মুজিবনগর দিবস

মুজিবনগর সরকার স্মরণীয় হয়ে থাকবে

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

মুজিবনগর সরকার বলতে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথপুর আমতলায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের বাইরে গিয়ে ১০ এপ্রিল যে সরকার গঠন করেছিলেন, ১৭ এপ্রিল সে সরকারই বাংলাদেশের মাটিতে মুক্তাঞ্চল (মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একচ্ছত্রভাবে বিজয়ী হয়। স্বভাবতই পাকিস্তানের বৃহত্তম বিজয়ী দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত ছিল। পাকিস্তানি শাসকরা বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয়ী নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ষড়যন্ত্র করেন। চাপের মুখে মার্চের প্রথম তারিখে সংসদের অধিবেশন ডাকা হলেও ভুট্টো সাহেব তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে সংসদ অধিবেশন বসলে তা কসাইখানায় রূপান্তরিত হবে। আর বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ছিল, পাকিস্তান সরকারকে তার নির্বাচনে ম্যানডেট ও ৬ দফাকে মেনে নিয়েই ৬ দফাভিত্তিক সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সব পাকিস্তানি নেতাকে জানিয়ে দিলেন, ৬ দফা প্রশ্নে তিনি কোনো আপস করবেন না। ৬ দফাভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাকে নির্বাচিত করেছে। তাই ৬ দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর এই সুদীর্ঘ মনোভাব বুঝতে পেরে ভুট্টো ও সামরিক শাসকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, ক্ষমতা হস্তান্তর না করার। সে কারণেই ১ তারিখে অধিবেশন বাতিল করে দেওয়া হলো। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল। বঙ্গবন্ধু অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন এবং ওই অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তান সরকারের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করেন। তার নেতৃত্বে সিভিল প্রশাসন চালু করলেন। মূলত পহেলা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকার্য পরিচালনা হচ্ছিল। তখন একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও পাকিস্তানের পতাকার অস্তিত্ব দৃশ্যমান ছিল না। একজন পিয়ন থেকে শুরু করে হাইকোর্টের জাস্টিস পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নিয়ম মেনে চলেছিলেন। ওই আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই পূর্ব বাংলার শাসন করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন।

পূর্ব বাংলার জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই পূর্ব বাংলা শাসন করবার কোনো আইনগত অধিকার পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের নেই। বঙ্গবন্ধু বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তিনিই সরকারপ্রধান হিসেবে সে দেশ শাসন করছেন। বাংলাদেশে কোনো সরকার নেই। পাকিস্তানি শাসকরা তখন সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার। ২৫ মার্চের কালরাতে তারা বাঙালির ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথম রাতেই প্রায় ১ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। পুলিশ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত কাউকে ছাড় দেয়নি। তাদের এ হত্যাকা-ের পরপরই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং বাংলাদেশের জনগণকে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে হানাদার বাহিনীকে চিরতরে উৎখাত করার ঘোষণা করেন। হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে অবরুদ্ধ রাখে।

এদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের অভ্যন্তর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয় ভেবে পাশের রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেন এবং ১০ এপ্রিল তারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিপ্লবী সরকার গঠন করেন। ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ আর বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে পালন করার অনুমতি দেওয়া হয়। এ সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় ও ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্ভব হয়। ভারতীয় বাহিনী, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা এবং মিত্রবাহিনী যৌথভাবে এ যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে অংশ নেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অগণিত ভারতীয় বাহিনীর সদস্যকে জীবন দিতে হয়। তাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ভারত সরকার ও জনগণের অবদান অবিস্মরণীয়। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ওই মহিলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক যখনই প্রয়োজন, তখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে অতি স্বল্প সময়ের ভেতর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর রণকৌশল ও মুক্তিবাহিনীর তীব্র বাধার মুখে হানাদার বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে। আসলে মুজিবনগর সরকারের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল ৮ নম্বর থিয়েটার রোড, কলকাতা। সেখানেই ছিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অফিস। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এ সরকারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্যান্য দেশের বিপ্লবের মতো আত্মগোপন করে এ সরকার তার দায়িত্ব পালন করেনি। বরং এটা ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা একটা বৈধ সরকার। যার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ছিল এবং গোটা বিশ্বে যার পরিচিতি ছিল সুবিদিত। ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকার অথবা ফিডেল কাস্টো ও চেগুয়েভার আত্মগোপনকারী সরকারের মতো এ সরকার ছিল না। একটা নির্বাচিত বৈধ সরকারের অধীনেই বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং এর কারণ ১৯৭১-এ বাংলাদেশে যে সমাজ বিপ্লব ঘটে, তার উৎস ছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রাম, নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলনের সবকিছুই করা হয়েছিল গণতান্ত্রিক ধারায়। শুধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণার পরপরই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ৬ দফার দাবি আদায় করে নিতে। সে দাবি যখন আদায় করা গেল না, তখনই বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র সংগ্রামের কথা চিন্তাভাবনা করেছেন এবং সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। যারা বলে থাকেন, কোনো কিছুর প্রস্তুতি ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল ও ভারতে গিয়েই সব প্ল্যান-প্রোগাম করা হয়েছিল। তারা প্রকৃত ইতিহাস অবগত নহে। আসলে অনেক আগে থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিকল্পনা শুরু করা হয়। ৬০-এর দশকের শেষের দিকে কলকাতার ভবানীপুরে গেলে পার্কের ওপর বাংলাদেশ হাউস নামে যে ভবনটি কেনা হয়েছিল, সেখানে কে থাকতেন এবং কী দায়িত্ব পালন করতেন, তা অনেকেই অবগত নহে। কার পরামর্শে কী কারণে বিএলএফ গঠন করা হয়েছিল, তা উচ্চপর্যায়ের ছাত্রলীগের মাত্র ২-৪ জন নেতা ছাড়া কেউ জানতেন না। শেখ মনি ও তোফায়েল আহমেদকে বঙ্গবন্ধু তার শেষ সাক্ষাৎকারে কী বলেছিলেন, তা যদি সঠিকভাবে জাতি জানতে পারত, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে ছাত্রনেতারা স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল পরিকল্পনা করেছিলেন, অগ্রহণযোগ্য যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হতো না। আমাদের পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং তৎকালীন স্লোগানগুলো হঠাৎ করে সৃষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। ছাত্রনেতাদের দিয়ে বঙ্গবন্ধু সবকিছুই করেছিলেন, তবে মূল প্রেরণা, বুদ্ধি-পরামর্শ ও নির্দেশনা মূল ব্যক্তিটি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ৫০-এর দশক থেকে যিনি স্বাধীনতার পরিকল্পনা অত্যন্ত গোপনভাবে করে আসছিলেন, তাই ইতিহাস বিকৃতির কোনো অবকাশ নেই। এ কথার অর্থ এ নয়, ছাত্রনেতারা বিশেষ করে সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী মুক্তিযুদ্ধে তাদের কোনো অবদান ছিল না। নিশ্চয়ই তারা সম্মিলিতভাবে সেদিন এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে যা কিছু করা হয়েছিল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে, স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপান্তরিত করা তিনিই করেছিলেন, তাই তিনি সার্থক জাতির জনক। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ পুরুষ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তাই মুজিবনগর দিবসে দীপ্ত শপথ হোক, স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও শহীদদের আত্মত্যাগ কোনো ক্রমেই বিফল হতে দেব না। বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা লাভ। আর মুজিবনগর সরকার সেই দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মুজিবনগর সরকার স্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার সূতিকাগার কুষ্টিয়ার মুজিবনগর সরকারের গুরুত্ব ও মর্যাদা যুগে যুগে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্মৃতি বহন করবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপদেষ্টা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

 

"