বিশ্লেষণ

উর্বরতা সংরক্ষণ ও খাদ্য নিরাপত্তা

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

কৃষির ভাষায় নানা রকম ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিলাদ্রব্যের ধ্বংসাবশেষ দ্বারা গঠিত উদ্ভিদের অবলম্বন এবং পুষ্টির উৎস হলো মাটি। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের শতকরা ৪৬ ভাগ লোক এখনো তাদের জীবন-জীবিকার জন্য কৃষির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। মাটিকে কেন্দ্র করেই কৃষি। মাটির সর্বোচ্চ বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ, পশু-পাখি ও অন্যান্য জীব-জন্তুর খাদ্য, বাসস্থান এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে মাটির প্রকৃতি, উর্বরতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকতে হবে কৃষকের। কারণ, কোনো জিনিস সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান না থাকলে ওই জিনিসটির সার্থক ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় না এবং তা থেকে পাওয়া যায় না কাক্সিক্ষত সুফল।

মাটি শস্য উৎপাদনের উত্তম মাধ্যম। কোনো আদর্শ মাটিতে শতকরা ৪৫ ভাগ খনিজ পদার্থ, ৫ ভাগ জৈব পদার্থ, ২৫ ভাগ বায়ু ও ২৫ ভাগ পানি থাকে। উদ্ভিদ ও প্রাণির দেহাবশেষ হতে যেসব পদার্থ মাটিতে যুক্ত হয়, সেটাই হলো জৈব পদার্থ। জৈব পদার্থ হচ্ছে মাটির প্রাণ। গুদাম ঘরের মতো এতেই সঞ্চিত থাকে উদ্ভিদের সব খাদ্য উপাদান। জৈব পদার্থের কারণে মাটির পানি, তাপধারণ ক্ষমতা, বায়ু চলাচল বৃৃদ্ধি পায়। মাটির বুনট উন্নত হয়। জৈব পদার্থ বালু মাটিকে দোআঁশ মাটিতে রূপান্তরে সহায়তা করে। মাটির অমøত্ব হ্রাস করে। ভূমি ক্ষয়রোধ করে। ফসফেট সারের কার্যকারিতা বাড়ায়। বালাইনাশক ও রাসায়নিক সারের বিষাক্ততা নাশ করে। মাটিতে অণুজীবের খাদ্য জোগায় এবং তাদের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। জৈব পদার্থ শস্যের স্বাদ, গুণগতমান ও ফলন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সাম্প্র্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের মোট আবাদযোগ্য ৮৭ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমির ৬১.১ শতাংশ মাটিতে জৈব পদার্থের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, একই জমিতে বারবার একই ফসলের চাষ, জমিকে বিশ্রাম না দেওয়া এবং রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহারের কারণে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দুই দশক আগেও এ দেশে ২ থেকে ৩ ধরনের সার ব্যবহার হতো। বর্তমানে মাটি পরীক্ষা ছাড়াই গ্রামগঞ্জের সার ব্যবসায়ীদের পরামর্শে এক একটি ফসল চাষের জন্য আট থেকে নয় ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ব্যবসায়ীর সার সম্পর্কে কোনো সম্মক ধারণা নেই। গবেষণায়প্রাপ্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের আবাদি জমির ৪৫.৫ শতাংশের মধ্যে জৈব পদার্থের পরিমাণ রয়েছে ১ শতাংশের নিচে, যা অত্যন্ত নি¤œ মানের। ১৭.১ শতাংশ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ রয়েছে ১ থেকে ১.৭৪ শতাংশ। এটাকেও ভালো মানের মাটি বলা যায় না। এ ছাড়া ২১.৩ শতাংশ জমিতে জৈব পদার্থ রয়েছে ১.৭৪ থেকে ৩.৫ শতাংশ, মাটির স্বাস্থ্য বিবেচনায়, যাকে উত্তম মানের মাটি বলা যায়।

একসময় কৃষক ফসল চাষের সময় প্রচুর জৈবসার ব্যবহার করতেন। প্রতিটি কৃষকের ছিল হাল চাষের জন্য গরু। সেই গরুর গোবর, মুত্র, বাড়ির আবর্জনা মাটির গর্তে স্তূপাকারে সংরক্ষণ করে যে কম্পোস্ট সার তৈরি করা হতো, সেই কম্পোস্ট সার জমি চাষের সময় উত্তমরূপে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হতো। আবার ফসল কাটার পর তার অবশিষ্টাংশও মিশিয়ে দেওয়া হতো মাটির সঙ্গে। কিন্তু এখন গোবর ও ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটির সঙ্গে মেশানো হয় না, বরং জ্বালানি হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। বোরো ধানের চাষ প্রচলনের আগে এ দেশে আমন ধান কাটার পর ডালজাতীয় ফসলের চাষ করা হতো ব্যাপকভাবে। ডালজাতীয় ফসলের শিকড়ের গুটি মাটিতে মিশেও মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করত। ষাটের দশেকের সবুজ বিপ্লবের সময় থেকে দেশে বৃদ্ধি পেয়েছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার। যত দিন যাচ্ছে, রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহার ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক হিসেবে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে ৩৬ লাখ ৮২ হাজার টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়েছে দেশের আবাদি জমিতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সেখানে ব্যবহার হয়েছে ৪৮ লাখ টন সার। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও ৪৮ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এর মধ্যে ইউরিয়া ২৫ লাখ টন, টিএসপি সাড়ে ছয় লাখ টন, ডিএপি সাড়ে আট লাখ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে সাড়ে আট লাখ টন।

বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বাড়ছে ১.৩৭ শতাংশ হারে আর আবাদযোগ্য জমি কমছে শতকরা ১ ভাগ হারে। এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাড়তি খাদ্যচাহিদা মেটাতে কৃষক একই জমিতে তিন থেকে চারবার ফসলের চাষ করছেন। মানা হচ্ছে না পর্যায়ক্রমিক চাষাবাদের কোনো নিয়মকানুন। বেশি ফলনের আশায় চাষ করা হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসল। এসব রাক্ষুসে ফসল মাটি থেকে অধিক পরিমাণে পুষ্টি উপাদান শোষণ করছে। উচ্চতাপমাত্রা ও অধিক বৃষ্টিপাতের কারণেও জমি থেকে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া ইট তৈরির জন্য মাটির ওপরের স্তরের উর্বর মাটির সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে মহামূল্যবান জৈব পদার্থ।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে।

মৃত্তিকাবিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ফসলি জমির মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। এজন্য মাটি পরীক্ষা করে সুষমমাত্রায় সার ব্যবহার করতে হবে। এতে একদিকে যেমন ফসল উৎপাদনের ব্যয় কম হবে, তেমনি ভালো থাকবে মাটির স্বাস্থ্য, উৎপাদিত ফসলের গুণগতমান এবং পরিবেশ।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে চাল উৎপাদিত হয় ১১ মিলিয়ন টন। ১৯৯০ সাল থেকে উচ্চফলনশীল জাত, গুণগতমানের বিশুদ্ধ বীজ, সেচ রাসায়নিক সারসহ আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে খাদ্য উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব হয় এবং ২০১৬ সালে চালের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন টনে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রতি বছর ৩৪ হাজার টন করে। কিন্তু বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও মাটির উর্বরতা হ্রাসের কারণে চালের উৎপাদন আর সে হারে বাড়ছে না। চালের উৎপাদন একটি জায়গায় এসে স্থির হয়ে গেছে। ১৯৭৭ সালে জনপ্রতি বার্ষিক চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ১৮০ কেজি। দ্রুত নগরায়ণ, শিক্ষার হার ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও শাকসবজি এবং ফলমূলের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক চাল ভোগের পরিমাণ শতকরা দশমিক ৭ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে জনপ্রতি বার্ষিক চাল ভোগের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪৬.৬ কেজি এবং চালের মোট প্রয়োজন হবে ৩৫.৩৫ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশে প্রতি বছর শতকরা শূন্য দশমিক ৪ ভাগ হারে ধানের জমি হ্রাস পাচ্ছে। আর চালের ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.১৭ টনের বেশি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থাতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, ২০২১ সালে দেশে ০.৪৪ মিলিয়ন টন চালের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এ ঘাটতি পূরণ করা আমাদের দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানী, পরিশ্রমী কৃষক ও সম্প্রসারণকর্মীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিজমি সুরক্ষা, কৃষি জমির উর্বরতা সংরক্ষণ বেশি করে জৈবসারের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নতুন নতুন প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবন, কৃষি অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষিতে বিনিয়োগবৃদ্ধি, শস্যবীমার প্রচলন এবং কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলাম লেখক

netairoy18@yahoo.com

"