বিশ্লেষণ

নৈতিকতা ধ্বংসের পেছনে

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

আলমগীর খান

নৈতিক অবনতি একটি জাতিকে দুর্বল করে দেয় এবং চরম পর্যায়ে পৌঁছালে তা সামাজিক ও জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অন্যায় ও দুর্নীতি সাময়িকভাবে কোনো ব্যক্তির স্বার্থ হাসিল করলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি সবারই ক্ষতি করে। সাময়িক ও প্রত্যক্ষ আত্মস্বার্থকে বড় করে দেখা হচ্ছে ব্যক্তির চারিত্রিক দুর্বলতা, যা তাকে অন্যায়ে প্রবৃত্ত করে। স্বার্থ উদ্ধার হলেও যেকোনো অন্যায় ব্যক্তির মনকে কলুষিত করে। তবে অন্যায় বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়লে মনের কলুষতা বোঝা কঠিন হতে পারে। ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতোই। ময়লা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ও অপরিচ্ছন্ন লোকজনের মধ্যে নিজের অপরিচ্ছন্নতা কম চোখে পড়বে, কিন্তু সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে যেকোনো সামান্য অপরিচ্ছন্নতাও বড় হয়ে ধরা পড়ে। সমাজে চারদিকে অন্যায় ও অসততা বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে পড়লেও একইভাবে কারো নিজের কলুষতা অতটা ধরা পড়ে না। ধরা না পড়া মানে কলুষতা নেই তা নয়, বরং তা মাত্রারিক্ত কলুষতার প্রমাণ বহন করে। আমাদের সমাজ এ রকম একটা ভয়ংকর পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

সদুপদেশ দিলেই যে মানুষ সৎপথে জীবনযাপন শুরু করবে, তা নয়। কারণ ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রের একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে। মানুষের অর্থনৈতিক জীবনযাপন যত বেশি চৌর্যবৃত্তিক ও লুণ্ঠনবৃত্তিক হবে, সমাজে তত বেশি নৈতিক বিপর্যয় ঘটবে। অন্যদিকে যে সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকা- যত বেশি ন্যায়নীতিভিত্তিক, সেখানে তত বেশি নৈতিক সুস্থতা। তবে চলমান অর্থনৈতিক কাঠামোয়ও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক উন্নতি সম্ভব। আর মানুষের উন্নত নৈতিক অবস্থা অর্থনৈতিক জীবনযাপনকেও অনেকটা ন্যায়ভিত্তিক করতে সক্ষম। যদিও চলমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে অসততা ও দুর্নীতি সম্পূর্ণ দূর হওয়া সম্ভব নয়। কারণ চলমান অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিই শোষণমূলক। অর্থাৎ বেশির ভাগ মানুষের শ্রমকে চুরি করে গুটিকয় মানুষের প্রতিষ্ঠা লাভের ওপর এই কাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত। ভিত্তিই যেখানে অন্যায়মূলক, সেখানে অন্যায়ের প্রতি ব্যক্তির আকর্ষণ সব সময়ই সমাজে কমবেশি মাত্রায় বজায় থাকবে। তা সত্ত্বেও অন্যায় ও অসততার প্রতি ব্যক্তির এই আকর্ষণ যত কম থাকবে ও কম কৃতকার্য হবে, ততই সমাজের মঙ্গল।

মানুষের নৈতিক মানদ- যত ওপরে থাকবে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি তত বেশি সম্ভব হবে। তার মানে এই নয়, জিডিপি বাড়বেই। বরং বেশি বেশি দুর্নীতিও দেশের জিডিপি বাড়াতে পারে। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বঞ্চিত করে অল্পসংখ্যক মানুষের চোখ ধাঁধানো উন্নতিতেও জিডিপি বাড়তে পারে। অর্থনৈতিক উন্নতির এই প্রতিযোগিতা অনেক দেশকে ক্লেপটোক্রেসি বা চৌর্যবৃত্তিমূলক রাজত্বে পরিণত করেছে। এ রকম অর্থনৈতিক পরিবেশ মানুষকে সুখী করে না, বরং ব্যাপক মানুষের দুঃখের কারণ হয়। কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য অন্য সব ধরনের বৈষম্য বৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগায়, যা বিরাটসংখ্যক মানুষের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক। অন্যদিকে ন্যায় ও সাম্যতাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের সুযোগ-সুবিধায় সাম্যতা আনে, যা ব্যাপক মানুষকে সুখী করে। আর এটাই তো প্রকৃত উন্নতি। মানুষের সুখ, তাদের ভালো থাকা। স্বতঃস্ফূর্ত সুস্থ নৈতিক সামাজিক পরিবেশই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রের এই উন্নতি নিশ্চিত করে।

নৈতিক ঘাটতি যেভাবে সমাজের উন্নতি ও সুখের অন্তরায়, একইভাবে তা মানুষকে শোষণ-বঞ্চনার শিকারে পরিণত করে। যে সমাজে মানুষের নৈতিক শক্তি যত কম, তাদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তিও তত কম। ফলে সমাজে অসততা ও অনৈতিকতার বিস্তার অন্যায় ব্যবস্থা ও সে ব্যবস্থার রক্ষকদের টিকে থাকার সহায়ক। সে কারণে যে শাসক গোষ্ঠী অন্যায় উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকে ও মানুষের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকে ভয় পায়, তারা সমাজে অনৈতিকতার বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করে। কেননা অন্যায় ও দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক শাসকরা সমাজে বিদ্যমান ন্যায়নীতি ও ন্যায়পরায়ণ মানুষকে ভয় পায়। এমন শাসকরা সমাজে নৈতিকতার ধ্বংসসাধনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে।

হাজার বছরের সংস্কৃতিতে ভাস্বর বাঙালি সমাজ নৈতিকতায় সমৃদ্ধ। বর্তমানে সমাজে যে নৈতিকতা বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে, মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে তা আপনা-আপনি হয়নি। বাঙালি সমাজে বড় আকারে নৈতিক বিপর্যয়ের শুরু ব্রিটিশ শাসনামল থেকে তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এ ব্যাপারে নানা রকম ঐতিহাসিক প্রমাণ হাজির করা যায়। একটি প্রমাণ অন্তর্জালে এত বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর জনপ্রিয়তা ও জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের কারণ নেই, এমনকি ঐতিহাসিক সত্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও। জানা যায়, ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তক থমাস বেবিংটন মেকলে ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে এক বক্তৃতায় বলেন : ‘আমি ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ভ্রমণ করেছি, কিন্তু কোনো ভিক্ষুক ও চোর দেখি নাই। এ দেশে এত সম্পদ, এত উচ্চনৈতিক মূল্যবোধ ও চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখেছি যে, আমার মনে হয় না আমরা কখনো এ দেশকে জয় করতে পারব, যদি আমরা এ জাতির মেরুদ- ভেঙে দিতে না পারি, যা এদের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সে জন্য আমার প্রস্তাব হচ্ছে, এ দেশের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হবে। কারণ যদি ভারতীয়রা মনে করতে শুরু করে যে বিদেশি ও ইংরেজ বলতেই কোনো কিছু তাদের চেয়ে ভালো ও শ্রেষ্ঠ, তারা তাদের আত্মমর্যাদা ও দেশি সংস্কৃতি হারিয়ে আমরা যেমন চাই সে রকম একটা অধীনস্থ জাতিতে পরিণত হবে।’

বক্তব্যটি অন্তর্জালে বহুল প্রচারিত হওয়া সত্ত্বেও এর সত্যতা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেছেন। অনির্বাণ মিত্র অনলাইন ওয়্যার সাময়িকীতে প্রমাণ করেছেন মেকলে ওই দিন আসলে কলকাতায়ই ছিলেন, সুতরাং ব্রিটিশ সংসদে তার দ্বারা এমন কিছু বলার প্রশ্নই আসে না। তাই বলে তিনি ভদ্রলোকের সাফাই গাননি। ভারতবর্ষ ও এখানকার শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে প্রচ- অবজ্ঞাসূচক বক্তব্যের জন্য তিনি জগদ্বিখ্যাত। মেকলের মতে, ‘ইউরোপে কোনো গ্রন্থাগারের একটি তাকে যা আছে তা ভারত ও আরবের সমস্ত সাহিত্যের মূল্যের সমান।’ ভারতে তার ইংরেজ সভ্যতা রফতানির লক্ষ্য ছিল ‘এমন একটি শ্রেণি তৈরি, যারা কেবল রক্তে ও গাত্রবর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, চিন্তা, নীতি ও মেজাজে হবে ইংরেজ।’

এমন তীব্র সাম্রাজ্যবাদী চেতনা যার সেই মেকলে যে নৈতিকতা ধ্বংসের অমন একটি পরিকল্পনা ফাঁদতে পারেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এমন কোনো কথা যদি তিনি নাও বলে থাকেন, কথাটির আবিষ্কারক খুবই বুদ্ধিমানের মতো মেকলের মুখেই এটি বসিয়ে দিয়েছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পাত্র হিসেবে, এবং অন্তর্জালে জনপ্রিয়তা অর্জনে সাফল্য লাভ করেছেন। জনাব মিত্র পাঠককে সতর্ক করে লিখেছেন, অন্তর্জালে আলবার্ট আইনস্টাইনের ছবির পাশে পাওয়া যায় : ‘অন্তর্জালে কারো ছবির পাশে কোনো উদ্ধৃতি সাঁটা থাকলেই তা বিশ্বাস করো না।’ জনপ্রিয় এই উদ্ধৃতিটি আব্রাহাম লিঙ্কন ও সক্রেটিসের মুখেও পাওয়া যায়। অন্তর্জাল জন্মের বহু আগেই যাদের মৃত্যু হয়েছে।

মেকলের মুখে নৈতিকতা ধ্বংসের ওই ব্রিটিশ পরিকল্পনাটি ঠিক একইভাবে সেঁটে দেওয়া হয়েছে কি নাÑএখানে তা আমাদের বিচার্য বিষয় নয়। বিষয়টি হচ্ছে, ব্রিটিশের এমন একটি পরিকল্পনা সত্যি ছিল। আর কেবল ব্রিটিশ কেন, সব ঔপনিবেশিক ও দেশি শোষক-শাসকেরও এমন একটি পরিকল্পনা সব সময় ছিল ও থাকে। মানুষের নৈতিকতা আপনা-আপনি ধসে পড়ে না। মানুষকে দুর্বল করার জন্য এবং তার পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে নষ্ট ও সংগ্রামের শক্তিকে নস্যাৎ করার জন্য ওপরমহলের গোষ্ঠীর এমন পরিকল্পনা থাকে। তাকে মেকলের পরিকল্পনা বললে বেশি ভুল হবে না। তাই সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিবেশকে রক্ষার জন্য সবার আগে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক

 

"