আন্তর্জাতিক

বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

২০১৭ সাল চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য ছিল সেরা বছর। নিজ দল কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তিনি এবং তার চিন্তা-ভাবনাকে দলের সংবিধানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মাও সে তুংয়ের পর শি জিনকেই এই বিরল সম্মাননা দেওয়া হয়। শি জিন ক্ষমতাকে এমনভাবে সংঘবদ্ধ করেছেন, যা গত এক দশকে আর দেখা যায়নি। চীনের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশটির বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে উত্থান হয়েছে। যদিও উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, চীনের ধীর অর্থনৈতিক উন্নতি শি জিনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। ১ জানুয়ারি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত ধাপ অর্জন করার ঘোষণা দেন। পরদিনই নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, পিয়ংইয়ং কখনোই তা করতে পারবে না। কিন্তু ১১ মাসে দেশটি ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও একটি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। যদি ২০১৭ ইচ্ছাযুদ্ধ হতো, তবে ট্রাম্প-কিম ভালোভাবেই একে অপরকে অপমান করে, হুমকি দিয়ে এটি চালিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ২০১৮ সাল কিমের ভালো যাবে কি না, তা বলা মুশকিল। একের পর এক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছে তার দেশ উত্তর কোরিয়া। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এ বছর ক্ষমতা নিয়ে ভালোই খেলা দেখিয়েছেন। এই তরুণ রাজকুমার তার সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের একের পর এক সাহসী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী থেকে এখন তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন। নিজের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন যেকোনো পরিস্থিতির পথ রুদ্ধ করেছেন তিনি। দেশে নারীদের গাড়ি চালনার অধিকার, সিনেমা হল উন্মুক্ত, আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা খর্ব, রক্ষণশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে তরুণদের মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের দল। ক্ষমতা ধরে রাখতে তাকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের রক্ষণশীল ডেমোক্রেট ইউনিয়নের সঙ্গে জোট বাঁধতে হয়। এই পদক্ষেপের কারণে ব্রেক্সিট সমঝোতায় আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত ইস্যু একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর যৌন কেলেঙ্কারি, অফিসে পর্নোগ্রাফি দেখার অভিযোগ, গোপন বৈঠকের দায়ে নিজের ক্যাবিনেটের তিন বলিষ্ঠ মন্ত্রীকে হারান মে। নির্বাচনে জয় লাভ করার পরও কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার অবস্থান ভালো না। এই নির্বাচনে কেনিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা রাহিলা ওদিঙ্গা বয়কট করেন এবং কেনিয়াত্তার বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কেনিয়াত্তা নিজকে সবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যা দিলেও তার জয় কেনিয়ার আদিবাসী ও উপজাতীদের দুঃশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। ২০১৮ সালে তিনি প্রথমেই কেনিয়ার পুলিশ বাহিনীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা চালাবেন এরপর বিরোধীদলের সঙ্গে বৈঠকের কাজ হাতে নিবেন। রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন নিরঙ্কুশ ভোটের ব্যবধানে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে গত মাসে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বকে মাও সেতুংয়ের সমপর্যায়ে উন্নীত করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। আর এ সপ্তাহে সপ্তাহে চীনা সংবিধানে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শিকে আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। চীন ও রাশিয়ায় দুই নেতার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুদৃঢ় হওয়ার মধ্য দিয়ে আগামীদিনগুলোতে বিশ্বরাজনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আরো বেড়ে গেল। যদিও বিশ্বের পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়া ও চীনের অবস্থান কখনো অগ্রাহ্য করার মত ছিলনা। তবে বিগত শতকের নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের মধ্যদিয়ে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর পশ্চিমাবিশ্বে আক্রান্ত হওয়া এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হ্রাস পাওয়ার কথা থাকলেও উল্টো তা আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতায় বিশ্ব আরো অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

দেড় দশক আগে ইরাক, আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা ক্রমশ আরো বিস্তৃত ও রক্তক্ষয়ী হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সর্বত্রই যুদ্ধের আগুন, হুমকি ও ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাশার আল আসাদের রিজিম পরিবর্তনের লক্ষ্যে পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহ ও সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপ পশ্চিমা যুদ্ধবাদি রাজিনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের ব্যাপারে যে কয়জন ব্যক্তি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, হংকংয়ের নারী জ্যোতিষী প্রিসিলা ল্যাম তাদের অন্যতম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যাপারে এবার প্রিসিলা ল্যাম বলছেন, নতুন বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শুরুটা ভালোই ছিল, তবে শেষটা তার জন্য বেশ কঠিনই হবে। হংকংয়ের ওং তাই সিন মন্দিরভিত্তিক জ্যোতিষী প্রিসিলা ল্যাম ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করছেন। তিনি মূলত মানুষের মুখ, হাতের তালু ও চীনা চান্দ্র বর্ষপঞ্জি দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ গণনা করে থাকেন। চীনা বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের শুরু হবে শনিবার। চলতি বছরে বিশ্বের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ভাগ্য কেমন হবে সে বিষয়ে সিএনএনের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তিনি। আর এটা তিনি করেছেন চৈনিক বর্ষপঞ্জি অনুসারে বিশ্বনেতাদের জন্ম তারিখ ও সালের ওপর ভিত্তি করে। ডোনাল্ড ল্যামের মতে ট্রাম্প হচ্ছেন ফায়ার ডগ। আর ফায়ার ডগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অতি আত্মবিশ্বাস ও কোনো বিষয়ে আগে-পিছে না ভেবেই তড়িঘড়ি কাজ করার প্রবণতা। তিনি বলেন, জন্মদিন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় চিহ্ন হচ্ছে পৃথিবী। পৃথিবী যে ধাতুতে গড়া তাতে বছরের শেষার্ধে পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলবে। কিন্তু শরৎ ও শীতকালের মতো ঠা-া মাসগুলো তার জন্য বেশ কঠিন যাবে। বিক্ষোভের মতো ঘটনার মুখে পড়বেন ট্রাম্প।

অন্যদিকে, পুতিন হচ্ছেন ড্রাগন। আর ড্রাগন খুব শক্তিশালী এবং যেকোনো জায়গায় যেতে পারে। এটা পানিতে সাঁতার কাটতে পারে, আবার আকাশে উড়তেও পারে। উৎসাহ ও উদ্যোমে পূর্ণ। জন্মদিন অনুযায়ী পুতিনের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় চিহ্ন হচ্ছে সূর্য। আর সূর্যই তাকে শক্তিশালী নেতায় পরিণত করেছে। পুতিন হচ্ছেন স্পষ্টচিন্তার মানুষ। ল্যামের মতে, পুতিনের সামনে ভালো একটা বছর অপেক্ষা করছে। সূর্যের যে উপাদান তাতে ২০১৭ সালের শেষাংশ পুতিন ও রাশিয়ার জন্য অর্থের সম্ভবনা প্রবল। এতে রাশিয়ার অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে। শি জিনপিং, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় চিহ্ন হচ্ছে আগুন। আর আসন্ন বছর চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য বিশাল কিছু হতে যাচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টের ভাগ্য দ্বিগুণ ভালো হবে। কারণ, দেশের জনগণের মধ্যে যাদের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় চিহ্ন সাপ চলতি বছর তাদের জন্যও ভালো যাবে। সাপের বৈশিষ্ট্য ড্রাগনের মতোই। কারণ, সাপ সাগরেও যেতে পারে। আবার মাটিতেও চলতে পারে। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চলতি বছর চীন প্রভূত অর্থ আয় করতে যাচ্ছে, যা চূড়ান্তভাবে প্রেসিডেন্টের জন্য সুফল বয়ে আনবে।

চলতি বছরে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের পুনর্নির্বাচন এবং ক্ষমতা সুসংহত হওয়া রাশিয়া ও চীনের এই দুই নেতার কারণে যুক্তরাষ্টের মোড়লীপনা অনেকটাই হ্রাস পাবে, যা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। কেজিবির গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনীতিক হিসেবে আবির্ভুত হওয়া ভøাদিমির পুতিন এখন চৌকষ, মেধাবী ও সাহসী নেতৃত্বের উদাহরণ। আন্তর্জাতিক জরিপেও তিনি একাধিকবার মার্কিন ও পশ্চিমা রাজনৈতিক নেতাদের ডিঙিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে লিডার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছেন। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকেই ভøাদিমির পুতিন রাশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে কখনো প্রধানমন্ত্রী কখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্যতম প্রভাবশালী চালকের আসনে আসীন আছেন। তার সুদৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই বিশ্বশক্তি হিসেবে রাশিয়া তার হারানো অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের অগ্রযাত্রায় রাশিয়াসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সুসংগঠিত অবস্থান বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে তা অগ্রাহ্য করার শক্তি পশ্চিমাদের নেই। সাংহাই কো-অপারেশন বা ওয়ান বেল্ট ওয়ানরোড ইনিশিয়েটিভের মতো বিশাল আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোতে বাংলাদেশও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দলীয় ও গোষ্ঠিকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনগনের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগাতে এবং আন্তর্জাতিক নদীর পানি সমস্যাসহ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করতে রাশিয়া ও চীনের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। পুতিন ও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে বর্তমান যুদ্ধপ্রবণ ও অস্থিতিশীল বিশ্বে যেমন একটি ভারসাম্যমূলক, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তেমনি এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুখপত্র হিসেবেও তারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা অব্যাহত রাখবেন এটাই বিশ্ববাসীর কামনা।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

 

"