বিশ্লেষণ

রমজান অর্থনীতি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০

শামস আরেফিন

বাজার অর্থনীতিতে সাধারণ পণ্যের চাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্যের জোগান হ্রাস পেলে পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু পণ্যের দাম বাড়াতে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত জোগান থাকার পরও দাম বাড়ানোর জন্য পণ্যের জোগান হ্রাস করে, অবৈধ মজুদ করা হয়। সৃষ্টি করা হয় কৃত্রিম সংকট। আর তখনই চাহিদার অনুপাতে জোগান কম বলে দাম বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় মনোপলি বিজনেস। এই মনোপলি বিজনেসের সঙ্গে যদি হিডেন কস্ট বা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়, তবে দ্রব্যমূল্য আরো বাড়ে। সাধারণত বাংলাদেশে রমজানকে ঘিরে এ বাস্তবতা অর্থাৎ কতিপয় অসাধু পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্যের অতিরিক্ত মজুদ করে রাখে। এর পাশাপাশি যুক্ত হিডেন কস্ট হয় অর্থাৎ পরিবহনে চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বখশিশের খরচ। তাই পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ক্রিসমাস বা ঈদ উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য হ্রাস পেলেও একমাত্র বাংলাদেশেই রমজান ও ঈদ উপলক্ষে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায়।

টিসিবির তথ্য মতে, বিগত বছর ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গড়ে ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই মূল্যবৃদ্ধির মূলে ছিল প্রথাগত বাজার সরবরাহ প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত মজুদকরণের মাধ্যমে বাজারে পণ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অপর্যাপ্ত ও সমন্বয়হীন বাজার মনিটরিং, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, দুর্বিষহ যানজট এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়। আর এসবই অর্থনীতিতে মনোপলি বিজনেস ও হিডেন কস্ট-সংক্রান্ত সমস্যা। আর এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৭ সালের তথ্য অনুুযায়ী দেশে প্রায় ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় এবং ১২ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এমতাবস্থায় রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থমূল্যের হ্রাস করে এবং সামাজিকভাবে ধনী-গরিবের অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করবে। তা ছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে দেশে গড় মুদ্রাস্ফীতি ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং খাদ্যদ্রব্যে গড় মুদ্রাস্ফীতি ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ পরিস্থিতে যদি আসন্ন রমজান মাসে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরো বাড়ে, তবে মধ্যবিত্ত আয়-ব্যয়ে সমন্বয় করতে হিমশিম খাবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি বাজারে একটি করে বাজার তদারকি কমিটি এবং মূল্যনির্দেশক সাইনবোর্ড রাখা এবং উল্লিখিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে বাজার কমিটির আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া রমজান ও ঈদ উপলক্ষে জালটাকা যেন বাজারে প্রবেশ না করতে পারে এবং এটিএম বুথগুলোয় ছেঁড়া বা জালটাকা যেন ব্যাংকগুলো না রাখতে পারে, এ ব্যাপারেও যথাযথ সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

রমজান মাসে খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু রমজানের আগে বিগত বছরের চাহিদা অনুপাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্ভাব্য পণ্য পর্যাপ্ত সরবরাহের ব্যবস্থা করলে মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দ্রব্যের দাম বাড়ানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে বর্তমানে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো দুই অঙ্কের উচ্চসুদের হার এবং কোনো কোনো ব্যাংকের ১৬ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশ সুদ হার উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি রয়েছে ঋণ পাওয়ার জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ। এসব কিছুর চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে উৎপাদন খরচের সঙ্গে যোগ হয় এবং ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা, সারা দেশে টিসিবির পণ্যসামগ্রী ভোক্তাপর্যায়ে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমনÑছোলা, চিনি, চাল, দুধ, ভোজ্য তেল, খেজুর, খেসারি, মুড়ি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে রোজার মাসখানেক আগে এলসি খুলে বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে বিতরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি রমজানে ট্যারিফ কমিশন ও রাজস্ব বোর্ড এসব নির্দিষ্ট ভোগ্যপণ্যে ট্যারিফ ও শুল্ক হ্রাস করতে পারে এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা রমজানে পাইকারি পর্যায়ে বিক্রির ক্ষেত্রে অন্যান্য মাসের তুলনায় একটু কম লাভে বিক্রি করতে পারে। ফলে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তারা সহনশীল দামে ভোগ্যপণ্য ক্রয় করতে পারবে।

বাজারে বিভিন্ন অপতৎপরতারোধে এবং দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত আন্তরিক প্রচেষ্টা আবশ্যক। বিশেষত সময়োপযোগী পদক্ষেপ যেমন : রমজানে আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্য কাস্টম হাউস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দ্রুত খালাসকরণ; ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশের ক্ষেত্রে সেতু অতিক্রম ও ফেরি পারাপারে টোল প্রদানে বিলম্ব হ্রাস করা; টিসিবির ট্রাকসেলের মাধ্যমে শহর ও মফস্বলের হতদরিদ্র এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বিক্রি; পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও যানজট নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; পণ্যদ্রব্যের অনিয়ন্ত্রিত মজুদ চিহ্নিত ও বন্ধকরণে বাজার তদারককারী সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ; দক্ষ ও পর্যাপ্ত বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং দায়ী ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা; দেশের সব বাজারে নিয়মিত মূল্য তালিকা হালনাগাদ করা এবং দক্ষ বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা; বন্দর এলাকা, পাইকারি বাজার ও বাস্ততম পাইকারি বাণিজ্যিক এলাকায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিক সেবা প্রদান করা।

আমাদের রমজান এবং ঈদ অর্থনীতি চিরকাল মুদ্রাস্ফীতির জালে জর্জরিত। এ সময় মনোপলি বিজনেস ও হিডেন কস্ট নিয়ন্ত্রণ করে কস্ট অব ডুয়িং বিজনে হ্রাস করতে হবে। আর তা না হলে মুদ্রাস্ফীতির চাপে নিষ্পেষিত মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হবে। তা ছাড়া, গণহারে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে ঈদের কেনাকাটায় ধরতে হবে লাগাম। আর তা না হলে ঈদ-পূর্ববর্তী রমজানে মূল্যস্ফীতি ও ঈদের কেনাকাটায় বাণিজ্যঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিকে ঈদ-পরবর্তী মন্দায় ভোগাবে। তাই রমজান অর্থনীতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরা ও বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে সরকার ও ব্যবসায়ীদের আন্তরিক কার্যকর পদক্ষেপ জনগণ আশা করে।

লেখক : কবি ও গবেষক

"