মতামত

খালেদা জিয়ার জামিন ও নালিশের রাজনীতি

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

রেজাউল করিম খান
ama ami

খালেদা জিয়া জামিন পেলেন। সোমবার হাইকোর্ট তার জামিন মঞ্জুর করেছেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আখতারুজ্জামান তাকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ৩২ দিন কারাবাসের পর জামিন মঞ্জুর হলেও মুক্তি পেতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। তার মামলা ও সাজা নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকেই সব মহলে আলোচনা চলছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, বিএনপি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যে আন্দোলন করছিল, তা সফল হবে না। কারণ তারা আন্দোলনের শক্তি হারিয়েছে। দলীয় প্রধানকে কারগারে নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করবে না। এমনকি, দলের নেতাকর্মীরাও রাস্তায় নামবে না। তবে অনেকের আশঙ্কা ছিল, দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে দেশে আবার জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংসতা হবে, বাড়বে জনদুর্ভোগ। দেশের তা-বড় তা-বড় রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, প-িত, বুদ্ধিজীবী, প্রভাবশালী বিদেশি কূটনীতিক সবাই সংবাদ সম্মেলনে, গোলটেবিল আলোচনায়, সংবাদপত্রে, টিভি টকশোতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারও তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে রাস্তায় নামায়। বলা হয়, জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য তারা প্রস্তুত থাকবে। আর যারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব সাজসরঞ্জাম নিয়ে তারা রাজপথে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেফতার চলতে থাকে। অবশেষে বিচারক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করেন। খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়। রায় কার্যকরের দায়িত্ব সরকারের। তাকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরান ঢাকার কারাগারে পাঠানো হয়। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। সাদা শাড়ি পরা অবস্থায় তাকে বেশ বিষণœ দেখাচ্ছিল। এর কিছুক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরিশালের জনসভায় বলেন, ‘কোথায় আজ খালেদা জিয়া?’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই দুনিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ পান। একাধিকবার তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এখন তিনি ২২৮ বছরের পুরোনো পরিত্যক্ত কারাগারের নির্জন কক্ষে। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তার মনের মধ্যে এখন কী ঝড় বইছে, তা অন্য কেউ হয়তো বুঝতে পারবে না। কিন্তু অনুমান করা যায়। হয়তো ভাবছেন, সর্বশেষ ক্ষমতা হারানোর পর কী কী ভুল করেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন কি ভুল ছিল? কিন্তু এটা তো সত্যি, এর আগে বড় রাজনৈতিক দল যতগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে, সেই নির্বাচনের পর কোনো সরকারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। ওই সময় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে শেখ হাসিনার সরকারও স্বল্পস্থায়ী হবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের প্রধান ও দলের শীর্ষ নেতাদের মুখে তেমন কথাই শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের সুর দ্রুতই পাল্টে গেল। টানা দ্বিতীয়বারের সরকার বিএনপি-জামায়াতকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আমলে নিয়ে তাদের মেরুদ- ভাঙার সব আয়োজন সম্পন্ন করে। চলতে থাকে গ্রেফতার-হামলা-মামলা। কর্মীদের অধিকাংশই বাড়িছাড়া অথবা কারাগারে। ভয়ে কেউ রাস্তায় নামে না। আন্দোলনের মূল শক্তি হিসেবে যাদের ওপর ভরসা করা হয়েছিল, সেই জামায়াত-শিবিরও পালিয়ে গেল। অনেকে গ্রেফতার হলো। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হলো। কেউ তেমন ট্যাঁ-ফোঁ করল না।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, আগের নির্বাচনগুলো বর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে নামে। মূলত আন্দোলনের তীব্রতার কারণেই সরকার তত্ত্বাবধায়ক সকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ২০১৪ সালে তেমনটি হয়নি অথবা সরকার ‘কঠোর হস্তে’ আন্দোলন দমন করতে সক্ষম হয়েছে। হয়তো এসব কথাই মনে পড়ছে খালেদা জিয়ার। হয়তো আরো ভুল ছিল; তিনি নিজেও কি রাস্তায় নেমেছিলেন? আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে নেতারা যদি ঘরে বসে থাকেন, তাহলে কর্মীরা রাস্তায় পুলিশের গ্রেফতার, জলকামান, লাঠি, কাঁদানে গ্যাস আর গুলির সামনে দাঁড়াবে কেন? তারপরও অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে মিছিল করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু তাদের জামিন ও জেলহাজতে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য দলের কেউ এগিয়ে আসেননি। এর ফলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিএনপির দলীয় লোকবল ও টাকার অভাব আছে বলে মনে হয় না। শুধু সঠিক সময়ে যথার্থ নির্দেশনা না থাকায় দল সুফল লাভে বঞ্চিত হয়েছে।

নির্বাচনের পর বিএনপি ও তার জোট বর্তমান সরকারকে অনির্বাচিত অবৈধ বলে আসছিল। সেই কারণে তাদের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও মধ্যবর্তী নির্বাচন। কিন্তু এও বোঝা গিয়েছিল, সরকার তাদের সে দাবি মানবে না। শেখ হাসিনার সাফ কথাÑসংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপরও বিএনপি এই সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন করতে থাকে, জানাতে থাকে নালিশ। সভা-সমাবেশের অনুমতি চেয়ে চিঠি লেখা হয় কর্তৃপক্ষের কাছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমতি দেওয়া হয় না। এতে বড় নেতারা ক্ষুব্ধ হওয়ার পরিবর্তে ভেতরে ভেতরে স্বস্তিবোধ করেন। কারণ তারা হাজতে যেতে ভয় পান, ভয় থাকে সম্পদ হারানোর, সেই সঙ্গে আছে প্রাণাতঙ্ক। সান্ত¦না হিসেবে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেসব মিছিলে ভয়ে খুব বেশি মানুষ উপস্থিত হয় না। পুলিশ সহজেই তাদের সরিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ নেতারাও কটাক্ষ করার সুযোগ পান। বলেন, বিএনপি আন্দোলনের সক্ষমতা হারিয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকার থাকবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার সরকারই সহায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন করবে। এই পর্যায়ে সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই।’ সংগত কারণেই বিএনপি মহাসচিব বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সহজে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেবে না। জনগণকে নিয়ে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে। সহায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না।’ কিন্তু এই দাবিতে আন্দোলনের কোনো আলামত লক্ষ করা যাচ্ছে না। এমনকি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেকের প্রশ্ন, এ সময় রাস্তায় যদি লক্ষ মানুষ নামত, তাহলে কী হতো?

বিএনপি নেতাদের নালিশ শুধু সরকারের কাছেই না, বিদেশিদের কাছেও। কিন্তু তারা তো এসে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে যাবে না। বড় জোর তথাকথিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে। বলতে পারে সবার অংশগ্রগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা। কিন্তু তাদের কথা কি সরকার শুনছে, না শুনবে? তা ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে বিএনপি সরকার ভালো, এমন প্রমাণ কী আছে? ওরা দেশ ও জনগণের জন্য খুব কমই ভাবে। তার প্রয়োজনও হয় না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিমুখ, দরিদ্র, অসচেতন, প্রায় অশিক্ষিত, ইতিহাসবিশ্রুত, ধর্মান্ধ আবেগপ্রবণ মানুষকে পক্ষে নেওয়া খুব কঠিন না। নির্বাচনকে নিজের মতো করার সুযোগ তো আছেই। আছে কালোটাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার। অনুমান করা যায়, সে রকম পরিস্থিতির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে আগামী নির্বাচন। সুতরাং ওই নির্বাচন কেমন হবে, তা অনুমান করা যায়! এর পরও নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাড়া খালেদা জিয়ার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। তবে ভেতরে ভেতরে চলছে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ। প্রার্থীরাও ঘরে বসে নেই। কিন্তু তাদের সামনে সমস্যা অনেক। প্রায় প্রত্যেকের নামেই মামলা আছে। অনেকেই এলাকায় থাকতে পারেন না। কেউ কেউ এখনো কারাগারে। এ কথা স্বীকার করতে হবে, এ মুহূর্তে বিএনপির আন্দোলনের সক্ষমতা নেই অথবা প্রথম সারির নেতারা আন্দোলনে নামতে ভয় পান। সে ক্ষেত্রে দলের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি ও নির্বাচনের প্রস্তুতিকেই প্রধান করণীয় হিসেবে গ্রহণ করা সংগত হবে বলে রাজনীতি সচেতন মানুষের ধারণা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rezaul.natore@yahoo.com

 

"