অর্থনীতি

নার্সারিশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ও পরিবেশ সংরক্ষণে নার্সারির গুরুত্ব অপরিসীম। নার্সারি হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফুল, ফল, সবজি, ভেষজ ও বনজ গাছের চারা ও কলম উৎপাদন করে বিক্রি বা বাজারজাত করার পূর্ব পর্যন্ত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা হয়। নার্সারির মূল উদ্দেশ্য হলো বৃক্ষরোপণের জন্য উত্তম মানের চারা সরবরাহ করা। বীজ থেকে চারা উৎপাদন নার্সারির অতি সাধারণ কাজ হলেও নার্সারিতে শাখাকলম, গুটিকলম, জোড়কলম ও চোখকলম এবং টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে রোগমুক্ত উন্নতমানের গাছের চারা উৎপাদন ও বিপণন করা হয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে পরিবর্তিত হচ্ছে নার্সারির কর্মকা-। আজকাল অনেক নার্সারিতে টব, সিকেটার, মাটির ফুলদানি, ক্ষুদ্র স্পেয়ার, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যাবিষয়ক বইপুস্তক, জৈব সার, কাট ফ্লাওয়ার এবং বালাইনাশকসহ নানা ধরনের নার্সারি পণ্য বিক্রি হয়। কোনো কোনো নার্সারি থেকে আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সুদৃশ্য গাছসহ টব ভাড়া দেওয়া হয়। পানির উৎস, মাটির গুণাগুণ, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, হাট-বাজার ও বড় শহরের সান্নিধ্য ও সড়ক মহাসড়কের অবস্থান, সামাজিক অবস্থা, বন্যার প্রকোপ প্রভৃতি হলো একটি আদর্শ নার্সারির স্থান নির্বাচনের বিবেচ্য বিষয়। নার্সারিশিল্পকে লাভজনকভাবে গড়ে তোলার জন্য স্থান নির্বাচনের সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হয়। বাণিজ্যিক নার্সারি অবশ্যই শহর-বন্দরের কাছে পাকা রাস্তার ধারে অবস্থিত হতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑএ রকম স্থানে নার্সারির জন্য উপযোগী জমি পাওয়াটা এত সহজ নয়। কারণ পাকা রাস্তার ধারে নার্সারির উপযোগী জমির দাম ও চাহিদা অত্যন্ত বেশি। এ জন্য পাকা রাস্তার পাশে সামান্য জমিতে ক্ষুদ্র পরিসরে বিক্রয় কেন্দ্র খুলে রাস্তা থেকে দূরবর্তী স্থানে চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশে নার্সারিশিল্পের প্রসার ঘটতে থাকে। ১৯৭৪ সালের দিকে রাজধানীর গুলশান এলাকায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে নার্সারি ব্যবসা চালু করা হয়। নব্বই দশকের শুরুতে দেশে ব্যক্তি খাতে চার হাজারের মতো নার্সারি ছিল। বর্তমানে সারা দেশে ছোট-বড় মিলে প্রায় ১৮ হাজার নার্সারি রয়েছে। বাংলাদেশ নার্সারি মালিক সমিতির সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে এ খাতে দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এক দশক ধরে সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও বনবিভাগের নার্সারি ছাড়াও বেসরকারি এবং ব্যক্তিপর্যায়ে নার্সারি স্থাপনের ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এ জন্য নার্সারি উদ্যোগক্তাদের যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বনবিভাগ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্যোগে দেওয়া হচ্ছে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে পরিবেশ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, দারিদ্র্যবিমোচনসহ অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত রয়েছে। নার্সারি ব্যবসা করে গ্রামের বহু ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন। চাষের জন্য জমি কিনেছেন। পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন। এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত সারা দেশে রয়েছে। নার্সারি স্থাপন করে বৃক্ষরোপণ কাজে অসামান্য অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক পেয়ে বহু লোক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকা শহরে কৃষিবিদ নার্সারি, ধানমন্ডি নার্সারি এবং কৃষিবিদ উপকরণ নার্সারির মতো অনেক বিখ্যাত নার্সারি থাকলেও দেশের সেরা নার্সারিগুলোর মধ্যে বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সবুজ নার্সারি অন্যতম। ওই নার্সারিতে প্রতি বছর লাখ লাখ ফুল, ফল, কাঠ ও ভেষজ উদ্ভিদের চারা বিক্রি করা হয়। সবুজ নার্সারিকে কেন্দ্র করে বগুড়া সদর, মহাস্থান, শিবগঞ্জ, ঠেংগামারা, মোকামতলা, ফাসিতলা, গুজিয়া, দাড়িদহ, গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় নার্সারি। ওই সব নার্সারিতে শুধু বৃক্ষের চারা নয়; শীতকালীন সবজি-ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মিষ্টি মরিচসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফুলের প্রচুর চারা বিক্রি করা হয়। নার্সারি ব্যবসা বগুড়া ও গাইবান্ধা জেলার গ্রামগুলোয় এখন গরিব গৃহস্থ পরিবারগুলোর আয়ের একটি অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বগুড়া কেন? যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঢাকা, সাভার, গাজীপুর, নাটোর, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারা দেশে নার্সারি ব্যবসা এক প্রকার সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই ব্যক্তি উদ্যেগে দ্রুত প্রসার লাভ করছে। তুলনামূলকভাবে খুলনা বিভাগে নার্সারিশিল্পের প্রসার ঘটেছে বেশি। খুলনার মাটি ও আবহাওয়া চারা গাছ উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী। খুলনা জেলার খুলনা সদর, দৌলতপুর, রূপসা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, দিঘলিয়া ও তেরখেদা উপজেলায় প্রচুর নার্সারি থাকলেও ফুলতলা উপজেলায় নার্সারির সংখ্যা অনেক বেশি। ২০০০ সালের দিকে খুলনা জেলার শুধু ফুলতলা উপজেলাতেই ১০২০টি নার্সারি গড়ে ওঠে। ফুলতলা উপজেলার বুড়িয়াডাঙ্গা গ্রামকে বলা হয় নার্সারির গ্রাম। এ গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠানে, আঙ্গিনায়, খেত-খামারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নার্সারি। যতদূর চোখ যায়, শুধু দেখা যায় শত শত সবুজ চারা গাছের সারি। ওই গ্রামের বাবুল হাসান, মনিরুল, ওহিদুলের মতো বেকার যুবকরা নিঃস্ব অবস্থা থেকে নার্সারি ব্যবসার বিনিময়ে হয়েছে লাখপতি। এ গ্রামে কোনো বেকার লোক নেই। নেই কোনো নিরক্ষর মানুষ। গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক নার্সারি। ফুলতলা দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপজেলা, যার একটি বিরাট অংশ সারা বছর জলমগ্ন থাকে। ফলে সেখানে প্রচলিত কৃষিকাজ করে জীবনধারণ করা খুব কষ্টকর ব্যাপার। এ অবস্থায় সেখানকার মানুষ অল্প জমি থেকে বেশি আয়ের পথ খুঁজতে থাকে। একসময় তারা পেয়েও যায় সে পথের সন্ধান। সেটা হলো প্রচলিত দানাশস্যনির্ভর কৃষিব্যবস্থা থেকে উদ্যান ফসলের চারা উৎপাদনের লাভজনক ও অধিক আয়ের কৃষিপ্রযুক্তি। ফুলতলা উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মতো নার্সারিশিল্প গড়ে উঠেছে।

সাশ্রয়ী দাম ও ভালো মানের জন্য ব্যবসায়ীরা ফুলতলা থেকে চারা কিনে নিয়ে যান সারা দেশের বিভিন্ন জেলায়। বাংলাদেশে সারা বছর কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ কোটি ফলদ, বনজ, ভেষজ, ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা বিক্রি করা হয়। গড়ে প্রতিটি চারার দাম ত্রিশ টাকা করে হলেও বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা নার্সারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে আদান-প্রদান হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল ও সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। নার্সারিশিল্প শুধু গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতেই সহায়তা করে না। নার্সারি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তের ঝুঁকি মোকাবিলা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিক্ষয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য ও পুষ্টি সমস্যা সমাধানে বহুমাত্রিক অবদান রাখে। বেকার সমস্যা সমাধানে নার্সারির ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৭০ ভাগই হলো তরুণ। প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে ২২ লাখ লোক প্রবেশ করে; কিন্তু কাজ করার সুয়োগ পায় মাত্র ১০ লাখ লোক। বাকি ১২ লাখ লোক বেকার জীবনযাপন করে। নার্সারিশিল্পের মাধ্যমে দেশের বেকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে স্বল্পপুুঁজির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব। মানুষের আয়, নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি ও সৌন্দর্য বোধের পরিবর্তন ঘটছে। বাড়ছে বসতবাড়ির সংখ্যা। ছায়া, বাতাস, জ্বালানি, আসবাবপত্র, ঘরবাড়ি তৈরি, পুষ্টি ও খাদ্যের প্রয়োজনে মানুষ বসতবাড়ির আশপাশে রোপণ করছে প্রচুর ফলদ, বনজ ও ভেষজ বৃক্ষের চারা। যত দিন যাচ্ছে উদ্যান উদ্ভিদের চারার চাহিদা ততই বাড়ছে। তাই মানুষের ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণের জন্য সারা দেশের গ্রামগঞ্জে গড়ে তুলতে হবে অসংখ্য মানসম্মত নার্সারি। বাংলাদেশে বীজ উৎপাদনকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও নার্সারি ব্যবসাকে এখনো শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এর উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য নেওয়া হয়নি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা। নেই এ শিল্পের দক্ষ জনশক্তি গড়ার জন্য কোনো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। নার্সারিশিল্পের আরো অনেক সমস্যা রয়েছে। যেমন : গুণগত মানের বীজ, চারা ও মাতৃবৃক্ষের অভাব। পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব। চারা ও কলমের নিম্নমূল্য। উন্নত মানের চারা উৎপাদন, পরিচর্যার ও সংরক্ষণের লাগসই প্রযুক্তির অভাব। চারা গাছের পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনের প্রযুক্তিগত সমস্যা। সেচ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির স্বল্পতা। বাজারজাতকরণের সমস্যা। সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা ইত্যাদি। এসব সমস্যার সমাধানে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে নার্সারিশিল্প সত্যিকারের শিল্প হিসেবে গড়ে উঠবে। দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে নার্সারি পণ্য বিদেশে রফতানি হবে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও সুগম হবে।

লেখক : কৃষিবিদ

netairoy18@yahoo.com

 

"