নিবন্ধ

দুর্ঘটনায় প্রত্যাশার অপমৃত্যু

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০

মো. মাঈন উদ্দিন

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন এ রকমÑ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে; তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে।’ একটি নতুন সকাল, একটি নতুন সূর্যের উদয়, একটি রাতের শেষ মানে, একটি নতুন প্রত্যাশার অঙ্কোরোদগমন, নতুনের জন্মলাভ, নতুন তরতাজা আশার শতধা শাখা-প্রশাখার বিস্তৃতীকরণ। আমরা আশাপ্রবণ মানুষ। আমরা সব সময় নতুনের জয়গান গাই। সবচেয়ে নতুন জিনিসটাই প্রত্যাশা করি। কিন্তু কখনো কখনো এই প্রত্যাশা শুভ না হয়ে অশুভ অন্ধকারে ঢেকে যায়। মুহূর্তেই মুখ থুবড়ে পড়ে প্রত্যাশার ফানুশ। একটি শুভ সকালের প্রত্যাশায় একটি নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়, সোনালি আলোয় জীবনকে আলোকিত করার প্রত্যাশায় এক মা তার ভবিষ্যৎ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক সন্তানকে ঘুম থেকে ডেকে কপালে চুমু এঁটে দিয়ে সব আয়োজন সম্পন্ন করে রাস্তায় পা রাখে স্কুলের উদ্দেশে কিন্তু সব আশা, প্রত্যাশাকে ধুমড়ে-মুচড়ে মা-সন্তানের দেহকে থেঁতলে দেয় ঘাতক পরিবহন। প্রত্যাশার ফানুশটুকু এক সেকেন্ডে ফুটো হয়ে যায়, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সব আশা। বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু চোখের দুফোঁটা জলে ঢেকে দেওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না তখন।

একটি নতুন ও শুভ সকালের প্রত্যাশায় আমরা ঘর থেকে বের হলেও ১৭ কোটি গণমানুষের চলাচলের রাস্তা আমাদের জন্য আদৌ শুভ হবে কি না, তা আমরা জানি না। আমাদের প্রত্যাশা অনেক সময়ই শুভ হয় না। এর অন্যতম কারণ গণপরিবহন। কারণ, আজকাল গণপরিবহনে নৈরাজ্যের মাত্রা ছাড়িয়েছে। এর শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রতিদিনই ঘটছে একাধিক দুর্ঘটনা। হতাহত হচ্ছেন যাত্রী ও পথচারীরা। চালকদের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন, বেপরোয়া আচরণ, যানবাহনের ফিটনেস না থাকা, সর্বোপরি এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও বিআরটিএর গাফিলতি ও অবহেলার কারণে রাজধানীর একেকটি সড়ক এখন একেকটি মৃত্যুফাঁদ। চালকরা অবতীর্ণ হয়েছেন মৃত্যুদূতের ভূমিকায়। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে বিশেষজ্ঞ, সংগঠন ও সুশীলসমাজের পক্ষ থেকে বারবার পরামর্শ দেওয়ার পরও সমস্যা সমাধানে জোরালো ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা? এ বিষয়ে পরিবহন নেতা, সামাজিক সংগঠনের নেতা, পুলিশ ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরাও ভিন্ন ভিন্ন মতামত তুলে ধরেন। রাজধানীতে চলাচলরত প্রায় সব গণপরিবহন কোম্পানির বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। রাজধানীতে প্রায় ৮০ শতাংশ বাস-মিনিবাস নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত বলেই অনেকের ধারণা। বিআরটিএ ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ আধুনিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এখনো সনাতন পদ্ধতিতে নামকাওয়াস্তে জরিমানার মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করছে। সর্বোপরি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারা জড়িত থাকার কারণে গণপরিবহনের চালকদের বেপরোয়া ও অসহিষ্ণু আচরণ আজ সাধারণ মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিং অনেকাংশে দায়ী করার পাশাপাশি দুর্ঘটনায় চালকদের শাস্তি না হওয়া ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চলাচলের জন্য পুলিশ ও বিআরটিএর কর্মকর্তারা অনেকাংশে দায়ী।

এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার নৈপথ্যে যেসব কারণ থাকতে পারে, তা মোটামুটি এ রকম : রাজধানীতে মানুষের ঘনত্ব ও যানবাহনের সংখ্যা বেশি। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই নগরীতে সড়কের পরিমাণ কম এবং চালকরাও অদক্ষ-অস্থির চিত্তের। এ কারণে দুর্ঘটনার হারও বেশি। নগরীতে সড়কের জন্য ২৫ শতাংশ জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মাত্র ৭ শতাংশ জায়গায় সড়ক আছে। এত বিশাল জনগণের রাজধানীতে এত অল্প পরিমাণে সড়ক কোনো অংশেই নিরাপদ যানবাহনের জন্য যথেষ্ট নয়। রাজধানীর সড়কগুলোর মধ্যে অর্ধশতাধিক মোড় দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। অদক্ষ চালকরা এসব মোড়ে খামখেয়ালিভাবে গাড়ি ঘুরাতে গিয়ে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত বছরের চেয়ে বর্তমানে ২৮ শতাংশ দুর্ঘটনা বেড়েছে। চালকদের অস্থিরতা ও বেপরোয়া আচরণই এর জন্য দায়ী। গুরুতর দুর্ঘটনার জন্য চালকের যথাযথ শাস্তিÍ না হওয়া সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ। একটু পেছনে ফিরে তাকালেই দেখা যায়, দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের ঘটনায় কয়েকজন চালকের শাস্তি হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আরো যে কারণটি বিরাটভাবে দায়ী হতে পারে, তা হলো, রাজধানীর গণপরিবহনের চালকরা কেউই মালিকের মাসিক বেতনভুক্ত কর্মচারী নন। চালক ইচ্ছে হলে গাড়ি চালাতে পারেন, আবার নাও চালাতে পারেন। চালকরা বাস বা মিনিবাসটি প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেওয়ার চুক্তিতে মালিকের কাছ থেকে নিয়ে নেন। দিনশেষে চালকরা জমার টাকা মালিককে বুঝিয়ে দেওয়ার পর যা থাকে, তা হেলপাড় ও কন্ডাক্টরসহ তিনজনে ভাগ করে নেন। এর ওপর রাস্তায় সমিতির নামে এবং পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। এসব কারণে বেশি রোজগারের জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন চালকরা। ওভারটেকিং, আড়াআড়িভাবে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, সিগন্যাল মান্য না করা এবং রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। বাস বা মিনিবাসের মালিকরা আর্থিক ক্ষতির দিকটি মাথায় রেখে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া দেন। কোন চালকের হাতে গাড়ি তুলে দেবেন, তা মালিকের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। এখানে পরিবহন সংগঠন বা পুলিশের কোনো হাত নেই। এ কারণে মালিকরা সব সময়ই দুর্ঘটনার পর চালককে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। চালকদের মধ্যে ওভারটেকিং বা প্রতিযোগিতার একটা খারাপ অভ্যাস আছে। অধিকাংশ চালকরা অশিক্ষিত। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবও রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চালকরা হেলপারের কাছে গাড়ি দিয়ে নিজেরা নানা কাজে চলে যান। এই ফাঁকে হেলপার-চালকরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে ২০ ধরনের ৩৩ লাখ ৮২ হাজার ২৪৭টি গাড়ির নিবন্ধন রয়েছে। এর বিপরীতে ২৪ লাখ ৫৮ হাজার ৮৫২টি ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। এই পার্থক্য থেকেই দেখা যায়, ৯ লাখ ২৩ হাজার ৩৩৫টি নিবন্ধিত গাড়ির চালকদের লাইসেন্স নেই। কিন্তু লাইসেন্স না থাকার পরও এসব চালক গণপরিবহনসহ কোনো না কোনো গাড়ি চালাচ্ছেন।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন ১০ লাখ অনুমোদনহীন যানবাহন চলছে। এর মধ্যে ৫ লাখ সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। তথ্যানুসারে, সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ৬৪ জন নিহত ও দেড় শতাধিক যাত্রী আহত হচ্ছে। সড়কে চলাচলরত প্রায় ৭২ শতাংশ যানবাহন ফিটনেবিসহীন চলাচল করছে। ট্রাফিক পুলিশ পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে জরিমানা আদায়, চাঁদাবাজি, রুট পারমিট বাণিজ্য ও টোকেনবাজির সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক পরিচয়ে লোকজন পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব কারণে পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য ও যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা।

একই সঙ্গে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পুলিশও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য এখনই একটি শক্তিশালী সংস্থা গঠন করে গণপরিবহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রাস্তায় চলার পথে যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা ও ওভারট্রেকিং বন্ধ করা দরকার। যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষিত বেকাররা যদি বসে না থেকে এই পেশায় এলে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। সুতরাং এ পেশায় তাদের আসাটাকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই পেশাকে মর্যাদাবান পেশাতে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এই সংকট কাটাতে হলে কয়েকটি কোম্পানি গঠন করে গণপরিবহনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সর্বোপরি, নৈরাজ্য থেকে গণপরিবহনকে রক্ষায় এখনই সরকারকে যুগোপযোগী এক কঠোর ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে। অন্যথায় মহাদুর্যোগ অত্যাসন্ন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

moin412902@gmail.com

"