মতামত

স্যাটেলাইট ক্লাবে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

আমরা একটি কথার সঙ্গে খুব পরিচিত, তা হচ্ছে প্রিয়জনের অপেক্ষা; প্রিয়জন আসার অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে প্রিয়জন। কখন আসবে প্রিয় ব্যক্তি। আর যখন দেরি হয়, তখন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তেমনি এমন এক মুহূর্তে মুখিয়ে ছিল পুরো বাঙালি জাতি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে প্রিয়জনদের অপেক্ষার পালা শেষ। স্বপ্নপূরণ হলো। বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ২টা ১৪ মিনিট। সারা দেশের কোটি কোটি চোখ তখন টিভিপর্দায়। ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর কেপ কেনেডি সেন্টারের লঞ্চিং প্যাড থেকে তীব্র বেগে মহাকাশে ছুটল বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ ব্ল্যাক-৫ রকেটে চেপে আকাশে উড়াল দেয় সাড়ে তিন হাজার কেজি ওজনের এই স্যাটেলাইট। রকেটটি মহাকাশে বাংলাদেশের ভাড়া নেওয়া অরবিটার সøট ১১৯.৯ ডিগ্রিতে নিয়ে যাবে স্যাটেলাইটটিকে। উৎক্ষেপণের পর দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে অবিস্মরণীয় এক অর্জন হলো বাংলাদেশের। বহু আগেই বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলের স্বীকৃতি পেয়েছে। এবার মহাকাশেও লাল সবুজের গৌরবগাথা দেখল বিশ্ব। ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাল বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশটি বিশ্বের কাছে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। যে ধাপটি হলো বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবে প্রবেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে ছয় দিন পর মহাকাশের নির্ধারিত ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের কক্ষপথে পৌঁছাবে বাংলাদেশের অহংকারের প্রতীক বঙ্গবন্ধু-১। এক মাস পর পাওয়া যাবে এর পূর্ণাঙ্গ সেবা। উৎপেক্ষণের কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার (১২ মে) দুপুরে গাজীপুরে ও বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ গ্রাউন্ড স্টেশনে প্রাথমিক পরীক্ষামূলক সংকেত পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকেল ৬টা ২৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টা ২৫ মিনিট) বঙ্গবন্ধু-১ গাজীপুরে ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড স্টেশনে সংকেত পাঠায়। কৃত্রিম স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ২২ হাজার মাইল ওপরে অবস্থান করে প্রায় ৪০ ধরনের সেবা দিয়ে যাবে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ৩টা ৪৭ মিনিটে উৎক্ষেপণের সময়সূচি নির্ধারিত ছিল। সব প্রস্তুতি সেরে উৎক্ষেপণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। কিন্তু মিনিটখানেক আগে সমস্যা দেখা দেওয়ায় স্যাটেলাইটটি আর ওড়েনি।

স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গায়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশার ওপর ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু-১। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও রয়েছে। উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে একনেক সভায় ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ প্রকল্প অনুমোদন পায়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ‘বিডার্স ফাইন্যান্সিং’-এর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। ১ দশমিক ৫১ শতাংশ হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। স্যাটেলাইট সিস্টেমের নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ প্রায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’। এরপর স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি তালিস এলিনিয়া স্পেসের সঙ্গে ১ হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে অনেকেরই বিরূপ মন্তব্য করতে দেখা গেছে গণমাধ্যমে। প্রতিহিংসার বসবর্তী হয়ে কিংবা বিরোধিতার কারণে সমালোচনা যাই করা হোক না কেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবে যেমন স্থান করে নিয়েছে, তেমনি দেশের প্রযুক্তি খাত এবং অর্থনৈতিক বড় ভূমিকা রাখবে। স্যাটেলাইট সম্পর্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘ওটার মালিকানা চলে গেছে জানেন তো? এই স্যাটেলাইটের মালিকানা চলে গেছে দুজন লোকের হাতে এবং সেখান থেকে আপনাদের কিনে নিতে হবে।’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি মহাকাশ জয় করেছেন। কিন্তু মানুষের মন জয় করতে পারেননি।’ সব কাজেই সমালোচনা থাকবে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং আর্থিক খাতে বড় ভূমিকা রাখবে তখনো সমালোচনা হবে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল প্রতি বছর অন্যান্য দেশের স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করে। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হলে এ অর্থ বাংলাদেশেই থেকে যাবে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া যাবে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ। ফলে ব্যান্ডউইথের বিকল্প উৎসও পাওয়া যাবে। এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী ও হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা চালুও সম্ভব হবে। স্যাটেলাইট ভাড়া সম্পর্কে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই নেব। যেমন ধরুন, ভাড়া বাড়িতে থাকলাম। কিন্তু বাড়িটা কখনো আমার হলো না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ভাড়া দিলে সেটি থেকে বাংলাদেশের আয় হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো অ্যাপস্টার সেভেন নামের একটি বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ বাংলাদেশের প্রতিটি টেলিভিশন স্টেশন মাসে ২৪ হাজার ডলার খরচ করে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে মোট খরচের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ ডলার।’

মোজাম্মেল হকের কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, অন্তত আর যাই হোক স্যাটেলাইট ভাড়া হিসেবে প্রতি মাসে গুনতে হতো প্রায় ১৫ লাখ ডলার। তা আর হবে না। শুধু তাই নয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্যাটেলাইট নিয়ে রয়েছে অনেক ভাবনা, রয়েছে অনেক সম্ভাবনা। বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল) স্যাটেলাইট মহাকাশে কাজ শুরু করার তিন মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুঁজিবাজারে এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনার কথাও ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে। বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়াবাবদ বাংলাদেশকে গুনতে হয় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পর বাংলাদেশ সেই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে বলে সরকার আশা করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে রয়েছে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের কাছে স্যাটেলাইট সেবা দিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ দিয়েই শেষ নয়। সংশ্লিষ্টদেরসহ আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। এটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের অনেক পরিকল্পনাও নিতে হবে। যে পরিকল্পনা হবে জনবান্ধব, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিবান্ধব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

msi.khokonp@gmail.com

"