পর্যালোচনা

কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনা

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

বাংলাদেশের বেসরকারি মালিকানাধীন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-২১১ একটি উড়োজাহাজ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়ে নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হন। উড়োজাহাজটিতে ৭১ জন আরোহীর মধ্যে ৬৭ জন ছিলেন যাত্রী, বাকি চারজন ক্রু। পাইলট-ক্রুসহ আরোহীদের ৩৬ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালের এবং একজন করে যাত্রী ছিলেন চীন ও মালদ্বীপের। ৩৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৯ জন কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২৫ জন বেঁচে নেই।

নেপালের স্থানীয় সময় ১২ মার্চ সোমবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয় ও আগুন ধরে যায়। দ্রুত ঘটনাস্থলে বিমানবন্দরের উদ্ধারকারী দল, নেপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যায়। দুর্ঘটনার পর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, রাডারের ভুল সিগন্যাল পেয়ে পাইলট উড়োজাহাজ অবতরণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। দুর্ঘটনার পর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই হোক, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ এবং বিচারের আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু এ মুহূর্তে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা এবং নিহতদের স্বজনদের কাছে পৌঁছানো ও ক্ষতিপূরণ দেওয়াটা তার চেয়ে বেশি জরুরি।

বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে। সেই দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণহানিও হয়েছে। আর বিমান দুর্ঘটনার স্থান হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর। এর আগেও আরো বহু বিমান এখানে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। পাহাড়ঘেরা এই বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। একের পর এক বিমান দুর্ঘটনার কারণে এই বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। বিমানবন্দরটিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বলা হচ্ছে, এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিমান দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। যারা আন্তর্জাতিক খবরের পাঠক তারা হরহামেশাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট-বড় বিমান দুর্ঘটনার খবর পড়েন বা দেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার খবর কমই বলা চলে। কালেভদ্রে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় অনেকে নিহত হলেও যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা হাতেগোনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৮৪ সালে পর এটাই সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা, যা ১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট ১৯৮৪ ঢাকায় খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে অবতরণ করার সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফকার এফ ২৭-৬০০ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) কাছাকাছি একটি জলাভূমির মধ্যে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পূর্বনির্ধারিত ঘরোয়া যাত্রী ফ্লাইট পরিচালনা করছিল।

বাংলাদেশের বিমান দুর্ঘটনা : বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও উইকিপিডিয়ার বরাতে জানা যায়, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যাত্রীবাহী বিমান যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯৮৪ সালে বিমান বাংলাদেশ এযারলাইনসের ‘ফকার এফ ২৭-৬০০ এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। এতে নিহত হন বিমানে থাকা ৪৯ জন। এর মধ্যে বিমানের যাত্রী ছিলেন ৪৫ জন, বাকিরা ওই বিমানের ক্রু। এরপর ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে আবার দুর্ঘটনার শিকার হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিমান। এবারের ঘটনাস্থল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। জরুরি অবতরণের সময়ে ‘ফকার এফ২৮’ মডেলের বিমান কুয়াশার কারণে রানওয়ের পাশের ধানখেতে পড়ে। এতে বিমানটি মাঝখান থেকে দুভাগ হয়ে গেলেও কেউ নিহত হননি। বিমানে থাকা ৮৫ যাত্রীর মধ্যে আহত হন ১৭ জন। এরপরে ২০০১ সালে আবার সিলেট বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে একই বিমান পরিচালন সংস্থার একই মডেলের বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে। তবে এবারও কেউ নিহত হননি। ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর আবার সিলেট বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা ঘটে। এবারও ‘ফকার এফ২৮-৪০০০’ মডেলের বিমান আলোচনায়। বিমানটি সেদিন প্রচ- বৃষ্টির মধ্যে নামতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে যায়। কিন্তু এতে বিমানের থাকা ৮৩ জনের মধ্যে ৮ যাত্রী আহত হন। ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে আসা ‘বিজি-৫২’ বিমানের ইঞ্জিনে ঢুকে পড়ে একটি পাখি। এতে বিমানটি জরুরি অবতরণে বাধ্য হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই বছরের ৯ মার্চ কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণের সময় একটি কার্গো বিমান বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানের ৪ জন ক্রু প্রাণ হারান। সবশেষ ১২ মার্চ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের যাত্রীবাহী বিমানটি বিধ্বস্ত হলো। এতে ৫০ জনেরও বেশি আরোহী প্রাণ হারালেন।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে পরস্পর বিরোধ বক্তব্য যেমন শুরু হয়েছে, তেমনি নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুর্ঘটনার সংখ্যা ইতোমধ্যে হিসাব কষা শুরু হয়েছে। শুধু হিমালয়কন্যা নেপালে গত ৭ বছরেই ১৫টি ছোট-বড় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেছে। নেপালের জরিপ সংস্থা নেপাল ইন ডাটা অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এসব ঘটনায় মোট ১৩৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। ওই ৭ বছরের প্রতি বছর কমপক্ষে একটি করে বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে শুধু এখানেই। এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও প্রাণহানি ঘটেছে। নেপালে দুর্ঘটনার পর ৬ সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। ‘ব্ল্যাকবক্স’ সংগ্রহ করা হয়েছে। দেখা যাক তদন্ত টিম কী বলছে আর ব্ল্যাকবক্স কী জানান দিচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

msi.khokonp@gmail.com

 

"