পর্যালোচনা

কোটা থাকা না থাকা

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

সোলায়মান মোহাম্মদ

আমার জন্ম স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক পরে। আব্বাও সে সময় বয়সে ছোট ছিলেন, তাই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু প্রায় সময়ই আব্বাকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, ‘ইশ! যদি আর একটু বড় হতাম তবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারতাম।’ আব্বার মুখে আক্ষেপের এ কথাগুলো শুনতে শুনতে নিজের মধ্যেও বড় ধরনের একটি আক্ষেপের বাসা বাঁধে। মনে মনে প্রায়ই বলি ইশ আমি যদি সে সময় থাকতাম, ছোট থাকলেও আমি যুদ্ধে যেতাম, আমাকে কেউ আটকাতে পারত না। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে আসে। যুদ্ধে যাওয়ার লোভটা আরো বেড়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবি তা তো এখন আর সম্ভব না। ভাবতে ভাবতে একপর্যায়ে মনের মধ্যে একটু শান্তি পাই, তবু তো স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। যারা দীর্ঘ নয় মাস ব্যাংকারে ব্যাংকারে থেকে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এ ভূখ-ের স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন। অনেকেই এখনো জীবিত রয়েছেন, তারাই তো জীবন্ত কিংবদন্তি। জীবন্ত কিংবদন্তি উসাইন বোল্টেকে দেখতে আমেরিকার জ্যামাইকা যেতে হবে না। মোহাম্মদ আলী মারা গেছেন ভেবে দুঃখ করার কোনো প্রয়োজন নেই যে কিংবদন্তি দেখতে পারলাম না। বাড়ির পাশে যিনি মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, তিনিই তো জীবন্ত কিংবদন্তি। যারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে নিশ্চিত মৃত্যু ভেবেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। আর ফিরে আসা হবে না নিজ গৃহে। ঘরে নববধূ, বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা-মা, আবার অনেকেই শিশুসন্তান রেখে চিরবিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে সেদিন বের হয়েছিলেন আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে। যারা সেদিন যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাদের রেখে যাওয়া পরিবারও সেদিন যে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন, তা শুনলেও গায়ের সব কটি লোম দাঁড়িয়ে যায়। সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের গর্ভবতী স্ত্রী অথবা সবেমাত্র সন্তান জন্ম দেওয়া শিশুকে নিয়ে সে স্ত্রী বা মায়েদের যে কি করুণ পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে, তা সত্যিই অবর্ণনীয়। রাজাকারদের হাত থেকে সন্তান ও নিজেকে রক্ষা করতে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া ওই পরিবারের মায়েদেরও সেদিন রাতদুপুরে খেয়ে না খেয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন তারা কিন্তু কিছু পাওয়ার আশায় যায়নি। কিছু পাওয়ার আশা কীভাবে করবে নিশ্চিত মৃত্যু ভেবেই তো গিয়েছিল, আল্লাহ হায়াত দান করেছেন সে জন্য জীবন নিয়ে অনেকেই ঘরে ফিরতে সক্ষম হয়েছিলেন।

যাক সেসব কথা, দেশ কীভাবে স্বাধীন হয়েছে তা কারো অজনা নয়। সম্প্রতি কোটা সংস্করণের দাবিতে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তাল হাওয়া বইছে। এ নিয়ে এক রকম কালবৈশাখী তা-ব বয়ে গেল। সব মিলিয়ে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে পুলিশি হামলা। দ্বিতীয়ত, ভিসি স্যারের বাসভবনে ভাঙচুর এবং তৃতীয় ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে হেনস্তা। সর্বশেষ যেটিতে সারা দেশের মানুষ নড়েচড়ে বসেছেন, সেটি হলো সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কোটা না রাখার ঘোষণা।

সরকারি চাকরির নিয়োগে মোট ২৫৮ ধরনের কোটাব্যবস্থা চালু আছে। নিয়োগে ৫৬ শতাংশ কোটাধারীদের আর বাকি ৪৪ শতাংশ মেধাবীদের জন্য নির্ধারিত। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০, নারী ১০, জেলা ১০, উপজাতি ৫ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ মোট ৫৬ শতাংশ কোটাব্যবস্থা সেই ১৯৭২ সাল থেকেই বিদ্যমান। মূলত এই কোটাব্যবস্থা সংস্করণের জন্যই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। শিক্ষার্থীরা কোটা একেবারে বাদ দেওয়ার জন্য আন্দোলন করেননি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সর্বশেষ খবর হলো তারা এখনো আন্দোলনমুখী। ভিসি স্যারের বাসভবনে ভাঙচুরের ঘটনায় অনেকের নামে মামলা হয়েছে। সেই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এখন আন্দোলন করতে চাচ্ছেন।

আন্দোলন হয়তো দু-চার দিন পর থেমে যাবে কিন্তু সারা দেশের মানুষের মধ্যে এখন একটিই শুধু ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জাতীয় সংসদে কোটা না রাখার ঘোষণা। কয়েক দিন আগে গাজীপুরের কাপাসিয়াতে মুক্তিযোদ্ধারা মানববন্ধন করেছেন তাদের কোটাব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য। কোটাব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধী কোটা রাখা আবশ্যক বলেও অনেকেই মন্তব্য করছেন। অন্যান্য কোটা বাদ বা কমিয়ে আনা যেতে পারে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধী কোটা বাদ দেওয়া কতটুকু যুক্তিসংগত সেটি গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখা দরকার। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন করে তাদের কোটা দিতে বলেননি। তাদের সম্মান দেখিয়ে এ কোটা দিয়েছিল সরকার। সরকার চাইলেই এটি আবার বাদ দিতে পারে কিন্তু এ মাতৃভূমি সৃষ্টিকারীদের সম্মান দিয়ে আবার সম্মান কেড়ে নেওয়াটাও অসংগতি বলে মনে করছেন অনেকে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কোটার সুযোগ তাদের নাতি-নাতকরদের সবার জন্য না করে একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতায় করা যেতে পারে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের এখন আর চাকরির বয়স নেই, তাই তাদের পরিবার থেকে যেকোনো একজনকে সরকারি চাকরির সুযোগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছেন বলেই কোটাব্যবস্থা বাদ দিতে হবে এমনটি নয়। আজকে একদল কোটা সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন করছে, কালকে অন্যদল কোটাব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য আন্দোলন করবে। সরকারের শেষ সময়ে এসে সম্পূর্ণভাবে কোটা ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়া সরকারের জন্য কতটা সুখকর হবে, সেটিও ক্ষমতাশীন দলের ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করছে অনেকেই।

লেখক : কলামিস্ট

"