মতামত

পহেলা বৈশাখ এবং...

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ বলে একটা কথা চালু আছে। ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারায় এসব পার্বণ বা উৎসবে আমরা একে অপরের আনন্দ এবং স্মৃতিকে ভাগাভাগি করে নিই। অপরকে আপন করে কাছে পাই। এই কাছে পাওয়ার বিভিন্ন স্তর এবং সময়ের পথ ধরেই আসে সংস্কৃতির বিকাশ। প্রতিটি জাতি সভ্যতা-সংস্কৃতির মাধ্যমে খুঁজে পায় তার নিজস্ব অনুভূতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বাঙালি জাতি হিসেবে ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারায় আমাদের এমন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ। অতীতের জরা, গ্লানি ভুলে গিয়ে শান্তি-সুখের প্রত্যাশায় এই দিনটির জন্য উন্মুখ হয়ে আছি সবাই। নতুন ভোরের সোনালি সূর্যের আলোয় আলোকিত হওয়ার আকাক্সক্ষায় শান্তি-সুখের উল্লাসে। পুরনো বছরের ভুল-ভ্রান্তি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাই; এই কামনায় স্বাগতম, সুস্বাগতম বাংলা নববর্ষ।

আমরা জানি, সাম্প্রদায়িক শক্তি বারবার চেষ্টা করেছে বৈশাখের ঐতিহ্য রুখে দিতে। তারা ইতিহাসকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ বলে প্রচার করেছে। বাংলা সংস্কৃতির ওপর কালো থাবা বিস্তারে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্বপাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে এ প্রজন্মের বাঙালি দিনটিকে অতি আপন করে নিয়েছে। দিনটিও স্বমহিমায় জাতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। আর এই উৎসবের সূচনা হয় ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১বৈশাখ, বাংলা ১৩৭২ সন)। সেদিন ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে যাত্রা শুরু করে ছায়ানট। বস্তুত সেই দিনটি থেকেই ‘পহেলা বৈশাখ’ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম এক পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হয়। তবে ইতিহাস বলে, যার হাত দিয়ে বৈশাখ কিংবা বাংলা নববর্ষের গোড়াপত্তন। তিনি কেবল একজন মুসলমানই ছিলেন না বরং সারা মুসলিম বিশ্বে একজন নামকরা, উদারপন্থি শাসক হিসেবে পরিচিত। তিনি মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরি সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সব কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরি পঞ্জিকা চন্দ্র মাসের ওপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরের চেয়ে ১১-১২ দিন কম হয়। কারণ, সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র ৩৫৪ দিন। এ কারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলো ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এ জাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরি চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্রাট আকবার তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দেন। ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার এ হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন। তবে তিনি ২৯ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এ জন্য ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরি সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এ জন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়। অর্থাৎ, মোগল সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং আনন্দ উৎসব করা হতো। এ ছাড়া বাংলার ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকা-ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আজ তা সার্বজনীন।

ইতিহাস বলে, আগে বৈশাখের অনুষ্ঠানের চেয়ে চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান ছিল আকর্ষণীয়। এই রেশ ধরেই বৈশাখের পদার্পণ। যেদিন বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস হয়ে এলো সেদিন হতেই বৈশাখের আনন্দটি নবান্নের আনন্দের চেয়েও আরো বড় আলাদা আঙ্গিক পেতে শুরু করে। মহাজন ও ব্যবসায়ীরা বৈশাখেই ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান চালু করেন। হালখাতা হলো, যে বছরটি চলে গেল সে বছরের হিসাবের যোগ-বিয়োগ করে পুরনো খাতাটি তুলে রেখে নতুন বছরের প্রথম দিন নতুন খাতায় হিসাব চালু করা। দাদা-দাদির কাছ থেকে শোনা, লাল সালু কাপড়ের মলাটে মোড়ানো নতুন হিসাব খাতার ওপরে লেখা হতো ‘এলাহী ভরসা।’ এই এলাহী শব্দটিও সম্রাট আকবরের ‘তারিখ-ই-এলাহী’ থেকে এসেছে বলে জানা যায়। অতএব, ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত, এই বঙ্গাব্দের প্রচলন এবং এই নববর্ষকে বরণ করার যে প্রক্রিয়া বা অনুষ্ঠান, তার সবকিছুই মুসলমান শাসকদের সৃষ্ট এবং চিরায়ত বাংলা সংস্কৃতিরই পরিবর্তিত বাহন। এটি শুধু বাঙালি জাতীয় কৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করে না, বাঙালি সমাজের কৃষি ও অন্য আর্থ-সামাজিক প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-ে নতুন অলঙ্কারে ভূষিত। এই নববর্ষ প্রচলন ও উদয্াপনে হিন্দুয়ানি বা হিন্দু সংস্কৃতির যে লেশমাত্র সংশ্নিষ্টতা নেই, এটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও উজ্জ্বল। এ জন্যই মহাকালের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বলেছিলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ সেটি বাঙালির ঐক্য, সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক অসাধারণ ও সাবলীল প্রজ্ঞার যোগসূত্র। এটিই ধর্মনিরপেক্ষতা, এটিই অসাম্প্রদায়িকতা। তাই তো বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধীরে ধীরে এ উৎসব শহর ছাপিয়ে গ্রামেও ছড়িয়েছে। এককালের নাগরিক মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক এ উৎসব বর্তমানে অরাজনৈতিক সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে এই উৎসব কী? আসলে উৎসব হচ্ছে মানুষ যেদিন আপন শক্তিকে বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেই দিনটিই উৎসবের।

এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনায় নানা উৎসবের সূচনা হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল শহীদ দিবস হিসেবে, যেখানে শোকই ছিল মুখ্য বিষয়। কিন্তু দিন দিন রাজনৈতিক সংগ্রামের তীব্রতা ও ব্যাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এ দিনের তাৎপর্যও পাল্টে গেছে। শোককে সত্যিই বাঙালি শক্তিতে পরিণত করেছে। এভাবে শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে বাঙালির জাতীয় জাগরণ ঘটেছে আর দেশব্যাপী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বছর শুরুর দিনটি নানা আনন্দ-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হোক। সারা বছরের জন্য মন-মস্তিষ্ক খোরাক জোগাক। এই উৎসব সম্পর্কে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী, কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ। সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ। সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’ কবির এই বাণীর সূত্র ধরে বলতে চাই, নববর্ষের উৎসবের মধ্যে উঠে আসুক দেশ, জাতি ও বিশ্ব মানবতার কল্যাণ। অঙ্গীকার হোক আত্মনিবেদনের; মহৎ আদর্শ ও উচ্চভাবে ত্যাগের মহিমায় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা। সার্বজনীন বাঙালির উৎসব হিসেবে মানবতাবোধে দীক্ষিত হওয়ার শিক্ষা গ্রহণই হোক নববর্ষের চেতনা। অধিকতর সমৃদ্ধ হোক নতুন ভোরের বিকাশ ও বিস্তার।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

"