নিবন্ধ

নদনদীর দুঃখ কথা

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

জি কে সাদিক

১৪ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস। সে উপলক্ষে রিভারাইন পিপল বাংলাদেশ ‘সাইক্লিং ফর রিভার’ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। রিভারাইন পিপল বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পক্ষ থেকে আমরা নয়জন সাইক্লিং করে যাই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুমার নদের তীরে। ঝিনাইদহের হরিণাকু- উপজেলার তারাদহ ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজার হয়ে নদের তীরে পৌঁছি বিকেল ৩টায়। আমাদের গাইড করার জন্য ছিলেন কুমার নদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ মারুফ (হরিণাকু- থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক)। নদের কথা আগেও অনেক শুনেছি। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলের বন্ধুরা প্রায়ই বলত কুমার নদের কথা। প্রবীণদের কাছ থেকে শোনা যায় এ নদের নানা কৃর্তি কথা। আগে এই নদ দিয়ে ব্যবসা করার জন্য বণিকগণ বাণিজ্যিকপণ্য বোঝায় নৌকা নিয়ে যেত। যখন আমি নদের পাড়ে তখন এই কথাগুলো মনে করে আমি প্রচলিত মিথ হিসেবে ধরে নিয়েছি। স্রোত নেই, সর্বোচ্চ হলে মধ্য-নদে বুক পানি হবে। মাঝ নদ পর্যন্ত বোরো ধান লাগানো হয়েছে, বাজারের পুলিশ ফাঁড়ি করা হয়েছে নদের মাঝ পর্যন্ত জায়গা নিয়ে, নদের পানি পচে কালো হয়ে গেছে, পানা জমে আছে, নদের পানির উৎস বৃষ্টির পানি, কোথাও আবার পাড় বেঁধে মাছ চাষ করা হচ্ছে, দুপারের চরে এখন বারোমাসি ফসলের চাষাবাদ হয়, পানের বরজও দেখেছি। এমন নদের বুক দিয়ে বাণিজ্য কাজে বণিকরা নৌকা ভাসিয়ে যেত, এটা মিথ নয়তো আর কী?

কাজ শেষে কথা হয় নদ রক্ষা কমিটির সভ্যদের সঙ্গে। জানা হয় একসময়ের প্রাণচঞ্চল, খরস্রোতা এই নদের মৃত্যুর মূল কারণ। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাউকি ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ তিন জেলার বুক চিরে ১২৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে মাগুরা সদর উপজেলার পৌরসভা পর্যন্ত গিয়ে নবগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে আইয়ুব শাসনামলে জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষা) সেচ প্রকল্পের জন্য বাঁধ দেওয়া হয় এই নদের মোহনায়। আর সে থেকেই নদের মৃত্যু যাত্র। চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা জেলা ১৩টি উপজেলার ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে জিকে সেচ প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের পানির প্রধান উৎস পদ্মা নদীর পানি। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের ফলে পদ্মার পানি আর জিকে প্রকল্পের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। ফলে এ অঞ্চলের কৃষকরা বাধ্য হয়ে ইঞ্জিনচালিত শ্যালো টিউবওয়েল বসিয়ে সেচের কাজ চালাচ্ছে। এ ছাড়া এ প্রকল্পের শাখা, উপশাখা, নিষ্কাশন খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। যার ফলে পানির প্রবাহ আর আগের মতো নেই। এ ছাড়া সময়মতো পানি সরবরাহ না করার কারণে কৃষকদের কাছে জিকে সেচ প্রকল্পের চাহিদা আগের মতো নেই। কিন্তু এই সেচ প্রকল্পই একটি প্রাণচঞ্চল নদের মৃত্যু ঘটিয়েছে। এ ছাড় মনুষ্য সৃষ্টি কিছু কারণে কুমার নদ মরা খালে পরিণত হয়েছে।

২.

১৪ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে কুষ্টিয়ার গড়ায় নদী নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর আগেও আমি অনেকবার গড়াই নদীর দৈন্যদশা প্রত্যক্ষ করেছি। সে প্রতিবেদন পড়ার পর নদীর তীরে আবার যেতে মন চাইল। ১৫ মার্চ অতীত ঐতিহ্যবহকারীর রবী-লালনের স্মৃতিজড়িত নদীর পাড়ে আবার গেলাম। বিকেল সাড়ে ৫টায় নদীর তীরে পৌঁছি। বাঁচা-মরার লড়াইরত নদী দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন, ‘বাঙালাদেশের নদীই বাঙালাদেশের ভিতরের প্রাণের বাণী বহন করে’। মনে একটা প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, কবিগুরু বেঁচে থাকলে তার এই কথা কি প্রত্যাহার করে নিতেন না? জমিদারির কাজে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘুরে ছিলেন তিনি। দেখেছিলেন বাংলার নদীর প্রবাহ, প্রাণচঞ্চলতা, নদীর প্রকৃতি টেনেছিলে কবিকে। আর তা থেকেই ভালোবেসে ছিলেন সবুজ দেশের প্রাণ নদীকে। কিন্তু আজ সে গড়াই দেখছি পানিশূন্য, ড্রেজিং করে মাঝখান দিয়ে একটা নালা করা হয়েছে পানির প্রবাহ চালু রাখার জন্য, নদীর বুকে জাল ফেলে নৌকা চালিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করত তার আজ নেই। যত দূর চোখ যায় ধু-ধু মরুভূমির। প্রাণশূন্য এক প্রান্তর। মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া থেকে খোকসা পর্যন্ত নদী শুকনো মৌসুমের আগেই শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ স্থানের ৩২ কিলোমিটার নদী এখন মরুভূমি। ফারাক্কা বাঁধের (১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল) কারণে গড়াইয়ে পানির প্রবাহ কমে যায়। যার ফলে এ অঞ্চলে নোনা পানির প্রবেশ ঘটতে পারে। সুন্দরবনকে রক্ষা ও দক্ষিণের কয়েকটি জেলায় নোনা পানির আগ্রাসন ঠেকাতে গড়াই খননের জন্য দুদফা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তাই ১৯৯৭ সালে ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এরপর ২০০৯ সালে আবার ৯৪২ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। দীর্ঘ সাত বছরের খননকাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে কিন্তু নদীর নাব্য ফিরে আসেনি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নদী খনন করা হলেও নদীর অবস্থা ‘যেই সেই’ আছে। অপরিকল্পিত খননের ফলে কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। এখন প্রকল্পের টাকা ভাগের দলনে পরে উধাও। এ বছর আবার নতুন বাজেট পাসের তদবির চলছে। এ ছাড়া নদীর নাব্য বাড়ানোর জন্য আরো অনেক বরাদ্দ এসেছে কাজ হয়েছে, দুর্নীতি-অনিয়মসহ সবই হয়েছে। কিন্তু নদীর পানিপ্রবাহ ফেরেনি। প্রতিনিয়ত শেষ অবস্থার দিকে পরিস্থিতি গড়াচ্ছে।

৩.

আমার গ্রামের বাড়ি শেরপুরের নকলা থানায়। বহ্মপুত্র নদের পাশেই। নদের তীর থেকে এক কিলোমিটার দূর। বাড়িতে গেলে নদে যাওয়া হয়। শুকনো মৌসুম এখনো পুরো শুরু হয়নি। কিন্তু নদীর বুকে ফুটবল, কাবাডি খেলা শুরু হয়েছে পুরোদমে। আমাদের গ্রামে নদটি ‘বড় গাঙ্গ’ নামে পরিচিত। আমি নিজেও দেখেছি এই নদীর কলরবের খেলা। গত পাঁচ বছর আগেও এ সময়ে উত্তরবঙ্গ থেকে পাটের নৌকা যেত ভাটির দিকে। কিন্তু এখন একটা ডিঙ্গি নৌকাও যাবে না ঠেকে পড়বে। এই নদের শাখা নদী হলো মৃগী নদী। এই নদীর অবস্থা আরো করুণ। বর্ষা সময়ই এ নদীতে ঠিকমতো পানি হয় না। গত পাঁচ বছর আগেও যেমন প্রবাহ ছিল, এখন তার সিকিভাগও নেই। গুটা নদীর এখন মরুপ্রান্তর। বহ্মপুত্র নদেরও একই অবস্থা। এ নদে আগে যেসব জেলে মাছ ধরত, তাদের সঙ্গে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া যায় তা নদের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে রূপকথা আর বাস্তবতার মতো মনে হয়। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা নদীর অবস্থা ওপরে যে কটা উদাহরণ দিলাম সে রকম। পদ্মার বুকে এখন চাষাবাদ চলছে। আগে এই পদ্মার বুকে জেলেদের জীবিকা অন্বেষণ চলত এখন চলছে কৃষকের লাঙল। যমুনার বুকে ধানের চাষ স্বচক্ষে দেখেছি। কপোতাক্ষ নদ মরা খালে পরিণত হয়েছে। ঢাকা যাওয়ার সময় বুড়িগঙ্গার পচা পানির গন্ধে নাক চেপে রাখতে হয়। অতীতে বুড়িগঙ্গা ছিল বাংলাদেশের নদীপথে বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র।

বেলা বেশি নেই। এখনো যদি নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনা না হয় তাহলে আজ যে নদীর বুক খালে পরিণত হয়েছে সময়ের ব্যবধানে সে নদীর দেশও মরুর দেশে পরিণত হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadikiu099@gmail.com

"