মতামত

কোটায় না মেধায়

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

সোলায়মান মোহাম্মদ

সন্ধ্যায় হেঁটে স্থানীয় বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম রাস্তার পাশের দোকানে এলাকার অনেকেই খবর দেখছিল। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী আর প্রশাসনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় অনেক ছাত্রই রক্তাক্ত হয়েছেন। এগুলো দেখে অনেকেই বলাবলি করছেন ছাত্ররা কেন যান রাস্তায়, কেন তাদের আন্দোলন করতে হবে? শিক্ষার্থীরা থাকবেন পড়ার টেবিলে, পড়া শেষ করে পরীক্ষা দিতে যাবেন পরীক্ষার হলে। তারা কেন ভাঙচুর করবেন? দু-একজনকে এমনও বলতে শুনলাম এবার বুঝুক চোখ না থাকলে কী হয়।

সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে কয়েক দিন ধরে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে তা গ্রামাঞ্চলের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র আলোচনার ঝড় উঠেছে। কোটার বিষয়টি যে সর্বত্রই মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে তার আরো একটি বাস্তব উদাহরণ দিই তাহলে আরো পরিষ্কার হবে বিষয়টি।

হঠাৎ এক ছোট ভাইয়ের বিয়ের খবর শুনে তাদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখি সত্যি সত্যি বিয়ের আয়োজন। ছোট ভাই দেশের বাইরে থাকে। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ বিয়ে। কনে তুলতে কে কে যাবে তা বলা হচ্ছিল। দেখলাম একজনকে বলা হচ্ছে, আপনি মুরব্বি কোটায় পড়েছেন সুতরাং তাদের সঙ্গে যাবেন। আর বন্ধু কোটা থেকে কয়েকজন। মনে হলো ছোট ভাইয়ের বিয়েটায় হচ্ছে জরুরি কোটায়।

মানে হলো দেশব্যাপী একটা আলোচনার বিষয় তা হলো কোটা ব্যবস্থা। আমি কোটা ব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে নই। তবে কিছু বিষয় জানতে ও জানাতে চাই। চায়ের দোকানের ওই ভাইয়েরা যারা বলাবলি করছিল যে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া রেখে অগত্যা আন্দোলনে কেন নামতে গেলেন? ছাত্র মানুষ লেখাপড়া করবে তারপর পরীক্ষা দেবে। তাদের সঙ্গে প্রথমে সহমত পোষণ করে প্রশ্ন করেছিলাম। আপনাদের কথায় শতভাগ যুক্তি রয়েছে কেন শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া ও পরীক্ষা রেখে আন্দোলনে নামতে গেলেন। কিন্তু বলুন তো লেখাপড়া শেষ করে তারা কী করবে? উত্তরে বলল, কী করবে আবার চাকরি করবে। হ্যাঁ চাকরি করবে, কিন্তু একজন মেধাবী ছাত্র যখন লেখাপড়া শেষ করে চাকরির সন্ধানে সকাল-দুপুর ঘুরতে ঘুরতে পায়ের জুতা কয়েক জোড়া শেষ করে তবু চাকরি মিলে না। অথচ তাদের থেকে কম মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের চোখের সামনে চাকরি হয়। আর ওইসব প্রকৃত মেধাবীর চাকরির বয়স শেষ হলে হতাশায় ঢুবে আত্মহত্যা করেন। মূলত এসব বিষয় সামনে নিয়েই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন।

১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা চলছে। সরকারি চাকরিতে মোট ২৫৮ ধরনের কোটা ব্যবস্থা চালু আছে। কোটা থেকে নিয়োগ হয় ৫৬ জনের আর বাকি ৪৪ জনকে দেওয়া হয় মেধা থেকে। একবার ভেবে দেখুন প্রতি বছরই হাজার হাজার ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শেষ করে চাকরির সন্ধানে দৌড়ায়। মনে করেন, সরকারি কোনো দফতরে ১০০টি পোস্ট শূন্য আছে। এখন এই ১০০টি পোস্টের জন্য ৫৬ জন নেওয়া হবে বিভিন্ন কোটা থেকে আর বাকি ৪৪ জন নেওয়া হবে মেধাবীদের থেকে। তাহলে সহজেই বুঝতে পারছেন সাধারণ মেধাবীদের চাকরি পাওয়া কতটা দুরূহ ব্যাপার।

দোকানের চা পানকারী ভাইদের বোঝাতে পারলেও নিজের মনেও অনেকগুলো প্রশ্নের উদ্রেগ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলনে নেমেছেন, নামতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো ভিসি স্যারের বাসভবনে হামলা চালাল কারা? বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখলাম মুখোশ পরিহিত কিছু যুবক, এরা কারা? কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী যদি তারা এ হামলা না চালিয়ে থাকে তাহলে তো আরো চিন্তার বিষয়। ভিসি স্যার নিশ্চয়ই কোটা পদ্ধতির সৃষ্টি করেননি এবং তার কথাতে সেটা বন্ধও হবে না। তাহলে কোন শক্তির মদদে, কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ওই মুখোশধারীরা মাঠে নেমেছেন? প্রশ্ন জাগে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ যেভাবে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের জখম করেছে, সেটা কোন ধরনের আইনি প্রচেষ্টা। আন্দোলন যারা করছেন তারা আমাদেরই সন্তান। সুতরাং কাদের ওপর এভাবে নির্যাতন চালানো হলো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, যানজট নিরসন করা পুলিশের কাজ, কিন্তু সেটারও একটা ধরন রয়েছে।

বলে নেওয়া ভালো আমি কোটা ব্যবস্থার বিপক্ষে না, শুধুমাত্র খানিকটা সংস্কারের পক্ষে। অবশ্য যারা আন্দোলন করছেন তারা কেউই কোটা ব্যবস্থা একেবারে বাতিলের পক্ষে না, তারাও সংস্কারে দাবিতে আন্দোলন করছেন। ১৯৭১ সালে যারা বাড়িঘর, স্ত্রী-সন্তান, সহায় সম্পত্তি ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাক হানাদার বাহিনীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে আমাদের একটি স্বাধীন ভূখন্ড উপহার দিয়েছেন। তাদের খাটো করে দেখার দুঃসাহস এ বাংলার কারো কখনো হবে না। তাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ৩০ শতাংশ কেন শতভাগ করে দিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ কখনো শোধ হবে না। কেননা এ ভূখন্ডই তো আমরা পেতাম না। সুতরাং তারা এ দেশের অভিভাবক অর্থাৎ পিতামাতা। মুক্তিযোদ্ধারা সেসময় যুদ্ধ করেছিলেন স্বাধীন একটি মানচিত্রের জন্য। আর সেই মানচিত্রেই আমরা বাংলাদেশ নাম দিয়ে বসবাস করছি।

সুতরাং তাদের হাতে তৈরি এ ভূখন্ডকে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে কোটা ব্যবস্থা যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরাই সবার আগে তা বর্জন করবেন। কেননা তাদের চেয়ে এ দেশকে আর অন্য কেউ ভালোবাসার কথা না। তারা যুদ্ধই করেছিলেন একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে, যেখানে সবার অধিকার সমান থাকবে। কাজেই ৩০ শতাংশের থেকে কমানো হলেও মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবারের আপত্তি থাকার কথা না। কেননা তাদের নিজ হাতে গড়া এ দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে কেবল মেধাবীরাই পারবেন। আমি এটা বলছি না যে, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানরা মেধাবী না। তারাও মেধাবী, তবে সংখ্যায় কম।

অন্যদিকে জেলা কোটা ব্যবস্থাও কমানো যেতে পারে, কেননা যখন মাত্র ১৭ জেলা ছিল তখনো ১০ শতাংশ ছিল এখন ৬৪টি জেলা হয়েছে তবু দশের ঘরেই রয়েছে। এটি কমিয়ে ৫ শতাংশে নিয়ে আসা যায়।

মেয়েদের জন্য ১০ শতাংশ বরাদ্দ। এ বিষয়ে আমার অনেক মেয়েদের সঙ্গেই কথা হয়েছে তাদের অধিকাংশ মেয়েই এ কোটার বিপক্ষে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি হলো, মেয়েরা এখন আর আগের মতো সুবিধাবঞ্চিত নন। ঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবদান দৃশ্যমান, সুতরাং তাদের কোটা ব্যবস্থার সুযোগ দেওয়া মানে তাদের খাটো করা। মেয়েদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা মানে মেয়েদের মেধাকে খাটো করা। তাছাড়া প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উচ্চ লেভেল পর্যন্ত মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। ছেলেমেয়ে উভয় সমান মেধা এটা প্রমাণ করতে হলে মেয়েদের জন্য কোনো কোটা বরাদ্দ থাকুক, এটা মেয়েরাই এখন চাচ্ছেন না। তবে মেয়েদের কোটা বরাদ্দ নির্দিষ্ট কিছু এলাকার জন্য হতে পারে।

সর্বশেষ বলতে চাই, কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছে, তা মোটেও ভালো কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে না। তাছাড়া একটি মহল যে শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছে, সেটিও শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে। ৩৩তম বিসিএসে ৭৭.৪০ শতাংশ, ৩৫তম বিসিএসে ৬৭.৪৯ এবং ৩৬তম বিসিএসে ৭০.৩৮ শতাংশ মেধা কোটা দিয়ে পূরণ করা হয়েছে; এটাও শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে। ইতোমধ্যে সরকারও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে কোটা সংস্কারের বিষয়ে কথা দিয়েছে, সেটি শিক্ষার্থীদের মাথায় রেখে আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে এসে লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়ায় শ্রেয় বলে মনে হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"