রমাগতভাবেই নেতিবাচক দিকে ধাবিত হয়, তখন সেই দেশের সমাজ নষ্ট হওয়ার পথে ধরা যায়। এর মানে এই নয় যে, এর মধ্যে ভালো কিছুই হচ্ছে না। অনেক ভালো খবরও আসছে। কিন্তু যখন খারাপ খবরগুলো ভালো খবরের চেয়ে অধিকমাত্রায় আসতে থাকে, তখন সামাজিক ভারসামস্যহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের দেশে ডাস্টবিনে নবজাতক পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। সেই নবজাতককে হিংস্র কুকুরের দল টানাহেঁচড়া করে। আবার কোনো কোনো ভালো মানুষ তাদের নিজের সন্তানের মতো লালনপালন করে। আজব সব মানুষ এই সমাজের! নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা নিষ্পাপ প্রাণের জন্ম দেয়। তারপর লোকলজ্জার ভয়ে ডাস্টবিনে ছুড়ে মারে। ওই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো জানেও না তারা এ সমাজের কিছু কুৎসিত মানুষের লালসার শিকার। আমাদের সমাজে যেমন হরহামেশাই ডাস্টবিনে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়, আবার দেখা যায় কোনো পাগলিনী পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানসিক প্রতিবন্ধী যে বাচ্চা জন্ম দেবে, সেই মা তো পেল কিন্তু বাবার হিসাবটা দেওয়ার কেউ নেই। লোভ-লালসা থেকে এসব মানসিক ভারসাম্যহীন নারীও বাদ যায় না। শরীর সর্বস্ব সমাজে চারদিকে কেবল শরীরের জয়জয়কার। শরীর বেঁচে কতজনে পেট চলে যায় তার হিসাব কেউ রাখে না। কেউ শখে আর কেউ বাধ্য হয়ে! শরীরের প্রতিযোগিতায় নেমেছে এ সমাজ। আদর যত শরীরের আবার অত্যাচার যত সব শরীরের ওপর। এত শারীরিক ব্যস্ততায় মনের খোঁজ কেউ রাখে না। কতটা নিচে নামলে সমাজে এমন চিত্র দেখা যায়। পাপ-তাপের হিসাব তো আজ কেউ করে না। ক্ষণিকের কাম উত্তেজনায় অন্ধ মানুষ কেবল নিজের উত্তেজনা প্রশমনে ব্যস্ত। সে মানসিক প্রতিবন্ধী হোক বা শিশু হোক। তাতে কিছুই যায়, আসে না। সমাজের নষ্ট হওয়া নিয়ে এদের খুব বেশি মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু সমাজের তাকে বা তাদের নিয়ে মাথা ব্যথা আছে। কারণ তাদের কারণেই আজকে এই সমাজটা নষ্টের পথে। এখনো যেটুকু অমৃত অবশিষ্ট আছে, এভাবে চলতে থাকলে সেটুকু ফুরাতে বেশি সময় নেবে না। আমরা একটি পচে যাওয়া সমাজের বাসিন্দা হব। তখন আর কারো কোনো দায় থাকবে না, কোনো অনুশোচনা থাকবে না। তখন সবকিছু কেবল নষ্টদের অধিকারে চলে যাবে।

উন্নত দেশের বাসিন্দাদের মনমানসিকতাও উন্নত হতে হবে। সামাজিক ঘটনাগুলো আমাদের এ সাফল্যকে মøান করে দিচ্ছে। সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে সামাজিক আস্থাহীনতা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ধর্ষণ, খুন, হিংসা, লোভ, দুর্নীতি, বেকারত্ব, মাদকাসক্তের সংখ্যা, অবসন্নে ভোগা মানুষের সংখ্যা। মানুষে মানুষে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের দূরত্ব। আর এ দূরত্বের ফলে সমাজে বাড়ছে অপরাধের সংখ্যা। বিশ্বাস শব্দটিই আজ মানুষের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা আজ একজন আরেকজনকে চূড়ান্ত অবিশ^াস করি। এমনকি এ অবস্থা পরিবারের ভেতরেও। যখন পরিবারের সদস্যদের বন্ধনই হালকা হয়ে যাচ্ছে, তখন সমাজ তো নড়বড়ে হবেই। আর প্রকৃত উন্নয়ন করতে হলে সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গঠনের দিকে নজর দেওয়া আবশ্যক। মুনাফার এই যুগে আমরা সবাই সবাইকে ঠকাতে ব্যস্ত থাকি। সেই ঠকানোর প্রক্রিয়ায় আমরা প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত রয়েছি। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থান থেকে ঠকানোর চেষ্টা করছি। নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে বেশির ভাগ সময়ই ব্যস্ত। এসব করতে গিয়ে সমাজে এক সূক্ষ্ম চিড় ধরেছে। এখন আমরা চাইলেও সেই ক্ষত মুছতে পারছি না। বরং ক্রমেই সেই ক্ষত বড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে কয়েক দশক আগের সেই শান্তির জীবন, নিশ্চিন্ত জীবন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন থেকে। ব্যস্ততাই যেন নিয়তি। মানুষ কেবলই ছুটছে। যন্ত্রমানবের মতো ছুটছে। কোথায় থামবে তার কোনো ঠিকানা নেই। তাই এভাবে গড় আয় না হয় বাড়ছে, গড় আয়ুও বাড়ছে গড় শান্তির খবর কী? একদিকে বিশ্বায়নের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে উন্নতির চরম শিখরে চড়েছি, অন্যদিকে দুদ- শান্তির খোঁজে নিরন্তর ছুটে চলেছি। এই তো জীবন। পরিসংখ্যানের হিসাবে কত কিছুর ক্ষতিপূরণ খুব সহজেই হিসাব করে দেওয়া যায়।

দুই বাসের প্রতিযোগিতার চিপায় পড়ে এক হাত হারানো রাজীব মারা গেছে। রাজীব ছাড়াও এ রকম ঘটনায় এরও একজন মারা যাওয়া ছাড়াও অনেকেই হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। আসলে আমরা বাসের চিপায় না প্রগতি এবং ব্যস্ততার চিপায় পড়েছি। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশের সব স্থানেই প্রায় প্রতিদিনই বহু দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারি নানা পদক্ষেপেও এই হার কমানো যাচ্ছে না। গাড়িতে উঠলেই যেন এক ধরনের ভয়ে থাকতে হয়। আবার গাড়িতে না চড়লেও তাই। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে কখন পেছন থেকে কোন গাড়ি ধাক্কা দিয়ে যায়! অনেক কারণেই আমাদের দেশে দুর্ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে চালকদের অপ্রাপ্ত বয়স, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, গাড়ির ফিটনেস, আইন মানার প্রবণতা না থাকাসহ আরো অনেক কারণ।

পরকীয়া নামক একটা ব্যাধি সমাজের ওপর ভূতের মতো চেপে বসেছে। পরকীয়া ধ্বংস করে দিচ্ছে বহু পরিবার। এটা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে বলা যায়। ভারতীয় সিরিয়ালের কল্যাণে আর পশ্চিমা সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বাঙালি সংস্কৃতিই আমরা ভুলতে বসেছি। পরকীয়ার প্রভাবে এতটাই ভয়ংকর যে, মা তার সন্তানকে মেরে ফেলতে সামান্যতম দ্বিধা করছেন না। একই রকমভাবে বাবাও তার সন্তানকে হত্যা করছেন। পরকীয়ায় জড়িয়ে রংপুরে আইনজীবী হত্যা এবং নারায়ণগঞ্জে মায়ের পরকীয়ায় জড়িয়ে সন্তানকে হত্যাÑএসবই সমাজের পচনের ফল। সমাজ নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরাও সমাজের এই অবনতিতে শঙ্কিত। পরকীয়ায় জড়িয়ে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কখনো শিশুরা মা-বাবার এ ধরনের অনৈতিক কর্মকা-ের শিকার হচ্ছে। এটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে অনেক সময় দেখা দিচ্ছে তীব্র সন্দেহ। অতি তুচ্ছ ঘটনায় একজন আরেকজনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। সেই সন্দেহ থেকে দেখা দেয় মানসিক অশান্তি। এই মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। সন্দেহের জেরে সংসার ভেঙে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শহরে ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে। এসব ভেঙে যাওয়া পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুদের বড় হওয়ার পথে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করছে। সমাজের এই নিঃশব্দ ঘূণপোকা সমাজটাকেই খেয়ে ফেলছে।

ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে যা হচ্ছে তা আর ব্যক্তি-স্বাধীনতার পর্যায়ে থাকছে না। পরশ্রীকাতরতা সমাজে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। কোনোভাবেই এর থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রমাগত পচন ধরা সমাজের আর একটি অভিশাপের নাম ধর্ষণ। বিকারগ্রস্ত মানুষরা আমাদের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারাও মানুষ। আমাদেরই আশপাশে থাকে। তাদের বেশভূষাও ভালো। তবে তাদের কাজ সমাজের এবং জাতির জন্য কলঙ্কজনক। এ দলে এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই, যার নাম উল্লেখ করা যায় না। শিক্ষক তার মেয়েসমতুল্য ছাত্রীকে অবলীলায় ধর্ষণ করছে। তার ভেতরে কোনো পরিতাপ হচ্ছে না। এমনকি বাবার কাছেও মেয়ে নিরাপদ নয়। আর ধর্ষণের কোনো বয়সও নেই। কয়েক মাস থেকে শুরু করে সত্তর বছর। কেউ বাদ পড়ছে না। দৈনিক পত্রিকাগুলোর পাতায় পাতায় চোখ রাখলেই প্রতিদিন একাধিক ধর্ষণের খবর চোখে পড়ে। সেই সঙ্গে শিশুর চিৎকার মিশে থাকে। ওরা যেন আমাদের এ সমাজটাকে, সমাজের মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত ধিক্কার জানাচ্ছে।

সামাজিক বিশৃঙ্খলা আমাদের উন্নতির প্রধান অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক মুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন শান্তির নিশ্চয়তা। আর এ জন্য আইনই যথেষ্ট নয়। নিজেদের বিসর্জন দিতে চলা নৈতিকতাবোধকে জাগাতে হবে। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের চোখের সামনে কোনো কিছু ঘটতে দেখলে আমরা দর্শকের ভূমিকা পালন করি। খুব বেশি হলে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ভিডিও করে কষ্ট করে ফেসবুকে পোস্ট করি। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু ভেবে দেখি না আজ যেটা অন্যের সঙ্গে ঘটছে, কাল তা আমার সঙ্গেও ঘটতে পারে। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাওয়ার আগেই সমাজটাকে টেনে তুলতে হবে এবং তা আমাদেরই করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

"