মতামত

শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

ইফতেখার আহমেদ টিপু

প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ১০ সদস্যসহ ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। গ্রেফতারদের মধ্যে তিনজন ব্যাংক কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে আটক করা হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ১৩টি বিশেষ ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা ব্যবহার করে বিভিন্ন ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং প্রশ্নের সমাধান করার অবৈধ কর্মকা-ে জড়িত ছিল এ চক্রের সদস্যরা।

এ চক্রের সদস্যরা গত ২৩ মার্চ সোনালী ব্যাংক ও তার আগে ১৬ মার্চ রূপালী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নের সমাধান করে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইস সাদা চোখে দেখলে মনে হবে কোনো ব্যাংকের সাধারণ একটি মাস্টার ক্রেডিট কার্ড। আদতে এটি মাস্টারকার্ডের প্রলেপ দেওয়া বিশেষ ইলেকট্রনিক যন্ত্র। এ ডিভাইসের ভেতরে থাকা মোবাইল সিমের মাধ্যমে ফোন কল রিসিভ করা যায়। ক্ষুদ্র যন্ত্রটির সঙ্গে একটি ছোট্ট হেডফোন রয়েছে, যা কানে লাগিয়ে কল রিসিভ করে কথা বলা যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা, বিসিএসসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা কেন্দ্রে ওই যন্ত্র ব্যবহার করে পাওয়া যেত প্রশ্নপত্রের সমাধান। কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন ফাঁস করে কয়েক মিনিটের মধ্যে মিলত কাক্সিক্ষত সমাধান।

গোয়েন্দা পুলিশের মতে, চক্রের সদস্যরা ভর্তি ও নিয়োগপ্রার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করত। পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র বাইরে থাকা তাদের চক্রের বিশেষজ্ঞ সদস্যদের পাঠিয়ে দিত। তারা অল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষার্থীর হেডফোনে পৌঁছে দিত সমাধান। গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব-৪-এর পৃথক দুটি অভিযানে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের আরো দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে র‌্যাবের সদস্যরা প্রশ্ন ফাঁস চক্রের আরো ছয়জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। পুলিশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতা সন্দেহে বাংলাদেশে ব্যাংকের একজন সহকারী পরিচালক এবং আরো দুজনকে খোঁজা হচ্ছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অশনিসংকেত হয়ে ওঠা প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে প্রযুক্তিতে দক্ষচক্রের সদস্যরা জড়িত থাকায় এত দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছিল। প্রযুক্তিগতভাবে তাদের মোকাবিলার নীতি গ্রহণ করায় এ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। অপরাধ চক্রের শেষ শিকড় উৎপাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত থাকবেÑআমরা এমনটি দেখতে চাই।

শিক্ষামন্ত্রী সাম্প্রতিক প্রশ্নপত্র ফাঁসকে প্রযুক্তির উন্নয়নের সমস্যা হিসেবে অবহিত করেছেন। বলেছেন, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে কিছু শিক্ষক মোবাইল ফোন বা অন্যান্য কিছু ব্যবহার করে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র খুলে তা প্রচার করে একদিকে যেমন অর্থ রোজগার করছেন, অন্যদিকে সরকারকে বেকাদায় ফেলছেন। কিছুসংখ্যক শিক্ষক যারা আমাদের সম্মান নষ্ট করছেন, সার্বিক সমস্যার সৃষ্টি করছেন, আমরা একটা ব্যবস্থা নিলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে আশা করি এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হবে। এখন থেকে কোনো ধরনের মোবাইল ফোন কেউ পরীক্ষা হলের আশপাশে নিতে পারবেন না। সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে গিয়ে সিটে বসতে হবে, তারপর খাম খোলা হবে। এটা পর্যবেক্ষণের জন্য মোবাইল টিম গঠন করা হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সরকারের এ কড়া পদক্ষেপ সময়োপযোগী সন্দেহ নেই। তবে এতে আসল বিপদ অর্থাৎ প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হবে কিনাÑতা বাস্তবায়ন পর্যায়ের সততা ও দক্ষতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। পরীক্ষা কেন্দ্রে বা ধারে-কাছে মোবাইল ফোন ব্যবহার আগে থেকে নিষিদ্ধ থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি যথাযথ নজরদারির অভাবে। কোচিংবাণিজ্য বন্ধে বারবার হুঙ্কার দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটেনি। প্রশ্নপত্র ফাঁস দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সমূহ সর্বনাশ ডেকে আনছে তা বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক থাকায়। আমরা আশা করব, মন্ত্রী এবার অন্তত কড়া হবেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের লজ্জা থেকে জাতিকে বাঁচাতে সাধ্যের সবকিছুই করবেন।

লেখক : চেয়ারম্যান ইফাদ গ্রুপ

chairman@ifadgroup.com 

"