গবেষণা

ঘুম শান্তির, হীনতা অশান্তির

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

ফয়জুন্নেসা মণি

ঘুম প্রত্যেকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম ঘুমের কারণে শারীরিকভাবে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশ্বের ১৫৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কম ঘুমের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং মোটা হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের ওপর এসব গবেষণায় দেখা যায়, একটানা কয়েক রাত যদি ঘুম কম হয়, তবে সেটি আপনাকে ডায়াবেটিসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। শরীর সুস্থ ও সতেজ রাখার জন্য ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। ডাক্তাররা বলেন, সবার প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। আর তাই ঘুমের জন্য কত না আপ্রাণ চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিøপ ফাউন্ডেশনের পরামর্শপত্র অনুযাযী ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের রাতে অন্তত ৯-১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন, তবে নিয়মিত ৭-৮ ঘণ্টা ঠিকঠাক ঘুমাতে পারলেও ওরা নিজেকে চালিয়ে নিতে পারে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে কারো কারো নিয়মিত ৭ ঘণ্টা ঘুমালেও চলতে পারে। আর বযঃসন্ধির সময়টাতে অনেকেরই প্রায় ১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ১১ ঘণ্টার চেয়ে বেশি ঘুমালে তা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন, তবে কারো কারো নিযমিত ৬ ঘণ্টা ঘুমেও সব ঠিকঠাক থাকতে পারে। ৬৫ বছরের চেয়ে বেশি বয়সীদের জন্য ঘুমানো প্রয়োজন ৭-৮ ঘণ্টা। কিন্তু অনেকেই দিনের বেলায় ভাতঘুম দিয়ে রাতে নিয়মিত ৫ ঘণ্টায়ও দিব্যি ভালো থাকতে পারেন। তবে যারা সাধারণত ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে যান তাদের জন্য একটা চরম দুঃসংবাদ আছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের বড়ির কারণে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে চার গুণ বেশি। ফলে অতিমাত্রায় ঘুমের বড়ি খেলে ঘটতে পারে অকালমৃত্যু। গবেষণার জন্য চিকিৎসকরা দুটি দল বাছাই করেন। একটি দলে পেনসিলভানিয়ায় বসবাসরত সাড়ে দশ হাজারেরও বেশি লোক ছিল। তাদের সবাই পূর্ণবয়স্ক এবং তারা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঘুমের বড়ি সেবন করতেন। গবেষকরা এসব ব্যক্তির মেডিক্যাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন। আরেক দলে ছিলেন যারা ঘুমের বড়ি খান না। তাদের সংখ্যাও ছিল ২৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি। তাদের মধ্যে বয়স, পরিপ্রেক্ষিত ও স্বাস্থ্যগত ভিন্নতা ছিল। দুটি নমুনার ওপর আড়াই বছর ধরে গবেষণা চালানো হয়। চিকিৎসকরা সাধারণত যেসব ঘুমের বড়ি খাওয়ার ব্যাপক পরামর্শ দেন তা পর্যালোচনা করা হয়। ফলে দেখা যায়, এ সময়ে উভয় গ্রুপে সার্বিক মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। গবেষকরা দেখতে পান, যারা প্রতি বছর ১৮ থেকে ১৩২ ডোজ ঘুমের বড়ি নেন তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রিত গ্রুপের তুলনায় ৪ দশমিক ৬ গুণ বেশি। এমনকি যারা বছরে ১৮ ডোজের কম নেন, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিও ৩ দশমিক ৫ গুণ বেশি। অতএব ঘুমের বড়ি সেবন ভালো নয়। আর ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়া ঘুমের বড়ি নিজের ইচ্ছেমতো যখন-তখন সেবন করা তো ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

প্রশান্তিদায়ক ঘুমের জন্য, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার জন্য কিংবা মাংসপেশি শিথিল করার জন্য অনেকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকেন। যদিও স্বাভাবিক ডোজেও নিয়মিত খাওয়া অনুচিত, তবে অনেকেই এ ধরনের ওষুধে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি, যা ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে মৃত্যু মুখোমুখি হয়েছিলেন। ডাক্তারের পেসস্ক্রিপশন ছাড়া এবং নিয়মিত ঘুমের ওষুধ সেবনে শারীরীক ও মানসিক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে। ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণায় দেখা যায় দুশ্চিন্তা নিরোধক বা ঘুমের বড়ি মৃত্যুঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাতে ভালো ঘুম হলেও নিয়মিত ঘুমের ওষুধ সেবন মৃত্যুর আশঙ্কা ও কয়েকটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা ঘুমের ওষুধ খায় না, তাদের চেয়ে যারা খায় তাদের মৃত্যুঝুঁকি চার গুণ বেশি। এ ছাড়া, ঘুমের ওষুধ সেবনকারীদের নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ঘুমের ওষুধ খাদ্যনালি, ফুসফুস, মলাশয় ও অগ্রগন্থির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মৃত্যু ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় এমন ওষুধের মধ্যে রয়েছে বেনজোডায়াজেপিনস, যেমন : টেমাজেপাম; নন- বেনজোডায়াজেপিনস, যেমন : এমবিয়েন (জলপিডেম), লুনেস্তা (ইসজোপিকলোন) ও সোনাটা (জালেপলন); বারবিটিউরেটস; এবং সিডাটিভ এন্টিহিস্টামিনস। তবে নতুন গবেষণায় শুধু ঘুমের ওষুধ ও মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়েছে, এদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়নি। আর তাই এ গবেষণা থেকেই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না আসার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুশ্চিন্তা নিরোধক এবং ঘুমের বড়ি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ওয়ারউইকের বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক স্কট উইচ বলেন, ‘আমরা সবাই এসব ওষুধ সতর্কতার সঙ্গে সেবন করব। শরীরে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উল্ল্যেখযোগ্য ও মারাত্মক রকমের হয়ে থাকে। তিনি বলেন, ‘এটা বলা যাবে না যে এটা কার্যকর হবে না। আমাদের এ ব্যাপারে রোগীদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন এবং উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যার বিকল্প ব্যবস্থা যেমন কগন্যাটিব বিহ্যাবিওরাল থেরাপি নিতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লা জোল্লা এলাকায় স্ক্রাইপস ক্লিনিক ভিটারবি ফ্যামিলি ¯িপ সেন্টারের ড্যানিয়েল ক্রিপকির নেতৃত্বে একদল চিকিৎসকের গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের বড়ির কারণে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে চার গুণ বেশি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, ২০১০ সালে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৭ হাজার হয়েছে। আর এই অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে ঘুমের ওষুধের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকদের দাবি, কারণ বিশ্লেষণ করে নয়, পরিসংখ্যান ঘেঁটে এ তথ্য খুঁজে পেয়েছেন তারা। গবেষণায় আরো দেখা যায়, যারা অতিমাত্রায় ঘুমের বড়ি খান তাদের ক্যানসারের ঝুঁকি যারা খান না, তাদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। অতিমাত্রায় ঘুমের বড়ি খেলে ঘটতে পারে অকালমৃত্যুর মতো ঘটনা। তবে মানুষ ৫০ বছরে যখন পৌঁছায় তখন এরপর প্রতি দশ বছরে মানুষের ঘুম কমে ২৮ মিনিট করে, একটি গবেষণায় দেখা গেছে। মানুষ পঞ্চাশ-ষাট বছরে পৌঁছালে গাঢ় ঘুম কমে যায় অনেকটাই। ত্রিশ বছর বয়সে যে কর্টিসোল মান থাকে, পঞ্চাশ বছর বয়সে ১২ গুণ বেড়ে যায়। পঁচিশজনের একজনের ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরে। শ্বাসরুদ্ধ হয় ক্ষণকালের নিদ্রায়।

অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেলে কী করতে হবেÑসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিমানের কাজ আক্রান্তকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া।

যদি হাসপাতালে নিতে দেরি হয় তাহলে কুসুম গরম পানিতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশিয়ে তা আক্রান্তকে খাইয়ে দিতে হবে, যাতে তার পাকস্থলী থেকে বিষ পাতলা হয়ে গিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়াতে হবে যাতে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীরের বিষ বের হয়ে যায়। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নিতে না পারে তাহলে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিতে হবে। আর অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে আক্রান্তকে যতটা সম্ভব সজাগ রাখতে। উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে পিঠে হালকা চাপ দেয়া যেতে পারে। এতে একদিকে আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন অচেতন অবস্থায় যেতে বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে বমি হয়ে বিষ বের হয়ে যাবে। তবে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই হার্টে (হৃৎ?পি-ে) আঘাত না লাগে, কারণ এ সময় সাধারণত হার্ট দুর্বল অবস্থায় থাকে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক শিরাপথে রোগীকে স্যালাইন দেবেন। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি অনেকক্ষণ আগে বারবিচ্যুরেট খেয়ে থাকে, তাহলে মূত্রবর্ধক ওষুধ দিয়ে রোগীকে প্র¯্রাব করানোর ব্যবস্থাও করবেন। ভালো ঘুমের পূর্ব শর্তÑপ্রতি রাতে সঠিক সময়ে বিছানায় যেতে হবে রাত সাড়ে ৯টায়। প্রতি রাতে রাত এগারোটার দিকে, দেহ ঘড়ি দেহে নামায় তন্দ্রা-নিঃসৃত হয় হরমোন মেলাট নিন খুব ভালো। এরপরও যদি ঘুম কম হয়, জেগে থাকার সময় ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু। জোর করে জেগে থাকতে হচ্ছে? পরের রাতে দীর্ঘ ঘুম দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া। জেগে আছেন তবু নিন্দ্রালু, দুপুরে ভোজনের পর ১৫ মিনিট দিবানিন্দ্রায় সমস্যার বেশ সমাধান হয়। জেগে থাকার সময় ঘুম ঘুম লাগে না। জাপানি গবেষকদের ভাষ্য।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

monifoyzunessa@gmail.com

 

"