বিদেশ

মালদ্বীপ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় প্রাচীন যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধসভ্যতা বিকাশে ভারতীয় প-িতরা একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। হাজার বছর আগে দক্ষিণের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলের আমলে নৌবাণিজ্যে ভারত শক্তিশালী ছিল। ওই সময় ভারত মহাসাগরকে চোল হ্র্রদ বলা হতো। ভারতীয় নৌ-বাণিজ্যের যে প্রাচীন রুট, তাতে দেখা যায় ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, মিসর, আফ্রিকার মাদাগাস্কার, আবার অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা হয়ে সুমাত্রা, জাভা (মালাক্কা প্রণালি), হংকং, জাপান পর্যন্ত সম্প্রসারিত ছিল। মোদি সরকার এই ‘কটন রুট’কেই নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চায়। প্রচীনকালে ভারতীয় তুলা তথা সুতা এই সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। একদিকে চীনা নেতা শি জিন পিং তার ‘সিল্ক রুট’-এর ধারণা নিয়ে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব যেমনি প্রতিষ্ঠা করতে চান, এর প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত তার পুরোনো ‘কটন রুট’-এর ধারণা প্রমোট করছে। দ্বন্দ্বটা তৈরি হবে সেখানেই। বাণিজ্যনির্ভর এই দ্বন্দ্ব, শেষ অবধি পরিণত হবে সামরিক দ্বন্দ্বে। চীন তার নৌবহরে বিমানবাহী জাহাজ আরো বাড়াচ্ছে। ভারতও ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনী শক্তিশালী করছে। আন্দামানে নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে। বলা হয়, একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বৃহৎ শক্তি, চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকা রয়েছে বৈকি! জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টার যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যে বিবাদ জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পক্ষ নিয়েছে, যা চীনের স্বার্থের বিরোধী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যে নয়া সিল্ক রুটের কথা বলেছেন, তা অন্য চোখে দেখছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এতে বিশাল এক এলাকাজুড়ে চীনা কর্তৃত্ব, প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন, ২১০০ বছর আগে চীনের হ্যান রাজবংশ এই ‘সিল্ক রুট’টি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই ‘সিল্ক রুট’-এর মাধ্যমে চীনের পণ্য (সিল্ক) সদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এর মধ্য দিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য, সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট এর নামকরণ করেছেন ‘নিউ সিল্ক রুট ইকোনমিক বেল্ট’। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। মালদ্বীপের পরিস্থিতি এখন কোনদিকে যাবে বলা মুশকিল। মালদ্বীপের চলমান রাজনৈতিক সংকট আরো খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। মালদ্বীপের পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প-মোদি ফোনালাপ হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ আল হুসেন বলেছেন, ‘মালদ্বীপে জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও সব ধরনের সাংবিধানিক অবমাননার ফলে সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোই ভেঙে পড়েছে। সুতরাং বোঝাই যায়, মালদ্বীপের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ উদ্বিগ্ন। এখন দেখার পালা ওই পরিস্থিতি মালদ্বীপকে কোথায় নিয়ে যায়। মালদ্বীপ নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে এক ধরনের প্রভাববলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতা এ মুহূর্তে আলোচনার অন্যতম একটি বিষয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি আদালত-সরকার দ্বন্দ্বে ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্রটির রাজনীতিতে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার সমাধান এখনো হয়নি। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়, যখন সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহামেদ নাশিদ প্রকাশ্যে ভারতকে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানান। নাশিদের এই আহ্বানের পরপরই চীনের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শ্যুয়াং বলেছেন, আন্তর্জাতিক মহলের উচিত, মালদ্বীপের সার্বভৌমত্ব মাথায় রেখে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা। তৃতীয় পক্ষের এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়ং, যাতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে। তার মতে, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। কিন্তু নির্বাসিত সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের কাছে চীনের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হয়নি। কলম্বো থেকে তিনি টুইটারে জানিয়ে দেন, ভারতের উচিত অবিলম্বে সামরিক প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। চীনের প্রস্তাবকে খারিজ করে তিনি জানান, আলোচনায় পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। এখানে স্মরণ করা প্রয়োজন, ১৯৮৮ সালে ভারত মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। ওই সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কান ভাড়াটে সৈনিকদের একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলে নস্যাৎ হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৮৮ আর ২০১৮ সালের পরিস্থিতি এক নয়। বর্তমান সংকটটা শুরু হয় যখন উচ্চ আদালত ১ ফেব্রুয়ারি নাশিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল মালদিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ১২ জন এমপিকে মুক্তির নির্দেশ দেন। সর্বোচ্চ আদালত তাদের বিচারকে অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন তাদের মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দেশে ১৫ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেন।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ দুই বিচারক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরপরই সুপ্রিম কোর্টের বাকি তিন বিচারক বিরোধীদলীয় এমপিদের মুক্তির রায় প্রত্যাহার করে নেন। পরিস্থিতি সেখানে এখনো থমথমে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন তার তিন মন্ত্রীকে চীন, পাকিস্তান ও সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। ১৯৮৮ সালে ভারত মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ করলেও সাম্প্রতিক সময়গুলোয় দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো নয়। মালদ্বীপ কিছুটা চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ কারণেই মোদি গত চার বছরে একবারও মালদ্বীপ সফর করেননি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের প্রভাব ভারতের অন্যতম চিন্তার কারণ। এটা বিবেচনায় নিয়েই ভারত এসব অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। ফলে স্পষ্টতই এক ধরনের চীন-ভারত দ্বন্দ্বে এই অঞ্চলের দেশগুলো জড়িয়ে পড়ছে। মালদ্বীপের ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা কী হবে, তা বলা না গেলেও মালদ্বীপের ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ রয়েছে। আগামীতে মালদ্বীপে ভারতের ভূমিকা চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, তারা এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি সহ্য করবেন না। ভুবনেশ্বর আইওআর সম্মেলনে (মার্চ ২০১৫) এই মেসেজটিই তারা দিয়েছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নয়া দিক। সিসিলি ও মরিশাসের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ও এ দুটো দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় প্রভাব বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে জাফনা কার্ড ব্যবহার করা, প্রমাণ করে ভারত ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে চায়।

ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন, ভারত প্রাচীনকালে তার কটন রুট ব্যবহার করে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল। একই সঙ্গে একটি মেরিটাইম সিল্ক রুটের কথাও আমরা জানি, যা কিনা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটা যোগসূত্র ঘটিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চীন থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করতে চীনারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, মালয়েশিয়ায় এসেছিল। পরে তারা স্থায়ী হয়ে যায়। এমন কথাও বলা হয়, ব্রুনাইয়ে ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে চীনাদের অবদান ছিল বেশি। ২০১২ সালে আমি তুরস্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে চীনাদের এই সিল্ক রুটের আগ্রহের কথা জানতে পারি। এই সিল্ক রুটের যে অংশ তুরস্কে পড়েছে, আমি সেই পথ ধরেও বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দিয়েছি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার প্রথম সফরে কাজাখস্তানে গিয়ে তার ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছিলেন। এর পরের মাসে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে তিনি দ্বিতীয় ‘মেরিটাইম সিল্ক রুট’-এর কথাও বলেন। এতে একটা ধারণার জন্ম হয়, চীন শুধু মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিশাল এক অর্থনৈতিক সংযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। ইরানে যে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, এটা নিশ্চয়ই অনেক পাঠকই জানেন। এখন যে প্রশ্নটি অনেক পর্যবেক্ষকই করেন, তা হচ্ছে চীনের এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট’-এর নীতি ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটুকু সাংঘর্ষিক। কেননা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার নিজস্ব মডেলে ভারতীয় মনরো ডকট্রিনে কাঠামো গড়ে তুলছে।

তা ছাড়া অর্থনৈতিক প্রভাববলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দ্বন্দ্ব তাই অনিবার্য। আর আটলান্টিক ও প্যাসিফিকের ওপার থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা ওঠাতে চাইবে। আগামী দিনগুলো তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন চীন-ভারত দ্বন্দ্ব যদি অব্যাহত তাকে, তাহলে এ অঞ্চলের দেশুলোও এতে প্রভাবিত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ঝুঁকির মুখে থাকবে ব্রিকস ব্যাংক। ভারত অন্যতম উঠতি শক্তি। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র আছে ভারতের এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা পৃথিবীর শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি। এরা ভারতের স্বার্থকে সব সময় বড় করে দেখতে চায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ইতোমধ্যে ভারতের এক ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টদের চোখ এখন ভারত মহাসাগরের দিকে। ভারত মহাসাগরে শুধু যে বিশাল সম্পদই রয়েছে, তা নয়। বরং বিশ্বের ‘কার্গো শিপমেন্ট’-এর অর্ধেক পরিবাহিত হয় ওই ভারত মহাসাগর দিয়ে। একই সঙ্গে ৩ ভাগের ১ ভাগ কার্গো, ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৩ ভাগের ২ ভাগ এবং ৪ ভাগের ৩ ভাগ ট্রাফিক পৃথিবীর অনত্র যেতে ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ। পৃথিবীর আমদানীকৃত পণ্যের (তেলসহ) শতকরা ৯০ ভাগ পরিবাহিত হয় এই সামুদ্রিক রুট ব্যবহার করে। সুতরাং এই সমুদ্রপথের নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি করে। মালদ্বীপে ভারত ও চীনের স্বার্থ রয়েছে। মালেতে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ভারতের একটি কোম্পানি কন্ট্রাক্ট পেয়েছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন সেই কোম্পানি বাতিল করে একটি চীনা কোম্পানিকে দেন। চীন সেখানে বিশাল বিনিয়োগ করছে। গত ডিসেম্বরে (২০১৭) চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। চীন যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে মালদ্বীপের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

raihan567@yahoo.com

"