রোজা

দৈহিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির নিয়ামক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ০০:০০

মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ

রোজার বিধান আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর সময় থেকেই বিভিন্ন আদলে প্রবর্তিত এবং প্রচলিত রয়েছে। জগতের সব ধর্ম-শিক্ষক প্রবৃত্তিসমূহের অবদমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রোজা পালনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি ও প্রচার করেছিলেন। প্রত্যেক প্রেরিত ধর্মের বিধানের মধ্যে রোজার বিধান দেখতে পাওয়া যায়। হজরত মুসা (আ.) চল্লিশ দিবস রোজা রেখেছিলেন। হজরত ঈসা (আ.) মরুভূমিতে চল্লিশ দিন রোজা রেখে তার উম্মতদের রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আগের দিনে শোক প্রকাশের নিমিত্তে কিংবা কোনো ঘটনা স্মরণীয় করে রাখার জন্য রোজা পালিত হতো। তাদের রোজার উদ্দেশ্য থাকত দেবতাদের ক্রোধভঞ্জন বা প্রসন্নতা লাভ। ইসলাম রোজার এই উভয় উদ্দেশ্য নাকচ করেছে। তৎপরিবর্তে রোজার আসল উদ্দেশ্য সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। রোজার উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিন বান্দারা! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া বা সাবধানতা অবলম্বন করতে পারো (সুরা বাকারা : ১৮৩)। দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা মুসলমানদের ওপর ফরজ করা হয়। নামাজ, হজ, জাকাত ইত্যাদির মতো রোজা কোনো আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়। আনুষ্ঠানিকতা আছে এমন সব ইবাদত হতে পারে, যা কেবল লোক দেখানো বা লোকের প্রশংসাবাণী কুড়ানোর জন্য। কিন্তু রোজার মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা বা লোক দেখানোর তেমন কিছু নেই। তাই রোজা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর জন্যই। আর এর প্রতিদান কেবল তিনিই দেবেন নিজ হাতে।

সিয়াম রোজা কীভাবে মানুষের জন্য মুক্তি বয়ে আনে তার পূর্ণ বক্তব্য রয়েছে ‘রমজান’ শব্দটির ভেতরেই। ‘রমজান’ শব্দটির উৎপত্তি ‘রমজ’ ধাতু হতে, যার অর্থ দহন করা বা পোড়ানো। ‘রমজান’ শব্দটি বিস্তৃত অর্থবহ। এক বচনে ‘সওম’ ও বহুবচনে ‘সিয়াম’, যার অর্থ হচ্ছে বিরত বা স্থগিত থাকা। আল্লাহ যেহেতু সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, তাই তিনি নিখুঁতভাবেই জানেন যে তার বান্দার দৈহিক ও মানসিক উৎকর্ষের জন্য কী কী জিনিস থেকে বিরত থাকা দরকার। আর এগুলো আমরা রোজার মাধ্যমেই সম্পূর্ণরূপে পেয়ে থাকি। হাদিসে আছে, কথাটি মানুষের দৈহিক ও আত্মিক সার্বিক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দৈহিক উন্নতির জন্য যেমন কিছু জিনিস থেকে বিরত থাকতে হয় ধূমপান, মদ, জুয়া তদ্রƒপ মানসিক উন্নতির জন্যও বিশেষ কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। এ কথাটি অনস্বীকার্য ও অখ-।

কেউ কেউ মনে করেন, সারাদিন রোজা থাকলে গ্যাস্ট্রিক কিংবা উদরাময় রোগ হতে পারে। কিন্তু এটা আত্মপ্রবঞ্চনামূলক কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ রোজা রাখা বা উপবাসের কারণে কখনো গ্যাস্ট্রিক হয় না। বরং সামান্য পরিমাণ এ রোগ থাকলে রোজার বদৌলতে তা পুরোপুরি আরোগ্য হয়ে যায়। তবে পূর্ব থেকে যদি মারাত্মক ধরনের গ্যাস্ট্রিক বা আলসার থাকে, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা না রাখারও বিধান রয়েছে। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘রোজা নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য ফরজ। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় ওই সংখ্যক রোজা রাখতে হবে। রোজা যাদের জন্য কষ্টদায়ক যেমন অতি বৃদ্ধদের জন্য, তারা অবশ্যই একজন অভাবগ্রস্তকে অন্নদান করাবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৪)। তা ছাড়া দৈহিকভাবে বান্দার জন্য কষ্ট হবে, এমন কোনো ইবাদত মহান রাব্বুল আলামিন কখনো কারোর ওপর চাপিয়ে দেননি।

যখন আমরা খাওয়া বন্ধ রাখি এবং খাওয়ার যন্ত্রকে বিরতি দেই, তখন দেহে সংরক্ষিত জীবনী শক্তির এক নবজীবনের উদ্ভব হয়। ডা. জুয়েলস এম. ডি. বলেন, ‘যখন একবেলা খাওয়া বন্ধ থাকে, তখন দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করে। খাদ্যের পরিপাক ও আত্মীকরণে যে শক্তি ব্যয় হয়, খাওয়া বন্ধ করে আমরা যদি সেই শক্তি অন্যদিকে নিয়োজিত করি, তবে দেহের অপ্রয়োজনীয় বিষাক্ত অংশ বিদায়িত করতে পারি। পরিপাক প্রণালি যখন তার আত্মীয়করণে বিরত দেয়, তখন পাকস্থলী ও অন্ত্রের শ্লৈষ্মিক-ঝিল্লি দেহযন্ত্র থেকে জীর্ণ পদার্থগগুলোকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অন্ত্রের ও পাকস্থলীর শ্লৈষ্মিক আবরণী খাদ্যবস্তু পরিপাকের বেলায় অনেকটা স্পঞ্জের মতো কাজ করে। অতি ভোজনের ফলে দেহের স্নায়ুকোষে বিষক্রিয়া দেখা দেয়। ফলে শরীরে নেমে আসে অস্বাভাবিক ক্লান্তিবোধ ও জড়তা। সিয়াম প্রতিষেধকের কাজ করে। অতএব বোঝা গেল, রোজা দেহযন্ত্রের বিষ ধ্বংস করে এবং দেহের রোগ নিরাময়ের সংরক্ষিত শক্তির সদ্ব্যবহার করে। প্রতিটি রোগের পেছনে কোনো না কোনো কারণ রয়েছে। তবে জীবাণুবাহিত রোগগুলোর মধ্যে ব্যাক্টেরিয়াম, ভাইরাস প্রধান। বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে উপবাসের ফলে অনেক জীবাণু মারা পড়ে। ডা. ডিউই বলেছেন, জীর্ণ ও ক্লিষ্ট রুগ্ণ মানুষটি উপোস থাকছে না, সত্যিকারভাবে উপোস থাকছে রোগটি। চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক হিপোক্রেটিস বলেছেন, ‘অসুস্থ দেহে যতই খাবার দেবে ততই রোগ বাড়তে থাকবে।’ গ্রাহাম বার্থলো জেনিংস প্রমুখ গবেষক এ বিষয়টি সত্য বলে প্রতিপন্ন করেছেন। অধিক পানাহারের অন্তর প্রাণহীন হয়ে যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অতিরিক্ত পানাহার দ্বারা অন্তরকে প্রাণহীন করো না। কেননা, অন্তর শস্যক্ষেত্র স্বরূপ।’ থেতে অতিরিক্ত পানি দিলে থেতের উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট হয়। ক্ষুধার সময় আত্মা নির্মল ও পরিষ্কার হয়ে ফুটে ওঠে।

রোজার বহুবিদ উপকারিতার মধ্যে রয়েছে, তাকওয়া অর্জন করা এবং আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ। সব ইবাদতে লৌকিকতার অবকাশ থাকলেও রোজার ভেতর সেই অবকাশটা নেই। কেননা, মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি যাদের অগাধ বিশ্বাস রয়েছে, কেবল তারাই রোজা রাখতে সক্ষম হন। কেননা, সারা দিন রোজা রাখার ফলে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা প্রচ-তার যখন বৃদ্ধি পায় এবং নিজ ঘরে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য থাকা সত্ত্বেও একজন রোজাদার একমাত্র আল্লাহর ভয়ে তা গ্রহণ করেন না। কারণ রোজাদার জানেন, কেউ আমাকে না দেখলেও মহান রাব্বুল আলামিন অবশ্যই আমাকে দেখছেন। আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসই একজন মানুষকে খাঁটি মুমিন বানাতে পারে। আর তিনি তার বান্দাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদাও দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা-বান্দি কেবল আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার ত্যাগ করেছে, সুতরাং স্বয়ং আমি নিজ হাতে এর প্রতিদান দেব।’ (বোখারি : ১৯০৪)।

সিয়াম সাধনা একজন মানুষকে পূতপবিত্র ও নিষ্পাপ ফেরেশতাকুলের অনুকরণে অনুপ্রাণিত করে, পাশবিকতা ও প্রবৃত্তি গোলামি থেকে মুক্ত করে। ফেরেশতারা যেমন সব জৈবিক চাহিদা থেকে মুক্ত পূতপবিত্র, আল্লাহর দরবারে সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, তেমনি মানুষিও পাশবিক ও জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক বুদ্ধি প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সদ্ব্যবহার করে দরবারে ইলাহিতে সুউচ্চ মাকামের অধিকারী হতে পারে। এমনকি কখনো কখনো তার মর্যাদা হয় ফেরেশতাদের ঊর্ধ্বে।

সিয়ামের লক্ষ্য হলো, মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া এবং তার জৈবিক চাহিদাগুলোকে স্বাভাবিক ও সুনিয়ন্ত্রণ করা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জন করে থাকে। সে পৌঁছে যায় পারলৌকিক সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে। ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে তার জৈবিক চাহিদা ও পাশবিক প্রবৃত্তিসমূহ দুর্বল হয়ে পড়ে, তার মনুষ্যত্ব সজীব ও সতেজ হয়ে ওঠে। তখন ক্ষুধাতুর অভুক্ত মানুষের অনাহারক্লিষ্ট মুখ তার হৃদয়ে সহানুভূতি ও সহমর্মিতার পবিত্র অনুভূতি জাগ্রত করে।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

ahmadabdullah7860@gmail.com

 

"