মতামত

বৈশ্বিক উন্নয়নে সিল্ক রোড

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৮, ০০:০০

আবদুল্লাহ আল মেহেদী

হাজার হাজার বছর আগেই মানুষ ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়াসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ভূ-বৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির ভিন্নতার কারণে প্রয়োজন পড়ে পণ্য আদান-প্রদানের। সভ্যতার বিকাশ ও অর্থনৈতিক বিবর্তনে যে প্রাচীন পথ তিন মহাদেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল, তার নাম সিল্ক রোড। গ্লোবাল ভিলেজ বলতে এখন যা বোঝায়, আক্ষরিক অর্থে প্রাচীন সিল্ক রোড সেই ধারণারই আদি রূপ। এই আদি পথের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আজও দৃশ্যমান। প্রাচীন সিল্ক রোড মসৃণ রেশমের পাশাপাশি ছড়িয়ে দিয়েছিল নিজ নিজ ভূখ-ের সংস্কৃতি।

চীনের সঙ্গে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছিল দুই হাজার বছরের প্রাচীন এই বাণিজ্যিক রোড। প্রাচীন এই বাণিজ্যিক পথ আবার নতুন করে শুরু করতে চায় চীন। ৭০টি দেশের সঙ্গে ভূখ- শেয়ারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক আদান-প্রদান এই প্রকল্পের লক্ষ্য। যার অংশ হিসেবে ২০১৩ সালে ৬৫ দেশের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি করে দেশটি। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামক চীনের এই মেগা প্রকল্প দুই ভাগে বিভক্ত। একটি মহাসাগরভিত্তিক মেরিটাইম সিল্ক রোড এবং অন্যটি স্থল যোগাযোগভিত্তিক সিল্ক রোড অব ইকোনমিক বেল্ট। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড, যা সংক্ষেপে ওবিওআর, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত একটি বিষয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে চীন ১০ হাজার কোটি ডলার মূলধন নিয়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রাথমিকভাবে ৪ হাজার কোটি ডলারের তহবিল গঠন করেছে দেশটি।

প্রাচীন চীন সভ্যতা বিকাশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সিল্ক রোড। শুধু তাই নয়, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সভ্যতা ও অর্থনীতিতেও ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সিল্ক রোডের ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনতে চায় চীন। তাই এই প্রকল্পে সম্মত হওয়া দেশগুলোকে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে বেইজিং। বাংলাদেশ সরকারও ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিল্ক রোড বাস্তবায়নে আর মাত্র একটি চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষা। চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে রয়েছে কিছু কৌশলগত দিক। যার ফলে প্রকল্পের চূড়ান্তভাবে অংশ নেওয়া দেশগুলো অবকাঠামোগত নির্মাণের পাশাপাশি লক্ষ করা যায় দেশটির কিছু রাজনৈতিক অভিপ্রায়।

যেমন শ্রীলঙ্কায় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের আওতায় হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে রয়েছে ভারতের বিতর্ক। বন্দরে চীনা সাবমেরিন তথা সামরিক আনাগোনা এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পারস্য ও ভারত মহাসাগরে নজরদারি করতেই চীনের এই উদ্যোগ। বিরোধিতা করছে শ্রীলঙ্কান জনগণও। চীনের সামরিক অভিপ্রায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলবে। অনেক দেশের পক্ষে প্রকল্পে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ বাস্তবায়নে অনেক দেশ এই প্রকল্পে অংশ নিতে পারবে না, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও, অভিমত বিশ্লেষকদের। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ৬৫টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক করেন বেইজিংয়ে। যার নাম দেওয়া হয় বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিট। ঘোষণা করা হয় বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগের। বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে রয়েছে ছয়টি সমুদ্র ও স্থলবন্দর। প্রকল্পের মানচিত্রে চীনের সিয়ান থেকে উরুমকি ও তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে ইউরোপের মাদ্রিদ পর্যন্ত হবে সড়ক পথ, যা কিনা এশিয়ার কিরগিজিস্তান, কাজাখিস্তান হয়ে মস্কো, পোল্যান্ড, জার্মানির হামবুর্গ, হল্যান্ডের রটারডাম হয়ে মাদ্রিদে শেষ হবে। অন্যদিকে সামুদ্রিক রুটে একদিকে আফ্রিকা, কেনিয়া অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরকে যুক্ত করবে। তবে মালাক্কা প্রণালি বিস্তৃত চায়না-ইন্দোনেশিয়া পেনিন্সুলা করিডোরে এখনো মার্কিনিদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বাস্তবায়িত হলে চীন মার্কিন উত্তেজনা যে বাড়বে তা বলাই যায়।

এই প্রকল্পের অন্যতম চ্যালেঞ্জ চীন ও পাকিস্তানের ইকোনমিক করিডোর। যার বিরোধিতায় বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিট বয়কট করে ভারত। কাশ্মীর ভূখ-ের আওতায় থাকায় ভারতের এই বিরোধিতা। ভারত মনে করে, এতে তার দেশ নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়বে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমার পরস্পরবিরোধী দুটি রাষ্ট্র এই রুটের আওতায় থাকায় প্রকল্পে ভারতের সমর্থন পাবে না চীন। অন্যদিকে এশিয়া প্যাসিফিক তথা ভারত মহাসাগর এবং চীন উপসাগরে চীনের আধিপত্য রোধে একাট্টা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। তাদের এই ঐক্য এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের অনেক পুরনো বন্ধু। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য। ভারতের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে আপত্তি থাকলেও বাংলাদেশ এই প্রজেক্টকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সিল্ক রোড বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের অংশীদার হওয়ার বিকল্প নেই। এই প্রকল্প বাংলাদেশের শিল্পায়নের সক্ষমতা, বিদ্যুৎও জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ খাতে উন্নতি ঘটাবে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগবে। বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করবে। চীন বাংলাদেশ মধ্যকার যে মুক্ত বাণিজ্যিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার চুক্তি হয়েছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন দ্বার হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এদিকে চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড, পশ্চিমাদের সাম্রাজবাদ অর্থনীতি ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শতাব্দীর সেরা ইনিশিয়েটিভ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এশিয়ার সোনালি অর্থনীতির নবরূপ হতে পারে এই মেগা প্রোজেক্ট। রাশিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশ এই প্রজেক্টকে এশিয়ার অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সুবিধাবঞ্চিত দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের পথ হিসেবে দেখছেন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

abdullahalmehedi@ymail.com

"