ব্রিটেন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং...

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

গত ৩ মে হয়ে যাওয়া স্থানীয় কাউন্সিল নির্বাচনে বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের এমন ফলাফল প্রার্থীরা তো বটেই, ভোটাররাও হয়তো কল্পনা করেননি। নির্বাহী মেয়র হিসেবে লেবার প্রার্থী জন বিগসের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বহু আগে থেকেই এক রকম নিশ্চিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে কাউন্সিলর হিসেবে এলাকাবাসীর প্রতিনিধিত্ব করা হেভিওয়েট প্রার্থীরা যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন পরাজয় বরণ করেন, তখন বুঝতে হবে ভোটাররা এবার তাদের জন্য বিশেষ এক বার্তা দিচ্ছেন এর মাধ্যমে।

ব্রিটেনের সবচেয়ে বেশি বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারাতে অতীতে একাধিকবার বাঙালি ভোট নির্ধারণী ভূমিকা পালন করেছে ফলাফলে। তাহলে এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বীরা এত কম ভোট পেলেন কেন, সেই প্রশ্নই এখন প্রধান হয়ে উঠেছে। এবার ব্যালটে ভোটাররা যে বার্তা খুব পরিষ্কারভাবে রাজনীতিকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তা হলোÑকমিউনিটিতে বিভক্তি তারা বরদাশত করবেন না। এ এলাকায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিরা নিজেদের একজনকে জনপ্রতিনিধির আসনে দেখতে চাইতেই পারেন। কিন্তু বাঙালির সেই আবেগ-অনুভূতির বদৌলতে যারা নেতৃত্বে আসীন হতে চান, তারা যখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করে বিভক্ত হয়ে পড়েন, তখন তা মানুষের মধ্যে শুধু বিরক্তি নয়, হতাশারও জন্ম নেয়। সেই বিরক্তি আর হতাশাই যেন ফুটে উঠেছে এবারের নির্বাচনের ফলাফলে। এবারের নির্বাচনে সাবেক মেয়র লুতফুর রহমান ও তার সমর্থিত প্রার্থী মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তাদেরই সাবেক সহকর্মীর সঙ্গে। ফলাফল? যা ভাবা হয়েছিল তা-ই।

অন্যদিকে আদালতের রায়ে লুতফুর রহমানকে অপসারণের দুই মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালের জুনের নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থী রাবিনা খান যেখানে ২৫,৭৬৩ ভোট পেয়েছিলেন, সেখানে এবার অহিদ আহমদ এবং রাবিনা খানের প্রাপ্ত ভোটের যোগফলও সেই সংখ্যার চেয়ে প্রায় দেড় হাজার কম। এর অর্থ হচ্ছেÑদুই প্রার্থী হওয়ার কারণে ভোটাররা এই সহজ হিসাবটি কষে নিয়েছেন, ক্ষমতাসীন লেবার প্রার্থীর বিরুদ্ধে এই দুই প্রার্থীর প্রতি সমর্থন ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার কারণে এ দুজনের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে জয়ের নৌকায় ভোট দেওয়ার একটি মানসিকতা কাজ করে। কেউই নিজের ভোটটা নষ্ট করতে চায় না। আর এ জন্যই জন বিগস গতবার ২৭,২৫৫ ভোট পেলেও এবার প্রথম রাউন্ডেই পেয়েছেন ৩৭,৬১৯ ভোট। অথচ গতবারের ৩৭.৭৩ শতাংশের স্থানে এবার প্রদত্ত ভোটের হার বেড়েছে মাত্র ৪১.৯৬ শতাংশ। অহিদ আহমদ দীর্ঘদিন কাউন্সিলর ছিলেন। বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা তার ছিল। ডেপুটি মেয়র ছিলেন লুতফুর রহমানের আমলে। কিন্তু তিনি কিনা এবার তার ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পর্যন্ত হতে পারলেন না। অবশ্য লেবার তুফানে বিরোধী শিবির যেখানে ল-ভ-, সেখানে রাবিনা খান কাউন্সিলর পদে বিজয়ী হয়ে তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তাকে অভিনন্দন। কিন্তু তিনি একাই গেছেন টাউন হলে। নিঃসঙ্গ তিনি কী-ই-বা করতে পারবেন আমরা জানি না। লুতফুর রহমান সমর্থিত অহিদ আহমদের তো সেই সান্ত¦নাও নেই। তার দলের একজন কাউন্সিলরও পাস করতে পারেননি। কেন এমন বেহাল দশা হলো তার কারণ চিহ্নিত করে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হলেও কমিউনিটির স্বার্থবিরোধী তৎপরতা অথবা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিদের অবস্থানের কারণে এই লেবার পার্টিকেও প্রত্যাখ্যানের নজিরও রয়েছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতি নিয়ে মিডিয়ার পছন্দের শিরোনাম- নির্বাচনে অনিয়ম আর ভোটে অসাধুতা। এ এলাকার রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব কিংবা অস্থিরতাও নতুন নয়। আর সেই অস্থিরতা নির্বাচন এলেই তুঙ্গে ওঠে। তেমনি এক ঘটনা এবার অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এসপারার থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানো কাউন্সিলর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের রক্তাক্ত চেহারা আমরা সবাই মিডিয়ার কল্যাণে দেখেছি। মূলস্রোতের মিডিয়ায় টাওয়ার হ্যামলেটস নিয়ে নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণার অনেকটিই পক্ষপাতমূলক কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়। এই দাবি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও এসব নেতিবাচক খবরের শিরোনাম তৈরিতে এই এলাকার অতি-উৎসাহীদের ভূমিকাও কম নয়। কাউন্সিলর প্রার্থী মামুনের যে হামলা হয়েছে, তা মোটেও ছোট ঘটনা নয়। মাথায় ১১টি সেলাই লেগেছে তার। ওয়াপিং ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচারকালে মুখোশধারী এক দুর্বৃত্ত ধাতব বস্তু দিয়ে পেছন থেকে আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেছেন। মামুন যে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তাতে তার প্রাণহানি ঘটতে পারত। আমরা জানি, পুলিশে ঘটনাটি রিপোর্ট করা হয়েছে। পুলিশ তাদের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তদন্ত চালিয়ে যাবে। কিন্তু এখানকার রাজনীতি কিংবা নির্বাচন যারা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন, তারা নিজেদের হিসাব-নিকাশে হয়তো আন্দাজ করতে পারছেন কে বা কারা এর পেছনে জড়িত থাকতে পারে। কারণ ব্যক্তিগত শত্রুতার সূত্র ধরে এ আঘাত আসেনি। এসেছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। ঘটনার সপ্তাহদুই আগে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তার ওপর শারীরিক আক্রমণ সেই হুমকির ধারাবাহিকতা বলে ধরে নেওয়া যায়। টাওয়ার হ্যামলেটসে রাজনীতির ব্যতিক্রমী চরিত্র আছে। আর নির্বাচনকালে যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে, তা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাঙালি অধ্যুষিত লন্ডনের বারা টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টির জয়জয়কার। বারায় মেয়র পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন লেবার পার্টির জন বিগস। ৪৫ জন কাউন্সিলের মধ্যে জয়ী ৪২ জনই লেবার পার্টির, এদের মধ্যে ২৫ জনই বাঙালি। এর আগে টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র ছিলেন লুৎফর রহমান, ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর যাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেন আদালত। এরপর ২০১৫ সালে নির্বাচনে লুৎফুরের সমর্থন নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন সাবেক কাউন্সিলর রাবিনা খান। টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট হলের প্রার্থী রাবিনা হেরেছিলেন লেবার পার্টির বিগসের কাছে। নির্বাচনেও রাবিনাকে বড় ব্যবধানে হারিয়েই দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হলেন বিগস। তিনি পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৮৬৫টি ভোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাঙালি প্রার্থী রাবিনা পেয়েছেন ১৬ হাজার ৮৭৮ ভোট। কাউন্সিলর পদে লেবার পার্টির প্রার্থীদের কাছে হারতে হয়েছে লুৎফুরের টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্টসহ অন্য সব দলের প্রার্থীদের। রক্ষণশীল দলের দুজন এবং পিপলস এলায়েন্সের একজন কাউন্সিলর পদে জয়ী হয়েছেন। প্রথম বাঙালি এমপি হিসেবে রুশনারা আলী রেসপেক্ট পার্টির জর্জ গ্যালওয়েকে হারিয়ে এই টাওয়ার হ্যামলেটসেরই বেথনাল গ্রিন ও বো আসন থেকে নির্বাচিত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অধুনালুপ্ত রেসপেক্ট পার্টি গঠনের মাধ্যমে লেবার দলীয় বিদ্রোহী এমপি জর্জ গ্যালওয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে বিভেদের রাজনীতি শুরু করেন। কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন না পাওয়া লেবার পার্টির সদস্যদের নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় পরে টাওয়ার হ্যামলেটসে কাউন্সিল লিডারশিপ পদ্ধতি পরিবর্তন করে মেয়রাল সিস্টেমের প্রবর্তন, স্বতন্ত্র মেয়র হিসেবে লুৎফুর রহমানের আবির্ভাব। নতুন রাজনৈতিক দল টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট, পিপলস এলায়েন্স, পাথ ইত্যাদির উদয়ে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বাঙালি কমিউনিটির রাজনীতি।

এবারের নির্বাচন বাঙালিদের মধ্যে বিভেদের রাজনীতির অবসান ঘটাবে বলেই আশা করছেন সবাই। এদিকে সে দেশের ১৫০টি কাউন্সিলের নির্বাচনে বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক বাঙালি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো থেকে। সার্বিকভাবে প্রধান দুটি দল রক্ষণশীল ও লেবার নির্বাচনী ফলাফলকে নিজেদের জয় হিসেবে মনে করছে। লেবার পার্টি থেকে এবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন ২৩৫০ জন, যা আগের তুলনায় ৭৭ জন বেশি। অন্যদিকে রক্ষণশীল দলের এবার বিজয়ী কাউন্সিলরের সংখ্যা ১৩৩২, যা আগের বারের চেয়ে ৩৩ জন কম। লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের কাউন্সিলর সংখ্যা ৭৫ জন বেড়ে ৫৩৬ হয়েছে। ইউকিপের কাউন্সিলর সংখ্যা ১২৩টি থেকে কমে এসেছে তিনটিতে। গ্রিন পার্টির পেয়েছে ৩৯ এবং অন্যদের ১৪৪টি। বিভিন্ন কাউন্সিলে বিভিন্ন দল থেকে মোট ৭৬ জন বাঙালির কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটসে সর্বোচ্চ ২৫ জন। নিউ হ্যামে ১০, রেডব্রিজে ৮, ডেগেনহাম, বার্কিং ও ক্যামডেনে ৬, ক্রয়ডনে ৪, ব্রেন্টে ১, ওয়েস্টমিনস্টারে ৪, ইজলিংটনে ১, ওল্ডহ্যামে ৫, মানচেস্টার সিটি কাউন্সিলে ৩, রচডেলে ১ ও বার্মিংহ্যাম সিটি কাউন্সিলে দুজন বাংলাদেশি নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আমাদের অবস্থান ভালো হয়েছে কিন্তু এর চেয়েও আরো অনেক কিছু আমরা আশা করতে পারতাম বা পেতে পারতাম যদি না আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব না থাকত। আর তাই তো আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে কিছুটা হলেও দুঃখ রয়েই গেল।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

"