আকাক্সক্ষা

দিগন্তে স্বপ্নের বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৮, ০০:০০

মিঞা মুজিবুর রহমান

সম্ভাবনার দেশ। এ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশালী দেশ হবে বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত। এই ১৬ কোটি মানুষ বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ। দেশের মানুষ কর্মঠ এবং পরিশ্রমী। শিগগিরই এ দেশ এশিয়ার উদীয়মান টাইগারে রূপান্তর হবে। বাংলাদেশ একদিন পরিণত হবে পৃথিবীর বৃহৎ পোশাক, জুতা, ওষুধ, সিরামিক ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানিকারক দেশে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ হবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন হিসাবের যোগফলে কয়েক বছর ধরে এটা স্পষ্টভাবেই দেখা গেছে বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচকগুলো এমনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিগগিরই বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন আর কেউ না খেয়ে মরে না। বাংলাদেশ পৃথিবীর সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্রমেই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের কৃষি খাত, প্রবাসী আয়ের খাত এবং পোশাকশিল্পের আয়ের খাত দেশের পুরো চেহারাটা বদলে দিচ্ছে।

প্রতিটি দেশের উন্নয়ন সে দেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশই এর ব্যতিক্রম। রাজনৈতিক কালচার উন্নত না হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। উন্নয়নের সবচেয়ে প্রধান খাতটি কৃষি খাত। কৃষিবিপ্লবে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। আর কৃষি খাত থেকে যখন ভাত-ডালের বন্দোবস্ত হয়েছে, তখন সামনে এগিয়ে এসেছে আরো একটি দরিদ্র মানুষের খাত প্রবাসী আয়। দরিদ্র মানুষের বিদেশে প্রবাসী হিসেবে সামান্য আয়কে পুঁজি করে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি পোশাক শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমের ফসল আমাদের পোশাকশিল্প উন্নয়নের ধারাকে আরো বেগবান করেছে।

বাংলাদেশ যে হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, অর্থনীতি যেভাবে এগিয়েছে, যেভাবে বিশ্বমন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা করেছে, তার দ্বারাই বোঝা যায় বাংলাদেশের মানুষ অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। অপরিসীম তাদের ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং সংগ্রাম করার মনোবল ও উদ্যম। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই, কেউ আমাদের আটকে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবেই। সত্তর দশকের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ তলাবিহীন ঝুড়ি, নব্বই দশকের তুলনামূলক অচেনা বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী এক বিস্ময়ের নাম। উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা মানুষের কপালে ভাঁজ ফেলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশ আজ প্রায় মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে। সম্ভাবনার দিগন্তে পত্ পত্ করে উড়ছে পতাকা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি-সন্ত্রাস-জটিলতার মধ্যেই পাল্টে যাচ্ছে দেশের উন্নয়ন চিত্র। কোনো চক্রান্তই থামাতে পারছে না উন্নয়নের রথ। চার লেন মহাসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, গ্যাস সংকট নিরসনে এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রাজধানীর চারপাশে স্যুয়ারেজ ট্যানেল নির্মাণের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। সম্প্রতি উন্নয়নের এ কর্মযজ্ঞে যোগ হয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এবং দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম প্রকল্প। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অঞ্চলের কাজের উদ্বোধনও করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপদ এবং পণ্য পরিবহন-খালাস সহজীকরণ করতে গৃহীত আরো কিছু অবকাঠামোর সংস্কার হচ্ছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও এগিয়েছে দেশ। ১৬ কোটি মানুষের দেশে কয়েক বছরে সক্রিয় মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি, আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সম্ভাবনার নবদিগন্তে বাংলাদেশের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ কোটি। দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ শেষ হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সব মানুষকে যোগাযোগ ও সম্প্রচার সুবিধার আওতায় আনার পাশাপাশি দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত হবে। এমনকি স্যাটেলাইটের বর্ধিত ফ্রিকুয়েন্সি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও উপার্জন করা যাবে।

সম্প্রতি আবার বাংলাদেশ সম্পর্কে আশার কথা শুনিয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ। এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ আগামী ১০ বছরে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। গবেষণা অনুযায়ী বাকি নয়টি দেশ হচ্ছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইনস ও ভিয়েতনাম। বিএমআই রিসার্চ মনে করছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই ১০টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন অর্থাৎ চার লাখ তিন হাজার কোটি ডলার যোগ করবে, যা বিনিয়োগকারীদের বড় সুযোগ এনে দেবে। উল্লিখিত অর্থ জাপানের বর্তমান অর্থনীতির সমান। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা বাংলাদেশের সামনে হাতছানি দিচ্ছে তাকে কাজে লাগাতে জঙ্গিবাদের শেকড় উৎপাটন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে সম্ভাবনাময় দেশের বদলে ব্যর্থ রাষ্ট্রের অভিশাপ যে জাতির জন্য অনিবার্য হয়ে উঠবে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ বিপদ ঠেকাতে পেশাদারিত্বের মনোভাব দিয়ে জঙ্গিবাদ দমনের প্রয়াস চালাতে হবে। বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে হতে হবে আপসহীন।

বাংলাদেশের মানুষ কয়েকবার এভারেস্ট বিজয় করেছে, বাংলাদেশের শান্তি মিশন সারা বিশ্বে কত সুনাম কুড়িয়েছে, বাংলাদেশের ক্রীড়া জগৎ বিশেষ করে ক্রিকেট কত উন্নত হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এর সবকিছুই সম্ভব বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা। এ জনগণ দিয়ে সবকিছুই সম্ভব। পরিশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। দুনিয়ার কোনো জাতিকে তাদের স্বাধীনতার জন্য এত রক্ত দিতে হয়নি। রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এ দেশের মানুষ যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সে পথ রচনায় চাই আত্মপ্রত্যয় এবং আত্মবিশ্বাস। চাই দেশপ্রেম এবং হার না মানা মনোভাব। বাংলাদেশের মানুষ রূপকথায় ফিনিকস পাখির মতো ভস্ম থেকে উড়াল দেওয়ার সামর্থ্য দেখিয়েছে। বিশ্বজয়ের সামর্থ্য দেখাতে তাদের আরো প্রত্যয়ী হতে হবে। হতে হবে শৃঙ্খলাপরায়ণ। চিন্তা-চেতনা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে নেতিবাচক সব উপাদান।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

"