মতামত

বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

মীর আবদুল আলীম

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে আগামী ১৫ মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের বছর এটা। পুরো বছরটাই নির্বাচন ঘিরেই কাটবে। বিগত নির্বাচনগুলো একতরফা হলেও, এবার মনে হচ্ছে তা হবে না। যেকোনো মূল্যে বিএনপি নির্বাচনে যাবেÑএমন অভাসই পাওয়া যাচ্ছে। ৩১ মার্চের এক সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।’ বড় রাজনৈতিক দুদল নির্বাচনে গেলে যা হয় তাই হয়তো হবে। আবহাওয়াটা ফের গোমট ঠেকছে। বোধ করি আলোর দেখা মিলবে না। রাজনৈতিক যুদ্ধ আবারও হবে। আবারও অশান্তির দাবানলের ভয়; পেট্রল বোমে মানুষ পুড়ে মরার ভয়; পুলিশের গুলিতে জীবন যাওয়ার ভয়; শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নষ্টের ভয়; মামলা-হামলার ভয়; জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হওয়ার ভয়; সম্পদ নষ্টের ভয়; সর্বোপরি ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংসের ভয় আমাদের পেয়ে বসেছে। গণতন্ত্র, সুষ্ঠু রাজনীতি, অপরাজনীতি এসব নিয়ে আলোচনায় আসতে চাই না। তবে এটাই বলতে চাই, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এ সরকারে সময়টা খুব একটা খারাপ যায়নি। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ শুরু হয়েছে, দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। গণতন্ত্রের ঘাটতি থাকলেও, হরতাল, অবরোধ না থাকায় জনমনে স্বস্তি ছিল। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পেরেছে, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন হয়েছে। ভয় এখানেই; এ ধারা ঠিক থাকবে তো? আবার জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর, হরতাল-অবরোধ এসব হবে না তো? বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসছে নির্বাচনে তারা যাবেই। হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে রাজপথ দখলের। তাদের কথায় বোঝা যাচ্ছে, সেই যুদ্ধ আবারও শুরু হবে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় আবার বধ হবে দেশের আমজনতা। আগের স্টাইলে মানববিরোধী আন্দোলন হলে অশান্তি বাড়বে। অর্থনীতি ধ্বংস হবে। দেশে বেকার বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দেবে। সে যুদ্ধে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হবে। এমনটা আমরা আর চাই না।

তবে এটাও সত্য, বিরোধী দলের রাজনীতি করার পরিবেশ দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। দেশের স্বার্থে সরকারকে ছাড় দিতে হবে, তবেই দেশে শান্তি বিরাজ করবে। তবে বিরোধী দলকে মনে রাখতে হবে, কোনোভাবেই দেশের জানমাল নষ্ট হয় এমন কর্মসূচি তাদের আর দেওয়া ঠিক হবে না। জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি বিএনপিকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে। তারা জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে নানাভাবে অনেক পেছনে পড়েছে এবং এর খেশারতও তাদের দিতে হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো সহনশীল হবে সে সঙ্গে সরকারি দলও সব ক্ষেত্রে সদয় হবেনÑএমন প্রত্যাশা আমরা করছি। বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই অস্থিরতা আর ভয়। এবারও আমরা রাজনৈতিক মাঠে এমন পরিবেশ লক্ষ করছি। প্রকৃতিতে যেমন কালবৈশাখী শুরু হয়ে গেছে তেমনই, রাজনৈতিক অঙ্গনেও উথাল-পাথাল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পত্রিকা খুললেই রাজনীতির গরম খবর দেখতে পাই। রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচনকে ঘিরে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্বাচনকে ঘিরে বেশ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তবে তারা দেশে নির্বাচনকে ঘিরে আর কোনো অশান্ত পরিবেশ চায় না। জনগণ ভুলে যায়নি সেই ভয়াল স্মৃতি। ১৯৯৬ আর ২০১৩-১৪ কি ভয়ংকর ছিল। সেই স্মৃতি হাতড়ে জনগণ ভড়কে যাচ্ছে। আবার এমনটা হবে না তো, জাতীয় নির্বাচনের যেখানে আর মাত্র ৮-৯ মাস বাকি। এ নির্বাচনকে ঘিরে কী হবে? জনগণ চায় ঝামেলামুক্ত অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করে। বেসরকারি দলের জ্বালাময়ী বক্তব্য যেমন, তারা আশা করে না, তেমনই তারা সরকারি দলের কাছে সমতা সঠিক নির্বাচনের প্রত্যাশা করে। এ অবস্থায় কী করবে নির্বাচন কমিশন? আমরা জানি, নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপরই ন্যস্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সব নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করার জন্য ওয়াদা করেছেন। তিনি তার ওয়াদা রক্ষা করবেনÑএটাই চাওয়া।

কবছর আগে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে আমরা প্রতিদিন কী দেখেছি? নৈরাজ্যের মহাযজ্ঞ। সে কথা এখনো ভুলে যাইনি কেউ। হতভাগ্য বাবার চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ কিংবা পেট্রল বোমায় ঝলসে যাওয়া ছেলের চিৎকার শুনেছে সবাই। সম্পদ হারিয়ে পথে বসতে দেখেছি অনেককে। এরা তো সবাই রাষ্ট্রেরই নাগরিক ছিল। এদের তো বাঁচার আর সম্পদ রক্ষারও অধিকার ছিল। কিন্তু ওইসব দানবের হাত কেউই তাদের রক্ষা করতে পারেনি। প্রতিনিয়ত চোখের সামনে এসব ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। কিছুই করতে পারিনি আমরা। এসব রোধে আইন আছে। নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৬-৪৭ক অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নাগরিকের অধিকারগুলো বর্ণিত আছে। সেখানে কাউকেই নির্বিচারে মানুষ হত্যার বৈধতা দেওয়া হয়নি। এ হত্যার দায় যেমন বিরোধী দলের ছিল, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সরকার দলও এ দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না। যখন হরতাল-অবরোধের নামে জীবন্ত মানুষ পুড়ে কয়লা হয়, যখন তাদের উপার্জনের একমাত্র সম্বল কেড়ে নেওয়া হয়, অসহায় স্বজনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়; যখন কষ্টার্জিত লাখ লাখ টাকার সম্পদ চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ কথা বলতেই হয়, সুস্থ গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে না পারাটা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিক। যাই হোক, আমরা স্বাধীন হয়েছি তা প্রায় ছেচল্লিশ বছর পেরিয়েছে। ষড়যন্ত্র, গোপন তৎপরতা আমাদের রাজনীতিতে লেগেই আছে। যখনই দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় আসে, ঠিক তখনই নির্বাচনকে ঘিরে শুরু হয় গোপন তৎপরতা ও ষড়যন্ত্র। আরেকটি সাধারণ নির্বাচন সামনে। বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটও। এতে আপামর জনসাধারণ খুশি এবং নির্বাচনের প্রতি তাদের সমর্থনও আছে।

যতদূর জানা যায়, নির্বাচন শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই হবে। এ ব্যাপারে তারা বদ্ধ পরিকর। এহেন পরিস্থিতিতে বিএনপি কোন পথে যাবে? তবে, এ অবস্থায় বিরোধী দল কতদূর যেতে পারবেÑসেটাই প্রশ্ন। বিএনপির ধারণা ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচিত সরকার কয়েক মাসের বেশি টিকবে না। তারা আন্দোলনের মাধ্যমে অবার সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করবে। বাধ্য হয়ে তাদের দাবি মেনে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেবে। সে আশায় বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে পস্তাল। এবার তারা তা করবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনে তারা যাবেই। এটা শতভাগ সঠিক। যদিও রাজনৈতিক গেমলারের ভূমিকায় এখন বড় দুই দল। দাবার গুটির মতো সুদূরপ্রসারী চিন্তায় যে চাল দেবে, তার গলায় উঠবে বিজয়ের মালা। কিন্তু বিজয়ের মুকুট যার মাথায় উঠুক এটা নিয়ে এ দেশের মানুষ খুব একটা ভাবে না। দেশের মানুষ চায় সুষ্ঠু নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে অনাহূত রক্তপাত যেন না ঘটে। আমরা গঠনমূলক রাজনীতি চাই। ব্যক্তি স্বাধীনতা চাই। ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পরিবর্তন চাই। সরকারি দলের উচিত হবে বিরোধী দলের দাবিগুলোকে সম্মান জানানো। আবার বিরোধী দলেরও উচিত হবে সরকারকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া এবং দেশ পরিচালনায় সহায়তা করা। দেশের জাতীয় স্বার্থে দুই দলকে একই প্লাটফরমে দাঁড়াতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

"