মতামত

অপরাধ কমাবে টর্ট আইন

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

শেখ নোমান পারভেজ

তিন টার্ম ‘উবি জাস ইবি রেমেডিয়াম’ যার আভিধানিক অর্থÑযেখানে অধিকার আছে, সেখানে প্রতিকারও আছে এবং কোনো অন্যায়ই প্রতিকারহীন নয়। এক কথায় এই নীতিটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে কোথাও বৈধ অধিকার থাকলে তার বৈধ প্রতিকারও থাকবে। ঠিক আরেকটি লাতিন নীতি, যা দ্বারা বোঝানো হয়েছেÑ‘কথা কাজ বা আচরণ দ্বারা কারো ক্ষতি না করা।’ এসব নীতির ওপর ভিত্তি করে আলোচিত হয় টর্ট আইন। যারা আইনের শিক্ষার্থী, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেবল তারাই টর্ট আইনের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু আইনাঙ্গনে কিংবা সত্যিকার অর্থে যেকোনো ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে অত্যন্ত ব্যবহারোপযোগী টর্ট আইনের প্রয়োগ আমরা খুব বেশি দেখি না। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এ আইনটির প্রয়োগ একদিকে যেমন অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে, অন্যদিকে দিতে পারে সত্যিকারের আইনি প্রতিকার। টর্ট আইনের উৎপত্তি লাভ করেছে রোমান আইন থেকেই কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনে এ আইনের প্রসার লাভ করেছে।

সাধারণ অর্থে টর্ট বলতে বোঝায় নাগরিক ভুল বা দেওয়ানি ক্ষতি এবং টর্ট আইনের উদ্দেশ্য নাগরিকের যেকোনো আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হলে দোষীকে প্রচলিত আইনের বিধিবদ্ধ শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি টর্ট আইনের অধীনে ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। তবে একদিকে যেমন ক্ষতিপূরণের কোনো নির্দিষ্টতা নেই, ঠিক অন্যদিকে বাংলাদেশে অন্যান্য বিধিবদ্ধ আইনের মতো টর্ট আইনও বিধিবদ্ধ নয়।

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই তাদের যেকোনো অধিকার লঙ্ঘনে সাধারণত সংশ্লিষ্ট কোনো আইনের অধীনে দেওয়ানি কিংবা ফৌজদারি প্রকৃতির মামলা করে থাকেন। এতে দোষী ব্যক্তি আদালতের নির্ধারিত জেল জরিমানার মাধ্যমে সাজা পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কোনো উপকার হয় না। কিন্তু টর্ট আইনের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির কাজের জন্য বাদী ব্যক্তিগতভাবে যে ক্ষতির সম্মুখীন হন, তা পুষিয়ে দেওয়া হয়। এতে বাদী নিজের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে আইনি প্রতিকার পেয়ে থাকেন। আধুনিক বিশ্বে টর্ট আইনের মাধ্যমে মানসিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও চালু আছে। কিন্তু আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো জানেনই না যে শারীরিক আঘাতের জন্য দোষী ব্যক্তি জেল জরিমানার পাশাপাশি চিকিৎসার খরচসহ অন্যান্য ক্ষতির দায়স্বরূপ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।

আমাদের দেশে টর্টের যে দু-চারটি মামলা হয় তা মূলত মানহানিকেন্দ্রিক। টর্টের অন্যান্য বিষয় যেমন চুক্তিভঙ্গে ক্ষতি, দায়িত্বে অবহেলা, ভীতি প্রদর্শন, উৎপাত, অনধিকার প্রবেশ প্রভৃতি সংশ্লিষ্টবিষয়ক মামলার আইনি প্রতিকার একদমই চাওয়া হয় না। কেননা এ আইনের বিস্তার ও ব্যাপ্তি আমাদের আইনাঙ্গনে উপেক্ষিত অথবা অবহেলিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেশে টর্ট আইন কেন জরুরি?

একটি উদাহরণের আলোকে বর্ণনা করা যাক, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের উপকূলে ডিপওয়াটার হরাইজন নামে অফশোর অয়েল রিগে বিস্ফোরণ হয় এবং এতে ১১ জন মারা যায়। এ ঘটনায় দায়ী করে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামকে (বিপি) ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার অর্থদ- ও ১১ জনকে হত্যার কারণে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করে। কিন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন শিল্প দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের হোতারা পর্দার আড়ালেই থেকে যান অথবা আইনের ফাঁকফোঁকরে স্বল্প জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়ে যান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র তার ভাবমূর্তি ক্ষুণেœর মাধ্যমে। যেমন রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধাবঞ্চিত হওয়া। উল্লেখ করে নেওয়া ভালো, জিএসপি সুবিধার সঙ্গে শ্রম আইনের সরাসরি সম্পর্ক থাকলেও টর্ট আইনের প্রয়োগের সুবিধাটিও পরে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গগত, বাংলাদশ এখন জাতিসংঘ স্বীকৃত উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। শুধু আপাতদৃষ্টিতে উন্নয়নশীল হলে চলবে না বরং প্রচলিত আইনগুলো ও প্রচলিত বিচারব্যবস্থা হতে হবে স্মার্ট ও নাগরিকবান্ধব। যাতে করে দেশের সব নাগরিক আইনের আশ্রয় লাভের পাশাপাশি সর্বাধিক আইনি প্রতিকার পায়। উন্নত দেশগুলো তার নাগরিকদের সব থেকে বেশি আইনি সুরক্ষাই প্রদান করে আসছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক কাঠামোকে যেহেতু শিল্পায়নের দিকে অগ্রসর করতে চাচ্ছে, সেহেতু বাণিজ্যিক আইনের পাশাপাশি টর্ট আইনের ব্যবহারিক প্রয়োগ শুধু ব্যক্তিকেই নয় বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে বাণিজ্যিক টর্ট দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

এ ছাড়া আমরা সচরাচর সরকারি বা বেসরকারি সার্ভিসে অবহেলা ও পেশাদারিত্বের অভাব দেখতে পাই। যেমন বিভিন্ন সরকারি অফিসে অহেতুক বিলম্বিত হওয়া, ম্যানহোলে পড়ে মৃত্যু, ব্রিজ কিংবা ওভারব্রিজ ভেঙে গিয়ে ক্ষতি, আবার বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু, খাদ্যে ভেজাল, বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা বা গার্মেন্ট দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যুসহ বিভিন্ন অপরাধ যে কারণে যে কেউ আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। এসব দায়িত্বে অবহেলা, গাফিলতি বা অন্য কোনো অসাবধানতার কারণে শুধু একজন ব্যক্তিই ক্ষতির সম্মুখীন হয় না সঙ্গে সঙ্গে দেশেরও ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। কিন্তু যদি টর্ট আইনের ব্যবহারিক প্রয়োগ বাড়ানো যেত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিস্ফোরণ মামলায় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের (বিপি) জরিমানার মতো করে যদি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জেল, জরিমানার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হতো, তাহলে ভবিষ্যতে সবাই দায়িত্বে অবহেলা কিংবা গাফিলতি করার সময় শতবার ভাবতেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে টর্টের মামলা করলে কেউই তাদের দায় এড়াতে পারবে না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এর সুফল পাবে। টর্টে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকারের মধ্যে আর্থিক জরিমানাই বেশি দেওয়া হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি বা সুনির্দিষ্ট প্রতিকারের আদেশও দেওয়া হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় বহুল আলোচিত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে বিরাট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আশান্বিত হওয়া যায় হাইকোর্টের এ রায় ভবিষ্যতের জন্য একটি মাইলফলক রায় হিসেবে গণ্য হতে হবে।

বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যেখানে একটি সাধারণ চিত্র হলো মুহূর্তে মুহূর্তে অকারণে মানুষকে হেনস্তা করা সঙ্গে সঙ্গে আইন লঙ্ঘিত হয় প্রতি সেকেন্ডে, প্রতারণা যেখানে সর্বত্র বিরাজমান, সেখানে টর্টের মতো কার্যকর একটি আইনকে কেন উপেক্ষিত করা হয়, তা বোধগম্য নয়। উন্নত দেশগুলোয় দায়িত্বে অবহেলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা খুব সহজে প্রতিকার পায়। আমাদের দেশেও টর্ট আইন প্রয়োগ করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা সহজে করা গেলে দায়িত্ব নিয়েই সবাই কাজ করবে এবং যথাযথ প্রয়োগ ঘটলে সমাজ থেকে অপরাধপ্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অবহেলা বা অসাবধানে কাজ করার মানসিকতা দূর হবে এবং সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

লেখক : কলামিস্ট

nomanparvey9@gmail.com

"