শ্রদ্ধাঞ্জলি

মা তোমাকে...

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য্য

মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বন্ধু। পৃথিবীর কোনো সম্পদ, টাকা-পয়সা, গাড়ি, বাড়ি হারানোর সঙ্গে মাকে হারানোর তুলনা হয় না। মা নিয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। ম্যাক্সিম গোর্কির মা, শওকত ওসমানের জননীসহ কেবল মাকে কেন্দ্র করেই কত সাহিত্য উঠে এসেছে। আরো বহু রচনা রচিত হবে নিশ্চিত। মোটকথা, যত দিন এ বিশ্ব তার অস্তিত্ব বজায় রাখবে, তত দিন মাকে নিয়ে অনুভূতির কথা, বেদনার কথা নানাভাবে উঠে আসবে। পৃথিবীর সব সম্পর্ক, সব ভালোবাসা একটি সম্পর্কের কাছে এসে মাথা নোয়ায়। তা হলো মা আর সন্তানের সম্পর্ক। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো নাম নেই, কোনো লাভক্ষতির হিসাব নেই, পাওয়া বা না পাওয়ার অতৃপ্তি নেই, আছে কেবল পরিপূর্ণতা। এ এক নির্মোহ পবিত্র বন্ধন, যা কেবল মা আর সন্তানের মধ্যে হতে পারে। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্ব মা দিবস পালন করা হয়। মাকে নিয়ে আলাদা একটি দিবসের প্রচলন হলেও বস্তুতপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে বা উপলক্ষ করে মায়ের প্রতি ভালোবাসা হিসাব করা যায় না। এটি সর্বকালের, সর্বসময়ের। মাতৃস্নেহ সব গ-ির ঊর্ধ্বে। মায়ের আঁচল ছায়ার প্রশান্তি পৃথিবীর সব শান্তি আর সুখের ওপরে। ঠা-া এসির বাতাসও বুঝি মায়ের আঁচলের ছায়ার প্রশান্তি এনে দিতে পারবে না। কারণ এটি এক দিনে প্রশান্তি অন্যদিকে নিরাপত্তার ছায়া। কোন সংজ্ঞায়, কোন মনীষীর লেখায় মায়ের তুলনা সম্পূর্ণ উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না। তা কেবল খ-িতই থেকে যাবে। থেকে যাবে অপূর্ণতা। রচিত হবে কোনো মাকে নিয়ে অন্য রকম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাই মাকে স্রষ্ঠার পরেই স্থান দেওয়া হয়েছে। সন্তানের সব সুখ শান্তি এমনকি স্বর্গ মায়ের পায়ের নিচেই নিহিত।

মা দিবস চালু হওয়ার পেছনে মূলত কয়েকটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস পাওয়া যায়। ভিন্ন মতগুলো একত্র করে আজকের দিবসে এসেছে। তবু পৃথিবীর সব দেশ কিন্তু একই সঙ্গে এই দিবস পালন করে না। কিছু দেশে আলাদা দিনও রয়েছে। কয়েকটি ইতিহাসের একটি হলো ১৬ শতকে ইংল্যান্ডে মা দিবস পালন করার খবর পাওয়া যায়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সেই সময়ে জুলিয়া হাও নামের এক গীতিকার যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে আমেরিকার সব মাকে একত্র করতে চেয়েছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করতে চাচ্ছিলেন। তিনি আংশিক সফলও হয়েছিলেন। কারণ সারা বিশ্বে না হলেও তার শহরে ঘটা করেই পালিত হতো। ১৯১২ সালে আনা জার্ভিস স্থাপন করেন আন্তর্জাতিক মা দিবস সমিতি এবং ‘মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আর মা দিবস’ শব্দের বহুল প্রচলন করেন। আবার হাজার বছর আগেও প্রাচীন রোম ও গ্রিসে তাদের দেবীর বন্দনায় আজকের মা দিবসের কিছুটা মিল দেখা যায়। এ ছাড়া ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে মাদারিং সানডের মতো বহু আচার পালন করা হতো মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য। এভাবে দেখা যায় মা দিবস হিসেবে পালন করার অনেক আগে থেকেই মায়েদের সম্মানার্থে এ রকম বহু অনুষ্ঠান পালন করা হতো এবং সারা বিশ্বেই বিভিন্নভাবে এসব আয়োজন অব্যাহত থেকেছে।

একটি সন্তানকে জন্ম দিতে গর্ভে লালন-পালন করা থেকে শুরু করে যে অসহনীয় কষ্ট হয় তার ভেতর সন্তানের

মুখ দেখে সেই কষ্ট এক মুহূর্তে ভুলে যায় একজন মা। তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। দশ মাস দশ দিন গর্ভে

ধারণ করে বয়ে বেড়ানোর কষ্ট আগত সন্তানের কথা ভেবে সুখে পরিণত হয়। নিয়তির কঠিন খেলায় যখন সব হারিয়ে যেতে থাকে তখনো মা তার সন্তানকে বুকে আগলে রাখে। সন্তানের গায়ে একটি ছোট আঘাতও যেন অনেক বড় হয়ে মায়ের বুকে বিদ্ধ হয়। সবার ছুটি হয় কিন্তু মায়ের হয় না। নিরলসভাবে সন্তানের চিন্তায় সারাজীবন কাটিয়ে দেন। মায়ের কষ্টার্জিত অর্জনের মধ্যেই অপার আনন্দ নিহিত রয়েছে। সন্তানকে রক্ষা করতে পারা, নিরাপদে রাখতে পারার যে তৃপ্তির হাসি তার থেকে বড় কোনো বিজয় হয় না। একটি ভ্রƒণ থেকে সন্তানকে মানুষ করার যে অপরিসীম ধৈর্য ও একাগ্রতা তা কেবল মাতৃত্বের মধ্যেই দেখা যায়। তার থেকে মধুর কোনো দৃশ্য কল্পনাতেও আসে না। সন্তান প্রসবের যে তীব্র যন্ত্রণা তা সহ্য করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কেবল মা ছাড়া। এই অদ্ভুত শক্তি কেবল মায়ের কাছেই রয়েছে। কষ্টের মাঝে আনন্দের যদি উদাহরণ থাকে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো মা। মা তাই শাশ্বত চিরন্তন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে অনেকটা আজ সরে এসেছি। সমাজের বিভিন্ন স্তরে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। মায়ের প্রতি অবহেলা, অশ্রদ্ধা আজ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘটে চলেছে। পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝে দেখা যায় বৃদ্ধা মাকে ফেলে চলে গেছে ছেলে। মা আজ বহু সংসারের বোঝা! নিজে মায়ের প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি তার হিসার একবারের জন্যও করে না। সন্তান পাওয়া না পাওয়ার হিসাব গুনলেও মা কখনোই সে হিসাব রাখে না। তার হিসাব কেবল সন্তানকে সুখে রাখা। মায়ের যখন বয়স বাড়ে সন্তানের কাছে মা অতিরিক্ত বস্তুতে পরিণত হয়। সব ক্ষেত্রে এমন হয় না। তবে আজ এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বৃদ্ধ বয়সে তারা হয় অস্পৃশ্য। এ ধরনের অসহায় মায়েদের জন্য গড়ে উঠেছে বৃদ্ধাশ্রম। অদ্ভুত বিষয় হলো অনেক মায়ের সন্তান

আবার সেই বৃদ্ধাশ্রমের মায়েদের খোঁজখবর নেয়, দেখভাল করে। কিন্তু মায়ের দুচোখ কেবল খুঁজে বেড়ায় তার সেই প্রিয় মুখটিকে। মৃত্যুর আগেও তার সে চাওয়া থেকে

যায়। কি অদ্ভুত নিয়তি। মায়ের যখন কাজ শেষ

তখন তাকে প্রিয় সন্তানকে ছেড়ে থাকতে হয়

বৃদ্ধাশ্রমে। জীবনের শেষদিনে তার প্রিয় সন্তানকে দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে যায়। অথচ এই প্রিয় সন্তানের জন্য সে জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছে হয়তো। সন্তান কখনোই মায়ের কাছে বোঝা হয় না কিন্তু মা অনেক সন্তানের কাছেই বোঝা হয়। তাই তো বৃদ্ধাশ্রমগুলোয় বহু বৃদ্ধা মহিলার দেখা মেলে যাদের সন্তান বড় বড় পদে আসীন। কিন্তু মায়ের জন্য একটু জায়গা তাদের নেই। এক দিন যখন সন্তানের সুখের জন্য নিজের আঁচল বিছিয়ে দিয়েছিল, সেই সন্তানের দামি দামি আসবাবপত্রের ভিড়ে মায়ের জন্য থাকার জায়গা কোথায়! মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে শুরু করে কথিত হাইসোসাইটিতে এসব চিত্র চোখে পড়ে। তাই মায়ের ঋণ জন্ম জন্মান্তরেও শোধ করা যায় না। প্রতিটি মায়ের শেষ বয়সটা যেন একটু নিরাপদে, সন্তানের সঙ্গে পরিবারের ভেতর হাসি-আনন্দে পার করতে পারে সে দায়িত্বটুকু আমাদের নিতেই হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"