বিশ্লেষণ

জন্ম নিচ্ছে অপুষ্ট শিশু

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

সরকারি-বেসরকারি তথ্য সুবিধার অপ্রতুলতার জন্য ৯০ শতাংশের বেশি অপুষ্ট অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে মায়েদের পুষ্টি জ্ঞানের অভাবে। ছোট্ট শিশুটি বড় হয়ে সমাজ ও দেশের দিশারি হবে। বিশেষ করে মায়ের চোখে থাকে এক অনাগত স্বপ্ন। তার সন্তান বড় হবে। মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে। দুর্দিনে সংসারে হাল ধরবেÑএ প্রত্যাশা মা-বাবা মাত্রই পোষণ করেন। কিন্তু আমাদের দেশের মায়েদের পুষ্টিজ্ঞানের অভাব ও অভিভাবকদের অর্থনৈতিক দৈন্যতার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতার জন্য ৯০ শতাংশের বেশি শিশু অপুষ্ট অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। অপুষ্টি হচ্ছে সাধারণত অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ এবং রোগ সংক্রমণের সম্মিলিত কাল। বয়স অনুযায়ী শিশুদের ওজন ও উচ্চতা যতটা হওয়া উচিত, অপুষ্টিগ্রস্ত শিশুদের ক্ষেত্রে তা অপেক্ষাকৃত কম হয়ে থাকে। কোনো জনসংখ্যার তুলনা করা যেতে পারে। ওজন ও উচ্চতা পরিমাণ হচ্ছে জনসংখ্যার অপুষ্টি মাত্রা নিরূপণের সবচেয়ে সাধারণ উপায়। বিশ্বে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অপুষ্টিজনিত মৃত্যু। তা ছাড়াও ডায়রিয়া, নিউমিনিয়া, হাম এবং ম্যালেরিয়া আক্রান্ত শিশু অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে। অপরিমিত খাদ্যভ্যাসের মধ্যে রয়েছে শিশুকে অপর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো, শিশুর অপর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য প্রদান এবং শিশুর পুষ্টি সাধনে সম্যক ধারণার অভাব। এসব কারণে শিশুরা মারাত্মক রোগগ্রস্ত হয়। এরপর রয়েছে গ্রামের মানুষের কুসংস্কার ও প্রশিক্ষণহীন দাইয়ের মাধ্যমে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার দরুন মা ও শিশুর দেহে রোগজীবাণু প্রবেশ করে। ০-৫ বছর বয়সের শিশুরা ৬টি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়। ঘাতক রোগগুলো হচ্ছে হাম, যক্ষ্মা, পোলিও, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশি। শিশুর দেহে লোহা ক্যালসিয়াম, আয়োডিনের অভাব হলে অপুষ্টি দেখা দেয়। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ‘এক বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা ০.৫-০.৬ গ্রাম। ক্যালসিয়ামের সঙ্গে ফসফরাসের চাহিদা সম্পর্কযুক্ত। ফসফরাসের চাহিদা ক্যালসিয়ামের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। জন্মের পর ১২ মাস পর্যন্ত শিশুর লোহার চাহিদা প্রতি কেজি ওজনের জন্য এক মিলিগ্রাম। সে জন্য শিশুকে দুধ, ডিম, কলিজা ও মাংস ইত্যাদি প্রাণিজ প্রোটিন দেওয়া উচিত লোহা ও ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে। আয়োডিনযুক্ত খুব সামান্য লবণও শিশুর খাদ্যে থাকা প্রয়োজন।’

ঘাটের দশকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২৫৭ জন, যা নিতান্ত আশঙ্কাজনক। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬টি প্রতিষেধক টিকার মাধ্যমে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষায় ১৫-৪৫ বছর বয়স্ক মায়েদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। তবে শিশুদের প্রাণহরণকারী ৬টি রোগের মধ্যে পোলিও অন্যতম। পোলিও ভাইরাসবাহী রোগ। এ ভাইরাসের মাধ্যমে শিশুর অঙ্গহানি ঘটতে পারে। টিকাদানে অভিভাবকদের অজ্ঞতা ও অবহেলা শিশুর সু-স্বাস্থ্য রক্ষায় অন্যতম অন্তরায়। উপযুক্ত পুষ্টি যেমন শিশুর দেহের বাড়-বুদ্ধির জন্য প্রয়োজন, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ পরিবেশ ও তার মানসিক ক্রমপরিণতি অপরিহার্য। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যপুষ্টি এবং সুস্থ মন একজন ভবিষ্যৎ জননীর অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। প্রায় ছয় কোটি ৩০ লাখ শিশুর ওজন বয়সের তুলনায় কম। এক জরিপে মারাত্মকভাবে কম ওজনের শিশুদের স্বাভাবিক ওজনের শিশুদের তুলনায় পরের বছরই প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা দুই থেকে আট ভাগ বেশি।

বিশ্বে প্রতি বছর ৫০ লাখেরও বেশি শিশু মারা যায়। এর নেপথ্যে আছে মায়ের গর্ভকালে স্বাস্থ্যহানি, জটিল রোগ-ব্যাধির প্রকোপ, সুষম খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব, পরিবেশ, অশিক্ষা, কুসংস্কার ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি রয়েছে পুষ্টিহীনতা, দারিদ্র্য অর্থনৈতিক সমস্যা ও অজ্ঞতা। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যেসব শিশু জন্মগ্রহণ করে, তার মধ্যে প্রতি পাঁচজন একজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন ও আকারে ছোট হয়। এশিয়ার চারটি দেশে ২ দশমিক ৫ কেজি এবং ৫৫ পাউন্ড ওজনের শিশু জন্ম নেয়। কম ওজন ও ছোট আকারে জন্ম নেওয়া শিশুদের এক থেকে তিন বছরের মধ্যে খিঁচুনি, অন্ধত্ব, বধিরতা, মস্তিষ্কের পক্ষঘাত ও প্রতিবন্ধিত্বে পেয়ে যায়। বাংলাদেশে এ ধরনের শিশু জন্মের হার ৫০ ভাগ।

গর্ভকালীন মায়েদের আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের অভাবে প্রতি বছর বিশ্বে চার কোটি শিশুর মধ্যে এক কোটি প্রতিবন্ধিত্ববরণ করেন। ২০০ কোটির বেশি লোক প্রধানত নারী ও শিশু আয়রন ঘাটতিকবলিত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউ-এইচও) হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনূর্ধ্ব চার বছর বয়সী শতকরা ৫১ ভাগ শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ ভাগ অঞ্চলে আয়রন ঘাটতিকবলিত দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সমন্বয় ও ভারসাম্যের অভাব দেখা যায় এবং তাদের অমিশুক ও দ্বিধান্বিত মনে হয়। ‘৯০-এর দশকে ৪৮টি দেশের গর্ভকালীন মায়েরা আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের ফলে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু বিকলাঙ্গ এবং প্রতিবন্ধিত্ব থেকে রক্ষা পেয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বে ২০ লাখেরও বেশি শিশু নিউমোনিয়ায আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। আধুনিক চিকিৎসা ওষুধের মাধ্যমে ৮৮টি দেশে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এখনো এ রোগ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সংক্রামক ব্যাধি বা নিউমোনিয়া। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর শতকরা চল্লিশ ভাগ শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় আসে এবং তাদের অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করে। জন্মের এক বছরের মধ্যে বিশ্বে ৮০ লাখ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এর মধ্যে ৫০ লাখ শিশু জন্মের চার সপ্তাহের মধ্যে মারা যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোয়।

প্রতি বছর শুধু ডায়রিয়ার প্রকোপে ৫০ ভাগ শিশু মৃত্যুবরণ করে। আশির দশকে ও ডায়রিয়া আক্রান্ত মৃত্যুর হার ছিল ভয়াবহ। ৯০-এর দশকে ব্যাপক প্রচার ও পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুমৃত্যুর হার অনেক হ্রাস পেয়েছে। এদিকে ইচ্ছাকৃত আর অনিচ্ছাকৃত হোক, মায়েরা শিশুদের জন্মের পর বুকের দুধ সেবনে অনীহা দেখান।

শিশুর শৈশব অবস্থায় তার মায়ের দুধ একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। অনেক ক্ষেত্রেই অসুস্থ শিশুর রোগ নিরাময়ে মায়ের দুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুর দেহ গঠনের চাহিদা পূরণ করতে মায়ের দুধের প্রোটিনের প্রয়োজন ১০৬ গ্রাম আর সেই চাহিদা পূরণে গরুর দুধের প্রোটিনের প্রয়োজন হয় দুই গ্রাম। বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছর বয়সী অসংখ্য মৃত্যুবরণকারী শিশুর মধ্যে শতকরা দশভাগ শিশু শৈশবে পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ না পাওয়ায় মারা যায়। ফলে মাতৃদুগ্ধের অভাবে ১৫ লাখ শিশুর জীবনহানি ঘটে। হাম প্রতিষেধক টিকা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের পরও সারা বিশ্বে তিন কোটি শিশু এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতি বছর পাঁচ বছর বয়সের নিচে কমপক্ষে আট লাখ হামে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন হাম আক্রান্ত প্রায় দুই হাজার শিশু প্রাণ হারায়। শিশুর নিরাপদ পরিবেশ স্বাস্থ্য চিকিৎসা খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে, যাতে এর সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশ মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যায় নিরাপত্তা বিধান করা যায়। তারই সঙ্গে তাল মিলিয়ে মা ও শিশুর নিরাপদ জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার পঞ্চম-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আর্থ-সামাজিক শিক্ষা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অবকাঠামোগত পরিকল্পনায় বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসের পাশাপাশি শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, ধনুষ্টংকারের হাত থেকে শিশু ও মাকে রক্ষা শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান প্রণয়ন ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মায়ের গর্ভকালে রোগ প্রতিরোধ করে নিরাপদ বেঁচে থাকা, শিক্ষা চিকিৎসা এবং দারিদ্র্যবিমোচনের মাধ্যমে শিশুমৃত্যু হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। সুস্বাস্থ্য রক্ষায় ১৩টি ভিটামিনের মধ্যে ‘এ’ ও ‘সি’ শিশুদের রোগ প্রতিরোধকারী শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক। হাম, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রামক ব্যাধি ও পাতলা পায়খানা সময় ভিটামিন ‘এ’ রোগ থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে, তা ছাড়া এর অভাবে স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি লোপ পায় ও চোখের রোগ রাতকানা দেখা দেয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর চোখে এ ভয়ানক অবস্থা মাত্র ১-২ সপ্তাহে হয়ে যেতে পারে। লৌহের শোষণ বাড়াতে ভিটামিন ‘সি’র ভূমিকা স্কার্ভি নামক রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা রাখে। দৈনিক একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারী ৪০ মি. গ্রাম ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োজন। গর্ভবতী মহিলার প্রয়োজন ৮০ মি. গ্রাম। শিশু দৈনিক ২০০ মি. গ্রাম। যেখানে আমাদের দেশে প্রতি মিনিটে পাঁচজন শিশু জন্মগ্রহণ করে, সেখানে মা ও শিশু একে অপরের পরিপূরক। তাই সুস্থ মা-ই পারেন সুস্থ শিশু উপহার দিতে।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

 

শিশু জন্মের পর থেকে ছয় বছর পর্যন্ত প্রোটিন ও ক্যালরির দৈনিক চাহিদা

বয়স দেহের ওজন (কেজি) শক্তি (কিলোক্যালরি) প্রোটিন (গ্রাম)

৩-৬ মাস ৩.৩-৭.৮ ১১৮ কিলোক্যালরি ২.০ কেজি

৬-১২ মাস ৮-১২ ১০৮ কিলোক্যালরি ১.৭ কেজি

১-৩ বছর ১২ ১২২০কিলোক্যালরি ২.২ কেজি

৪-৬ বছর ১৮.৬ ১৭২০ কিলোক্যালরি ২.৯ কেজি

"