সহযোগিতা

প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

সীমান্তহত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী একযোগে যেভাবে কাজ করছে তা প্রশংসার দাবিদার। দুই পক্ষের ইতিবাচক মনোভাবের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে হত্যাকা- ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) সাম্প্রতিক বৈঠকেও সীমান্তহত্যা বন্ধে নন লেথেল অস্ত্র ব্যবহারে উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

ঢাকার পিলখানায় অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪৬তম সীমান্ত সম্মেলন শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক বলেছেন, প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের কারণে সীমান্তহত্যা অনেকাংশে কমে এসেছে। সীমান্তে কোনো ধরনের প্রাণনাশ গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। বিএসএফ মহাপরিচালক বলেছেন, সীমান্তহত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে তারা কাজ করছেন। সাধারণত মধ্যরাতে সীমান্তে অপরাধ কর্মকা- হয়। তা নিয়ন্ত্রণে নজর রাখা হচ্ছে। সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক, এটা আমরা চাই না। সীমান্তের অপরাধপ্রবণ এলাকার ম্যাপিং বছরে দুবার হালনাগাদ এবং সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন তিনি। উভয় পক্ষ সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে গবাদি পশু ও মাদক চোরাচালানপ্রবণ এলাকায় যৌথ টহল পরিচালনা, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত বিধিনিষেধ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বন্ধে যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেনসিডিল প্রবেশের বিষয়ে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, ফেনসিডিল ভারতে নিষিদ্ধ, বৈধভাবে ফেনসিডিল উৎপাদন হয় না।

এ বিষয়ে বিএসএফের নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত বছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার বোতল ফেনসিডিলসহ বিপুল পরিমাণ অন্য মাদক আটক করা হয়েছে। ফেনসিডিলসহ বাংলাদেশে যেকোনো মাদক প্রবেশ ঠেকাতে বিএসএফ সচেষ্ট রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নন লেথেল অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত প্রশংসার দাবিদার। সীমান্ত হত্যাকা-ের কারণে বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের সম্পর্কে প্রায়ই ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে তা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অপরাধীদের সামাল দিতে নন লেথেল অস্ত্রের ব্যবহার হত্যাকা-ের ঘটনা শূন্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে। পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক বৃদ্ধিতেও তা সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুটি দেশ একই সঙ্গে সার্ক, বিমসটেক, আইওয়া এবং কমনওয়েলথের সাধারণ সদস্য। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলা ভাষা ব্যবহার হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী জোটের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এক কোটি উদ্বাস্তুকে আশ্রয়দান ও স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ২৫ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি, ১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক উদারীকরণের সূত্রপাতের সঙ্গে তা বৃহত্তর প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের উদ্ভব ঘটায়। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই সন্ত্রাসবাদবিরোধী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তারা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা হয়। বন্ধুদেশ হিসেবে ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে সক্ষম হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দেশ দুটির মধ্যে ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্ককে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার রোল মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে। ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় প্রতিশ্রুত ১১টি উন্নয়ন সহযোগী উদ্যোগের অধিকাংশই এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে মত দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই তো সেদিন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করে আমাদের রাষ্ট্রপতি বলেছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারত (বিবিআইএন) উদ্যোগসহ দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক বহুমাত্রিক হচ্ছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং উভয় দেশই এই সুসম্পর্ক থেকে লাভবান হবে।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড

 

"