সাফল্য

পঞ্চগড়ে শেফালী

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কৃষি। কৃষি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। পৃথিবীর সূচনা থেকেই মানবসম্পদ উন্নয়নসহ সমাজ ও পারিবারিক কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সভ্যতার বিবর্তনে সেই অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়েছে, কমেনি এতটুকুও। কৃষিশিক্ষা, ফসলের মাঠ থেকে গবেষণাগার, সর্বত্রই রয়েছে নারীর অবদান ও অংশগ্রহণ। আধুনিক কৃষিতে তাদের অংশগ্রহণ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণাগার কিংবা গবেষণা মাঠে নারী-পুরুষ কাজ করছে সমান তালে। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারীরা এখন অনেক এগিয়ে, শুধু কৃষি নয় বরং সব ক্ষেত্রেই নারীরা রাখছে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর। তাদের সাফল্য দ্যুতি ছড়াচ্ছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বেও। দেশের নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পৌঁছায় সাফল্যের শীর্ষে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীদের পদচারণে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে।

কয়েক দিন আগে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি কৃষি ক্ষেত্রে হাড়িভাসার ইউনিয়নের শেফালী বেগমের সফলতার কথা। তার কৃষি খামারে পা রাখতেই আমি অবাক হয়ে যাই, এমন অজপাড়া গ্রামের শিক্ষিত একজন নারী কৃষিকাজকে বেছে নিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল এক কমলার বাগান। এ সফলতার বিষয়ে কথা বলি তার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি যখন দেখলাম গ্রামের সব মহিলা অযথা সময় নষ্ট করে, তাই আমি ভাবলাম অযথা সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করি। অনেক ভেবে ঠিক করলাম কমলা চাষ করব, যেহেতু আমার পুরোনো কমলা গাছটিতে খুব ভালো কমলা ধরছে, বাগান আকারে করলে মনে হয় সফলতা আসবে। এই ভেবে পঞ্চগড় জেলার কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে কমলা চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয় এবং চারা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে এবং উৎসাহ দেয়। এখন আমার খুবই ভালো লাগে কমলা গাছের যতœ করতে। আমি সংসারের কাজকর্ম এবং সন্তানদের পড়ালেখা দিখিয়ে বাকি সময়টা কমলা বাগানে দেই। এতে আমার সময়ও ভালো কাটছে আর মনটাও প্রফুল্ল থাকছে। আমার দেখাদেখি এখন অনেক মহিলাই অযথা সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করছে। গত আট বছর আগে আমরা প্রথমে শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে কমলার চাষ শুরু করি। বর্তমান জমির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করেছি। রোপণের মাত্র এক বছরের মাথায় কমলা চারাগুলো অনেক বৃদ্ধি পায় এবং দ্বিতীয় বছর থেকেই বেশ কয়েকটি গাছে বড় বড় কমলা ধরতে শুরু করে। আর এখন তো বাগানের অধিকাংশ গাছেই ফল ধরছে। গত বছর যে টাকা আয় করেছিলাম এ বছর এর দ্বিগুণ আয় করব বলে আমরা আশা করছিলাম, তবে এ বছর প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় ফলের ক্ষতি হয়েছে। এই কমলা বাগানের আয় থেকে আমাদের সংসার খুব ভালোভাবেই চলছে।

তবে শেফালী বেগমের একটি দুঃখ, তিনি বলেন, কৃষি ক্ষেত্রে নারীদের অপরিসীম অবদান থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে আমরা অবহেলিত। কৃষাণী হিসেবে এখনো তেমনভাবে আমাদের স্বীকৃতি মেলেনি। অথচ কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের ফলে একদিকে যেমন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ছে অন্যদিকে মাথাপিছু আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের যদি সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হয় তাহলেই কেবল সামনের দিনে নারীরা কৃষিতে নতুন সবুজ বিপ্লব ঘটাতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

বাংলাদেশের উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, পশ্চিমে পূর্ণিয়া ও পূর্বে জলপাইগুঁড়ি জেলা। দার্জিলিং ও জলপাইগুঁড়ি জেলায় ব্যাপক কমলার আবাদ হয়। জেলাগুলো বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার সীমানা স্পর্শ করেছে। সেখানকার জলবায়ু, পরিবেশ, মাটি আর পঞ্চগড়ের জলবায়ু, পরিবেশ, মাটি প্রায় একই। পার্শ্ববর্তী জেলায় যদি বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ হয় তাহলে আমাদের দেশে হবে না কেন, এ সূত্র কাজে লাগিয়েই পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষের যাত্রা শুরু হয় প্রায় ৮-৯ বছর আগে।

এ অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটি কমলা চাষের উপযোগী হওয়ায় কমলা চাষকে বাস্ততায় রূপ দিয়েছে এ জেলার মানুষ। বর্তমানে পঞ্চগড়ে কমলা চাষের ফলে পাল্টে যাচ্ছে এ জেলার আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ধারা। পঞ্চগড়ের চা চাষের সমৃদ্ধি যেমন আমাদের অর্থনীতিতে অনুকূল প্রভাব ফেলেছে, তেমনি এই প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি মাত্রা, তা হলো রসাল ফল কমলা চাষ।

পঞ্চগড় জেলায় কমলা চাষের বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে কমলা আমদানির হ্রাস ও এর আমদানি বৃদ্ধি, পুষ্টি চাহিদা মেটানো ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার ২০০৬-০৭ অর্থবছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অধীনে কমলা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। এ প্রকল্পের অধীনে জেলার চারটি উপজেলায় গ্রামভিত্তিক কমলা গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় ও এর আশপাশে ব্যক্তিপর্যায়ে কমলা চাষের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের মধ্যে ৮৮ হাজার কমলা চাড়া বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১৯৫টি দুই বিঘা বাগান গড়ে তোলা হয়, প্রতিটি বাগানে ১৫৬টি করে চারা রোপণ করা হয়।

কমলাগাছ পাঁচ বছরেই ফল ধারণ করে। আট বছর বয়সী একটি কমলাগাছে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০টি কমলা ধারণ করে। এ পর্যন্ত এ জেলায় ১৪১ হেক্টর জমিতে বাগান আকারে কমলা চাষ করা হয়েছে, যা আগামী দুই বছরে পূর্ণ উৎপাদন শুরু করবে। আশা করা যায়, আগামী ১০ বছরের ভেতরে পঞ্চগড় জেলা কমলা উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থান দখল করবে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে পঞ্চগড়ের কমলার চাষ দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের কমলার চাহিদা পূরণেও অনেক অবদান রাখবে।

লেখক : গবেষক, কলামিস্ট

masumon83@yahoo.com

 

"