মতামত

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

তানভীর হাসান জোহা

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা পায় গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্য দিয়ে। এর ছয় দিনের মাথায় জঙ্গিরা আরো একটি বড় হামলা চালায় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। এরপর আর কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা দেশে ঘটেনি। এর অন্যতম কারণ ছিল জঙ্গি দমনে সরকারের আন্তরিকতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকটি সফল অভিযান। জঙ্গি হামলা কারোরই কাম্য নয়। তবে অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ একটি রোল মডেল। এভাবে ভেবে আমরা হয় তো দূরদর্শিতার পরিচয় দেইনি। কারণ জঙ্গিরা এত দিন আক্রমণ না চালালেও তাদের অন্যসব কর্মকা- থেমে থাকেনি। তারা বিভিন্নভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং সুসংগঠিত হয়েছে তা ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে। যদিও তাদের সাম্প্র্রতিক একটি হামলা সফল হয়নি। অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা সেটা প্রমাণিত হয়েছে। তবে, যেভাবে দিনদুপুরে জনমানুষের সম্মুখে আক্রমণ চালানো হয়েছে, তাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। কারণ হামলাকারী এ ক্ষেত্রে জীবনের পরোয়া করেনি। যেখানে হামলাকারীর নিশ্চিত ধরা পড়ার ভয় থাকে, সেখানে কতটা সাহসী এবং জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাসী হলে এমন হামলা চালানো যায়, এটা সহজেই বোধগম্য। অনেক পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি নিয়ে হামলাটি চালানো হয়েছিল। টার্গেটের মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে ছিল পেশাদারিত্বের ছাপ। সারভাইক্যাল-৩ থেকে সারভাইক্যাল-৬ এরিয়াতে স্প্যাইনাল কর্ড কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করতে চেয়েছিল জঙ্গি। এখন প্রশ্ন হলো, হামলাকারী কে এবং তার সঙ্গে কারা কাজ করেছে? আর অর্থের জোগানদাতাই বা কে? এসব তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে বের হয়ে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বরাবরই জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। কয়েক বছর আগে লেখক, অধ্যাপক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর জঙ্গি হামলার সময় তিনিও হুমকি পাচ্ছিলেন। তখন তার পাহারায় পুলিশ মোতায়েন করে সরকার। তার পরও শেষ রক্ষা হলো না। জঙ্গিদের রোষানলে পড়তেই হলো। আক্রমণের পরপরই ধরা পড়ে যাওয়া যুবকটি। ধরা পড়ার পর সে তথ্য দিয়েছে, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে সে ‘ইসলামের শত্রু’ মনে করে এবং জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী হয়েই সে এ হামলাটি করেছে।

বিশ্বজুড়েই জঙ্গি হামলার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। বর্তমানে জঙ্গিবাদের পরিভাষায় লোন উলফ বা সিঙ্গেল অ্যাটাকের ঘটনা ঘটছে বেশি। বাংলাদেশের ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গিরাও এই ট্রেন্ড বেছে নিয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর আহমদিয়া জামে মসজিদে ‘লোন উলফ’ হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ‘লোন উলফ’ হামলার অর্থ হলো একা একজন ব্যক্তির ‘টার্গেটেড’ কোনো স্থানে গিয়ে আত্মঘাতী হামলা করা। অপরাধ বিজ্ঞানে এ ধরনের হামলাকে ‘লোন উলফ অ্যাটাক’ নামে অভিহিত করা হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, লোন উলফ অ্যাটাক প্রতিহত করা বেশ কঠিন। কারণ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কোনো গ্রুপ যুক্ত থাকে না, হামলাকারী একা বলে কোনো বৈঠক, নেটওয়ার্কিং ইত্যাদিও থাকে না। যা কিছু থাকে তার সবই তার মনে। তাই গোয়েন্দা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকে কোনো আভাস দিতে পারে না, হামলা ঠেকাতে বিশেষ কোনো প্রস্তুতিও নেওয়া যায় না। এ ধরনের হামলার কারণে হামলাকারী জীবিত থাকেন না কিংবা জীবিত থাকলেও তার কাছ থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ‘লোন উলফ’ হামলাকারী একা টার্গেটেড স্থানে যাওয়ার কারণে মানুষের সন্দেহও কম থাকে। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘লোন উলফ’ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের জঙ্গিরা কেবল এনক্রিপ্টেড মেসেঞ্জার অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকে। এ কারণে একজন ‘লোন উলফ’ জঙ্গি নিজের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থেকেও গোপনে গোপনে হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে। বর্তমান সময়ে যে আত্মঘাতী হামলা দেখা যাচ্ছে, সেগুলো অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।

বর্তমানে, বাংলাদেশে একাধিক মতাদর্শের জঙ্গিরা সক্রিয়। তারা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফরম এবং অ্যাপস ব্যবহার করে তাদের কর্মকা- পরিচালনা করছে। এ ক্ষেত্রে উগ্রপন্থি গ্রুপসমূহ তাদের তালিম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং অপারেশনাল পরিকল্পনা সর্বদাই অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে করে এসেছে। একটি নির্দিষ্ট আইপিতে রেজি. হওয়ার পর উগ্রপন্থি মতবাদের সদস্যরা একটি অ্যাপস লিংক পায়। সেই লিংক্টি তারা ডাউনলোড করে মূলধারার সংগঠনকারীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত করে। এতে তাদের ইলেকট্রনিক অবস্থান অনেকটাই গোপনীয় থাকে। পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। আইএস এবং আল-কায়েদা নেটওয়ার্ককে একাধিক অ্যাপসের অস্তিত্ব ইন্টারনেট, ডিপঅয়েবে পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে আনুমানিক চার হাজারের বেশি গ্রুপ ওপেন, ক্লোজড এবং সিক্রেট হিসেবে তাদের প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখনো পর্যন্ত ইউটিউবে, ফেসবুকে বাংলা ভাষায় জিহাদের অডিও ভিজ্যুয়াল লিংকগুলো স্বক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় এখনো পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে শায়খ আবদুর রহমান, ডা. আসাদুল্লাহ গালিব, আবদুস ছামাদ সালাফিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের খেলাফত-সংক্রান্ত অডিও ক্লিপ পাওয়া যায়। যেগুলো শুনে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষরা খুব সহজেই উগ্রপন্থি চেতনায় প্রভাবিত হতে পারে। তাদের একটাই উদ্দেশ্য, সেটি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। সেই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমগুলোয় তাদের এই মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বেছে নিয়েছে। এ ছাড়া জনমনে প্রভাব বিস্তার করার জন্য তৈরি করছে ডিজিটাল কন্টেন। যেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে সিরিয়া, ফিলিস্তিনে যুদ্ধরত ছবি। ইন্টারনেটভিত্তিক জঙ্গি কার্যক্রম বা রেডিক্যালাইজেশন সারা বিশ্বেই চলমান। বিশ্বের বিভিন্ন অ্যাপস বা ইন্টারনেটের সক্ষমতাকে তারা ব্যবহার করছে। আমাদের দেশে সমস্যা হলো একটি সাইট যদি বন্ধ করা হয়, সঙ্গে সঙ্গেই নতুন সাইট খুলছে জঙ্গিরা। খোলা-বন্ধ একটা যুদ্ধের মতো। এটা হলো তথ্যপ্রযুক্তির যুদ্ধ। এটিকে দমন করতে হলে দক্ষ মনিটরিং ব্যবস্থা চলমান রাখতে হবে। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও নিশ্চিত করতে হবে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই বিষয়টি ভেবে দেখবে।

লেখক : আইটি বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

"