ব্রেকিং নিউজ

নিবন্ধ

শিশুর নিরাপত্তা

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

সফিউল্লাহ আনসারী

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ, আগামী সম্ভাবনার কর্ণধার। শিশুমাত্রই নির্মলতা আর পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি। শিশুরা নিষ্পাপ নিরপরাধ। শিশুর প্রতি মমত্ববোধ নেই এমন মানুষ খুব কমই আছে। পরিবারে সবার প্রিয় ও আদরের পাত্র মানেই শিশু। হোক সে ছেলে অথবা মেয়ে। শিশুর প্রতি ভালোবাসার কোনো হিসাব বা একটি দিনে সীমাবদ্ধতা নেই। শিশুর প্রতি আমাদের মমত্ববোধ সব সময়, সব অবস্থায় এবং অবস্থানে খুবই আবেগী। শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ ও আস্থার জায়গা তার মা-বাবার কোল, তার পরিবার। শিশুর নিরাপত্তায় সমাজের দায়বদ্ধতাও অনেক। কারণ একজন শিশু শুধু তার পরিবারই নয়, সে বেড়ে উঠে তার সমাজে। সমাজের কৃষ্টি-কালচার, নিয়ম-কানুন, সমাজের প্রতি তার কর্তব্য বিভিন্নভাবে শিশুরাও সমাজ দ্বারা প্রভাবিত।

শিশুর প্রতি আদর-ভালোবাসার কমতি না থাকলেও বর্তমানে আমাদের সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব আর অপরাধ প্রবণতার ঘৃণ্য কিছু ঘটনা আমাদের বিবেকবোধকে দংশিত করছে। লজ্জায় মাথা নিচু হচ্ছে শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণের কারণে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকায় এক শিশুর শিক্ষক কর্তৃক প্রথমে শারীরিক নির্যাতন ও অমানবিকতায় নির্যাতিত শিশুটির মৃত্যু শুধু ভালুকা নয়, সারা দেশের মানুষকে দুঃখ দিয়েছে, করেছে মর্মাহত, বিবেককে তাড়িত করেছে প্রবলভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু হত্যার বিচার চেয়ে এই ঘৃণ্য কাজের প্রতি নিন্দার ঝড় বইছে। শিশুহত্যার মতো পৈশাচিকতা এই আধুনিক ও সভ্যসমাজে কোনোভাবে কাম্য নয়। বরং ঘৃণা ও সবচেয়ে বড় অপরাধ।

আধুনিক সভ্যসমাজে শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধপ্রবণতা কেন? শিশুর প্রতি দুর্বলতা, শিশুর অসহায়ত্ব এবং সরলতা অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়। কারণ শিশুর প্রতি মানুষের আবেগ বেশি কাজ করে, তাই অপরাধীর টার্গেট কোমলমতি শিশু। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, অপ্রতিরোধ্য শিশুশ্রম, পরকীয়া, সম্পদের লোভ, বেকারত্ব, ভিনদেশি কালচার-সংস্কৃতিতে বিদেশি প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তিতে পর্নোগ্রাফির প্রসার ও সহজলভ্যতা, বেপরোয়া জীবন-যাপন, পাচার, কর্তৃত্বের বিরোধ-শত্রুতা, ব্যক্তি স্বার্থপরতাবিষয়ক নেতিবাচক প্রভাবে সমাজের বিবেকবর্জিত কতিপয় নোংরা মস্তিষ্কের লোক শিশুদের প্রতি নৃশংস আচরণে সম্পৃক্ত হচ্ছে। নতুনভাবে যোগ হয়েছে শিক্ষক কর্তৃক কোমলমতি শিক্ষার্থীকে হত্যার মতো জঘন্যতা।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ আমরা প্রায়ই বলে থাকি। শিশুরাই আগামী দিনে সমাজ গড়ার কারিগর। কোমলমতি এসব অবুঝ শিশুরাই শিকার হচ্ছে খুন, ঘুম, অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন নির্যাতনের। নিষ্পাপ শিশুরা সংসারের বন্ধনকে অটুট করে। অথচ দুর্বলতার সুযোগে আজ দুর্বৃত্তদের ঘৃণ্য টার্গেট কোমলমতি শিশু। শিশুর প্রতি অমানবিকতা সমাজে সৃষ্টি করে মানবিক বির্পযয়। শিশু অপহরণ, শিশুশ্রম, শিশুর প্রতিবৈষম্য, অত্যাচার ও হত্যাকা-ের ঘটনা ইদানীং উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। বর্তমান সময়ে সমাজের জন্য আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর প্রতি বর্বরতা শিশু শিক্ষার প্রতি হুমকি, এমনকি অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের (ধর্মীয়) আবাসিক প্রতিষ্ঠানে দিতে আতঙ্কগ্রস্ত।

আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী আইন রয়েছে। ধর্মীয় নির্দেশায় রয়েছে শিশুর প্রতি মমত্ববোধের বিষয়। শিশুর জন্মের প্রথম দিন থেকে পরিণত বয়সে উপনীত হওয়া পর্যন্ত তার লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও তার জীবনের উত্তম বিকাশের জন্য মা-বাবার প্রতি বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ছোটকে স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়কে সম্মান দেখায় না, সে আমার উম্মত নয়।’ (বোখারি)

শুধু ইসলাম ধর্মেই নয় অন্যান্য ধর্মে শিশুর প্রতি স্নেহ-মমতার নির্দেশ রয়েছে।

শিশুর প্রতি দুর্বলতা নেই এমন ব্যক্তি খুব কমই আছে। তার পরও ইদানীং শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে গেছে। মা-বাবা কর্তৃক সন্তান হত্যার মতো অমানবিক ঘৃণ্য ঘটনা সত্যিই সভ্যসমাজের বুদ্ধিমান জীব হিসেবে মানুষকে বিবেকহীনতায় নিক্ষেপ করে, যা কখনোই কাম্য নয়। শিশুর প্রতি মানুষের আবেগ বেশি কাজ করে বলেই অপরাধীদের শিকার কোমলমতি শিশু। শিশুহত্যা ও নির্যাতনের মতো ঘটনা থেকে বাঁচতে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাগ্রত করে পারিবারিক বন্ধনে শিশুকে সুনজরে রেখে তাদের সার্বিক মঙ্গল কামনায় সদা জাগ্রত থাকতে হবে, তবেই শিশু দিবসের সার্থকতা আসবে। বিকৃত মানসিকতার পরিবর্তনে এবং শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলনে গড়ে তুলতে হবে। তার সঙ্গে পারিবারিক বোঝাপড়া ও শিশুর প্রতি সহমর্মিতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

‘বিশ্বব্যাপী শিশুদের সম্মান করতে দিবসটি পালিত হয়। শিশু দিবস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় পালিত হয়ে থাকে, বিশ্বব্যাপী শিশুদের সম্মান করতে। শিশু দিবসটি প্রথমবার তুরস্কে পালিত হয়েছিল ১৯২০ এপ্রিল ২৩। বিশ্ব শিশু দিবস নভেম্বর ২০ উদযাপন করা হয় এবং আন্তর্জাতিক শিশু দিবস জুন ১ তারিখে উদযাপন করা হয়। তবে বিভিন্ন দেশে নিজস্ব নির্দিষ্ট দিন আছে শিশু দিবসটিকে উদযাপন করার।’ বাংলাদেশে ১৭ মার্চ পালিত হয় শিশু দিবস। (ইউকিপিডিয়া)

জাগ্রত হোক মানবিক মূল্যবোধ, বন্ধ হোক শিশুর প্রতি সহিংসতা। শিশুকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে তার প্রতি আমাদের মমত্ববোধ বাড়িয়ে আসুন সচেতন হই। সচেতনতাই অনেকাংশে শিশুজীবন সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ফুলের মতো জীবনের অধিকারী শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা ও তাদের অধিকার আদায়েÑশিশু নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ সময়ের দাবি। শিশুর জীবনের হুমকি মোকাবিলায় এবং তাদের সুরক্ষার জন্য পরিবারের ভূমিকার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি। শিশু দিবস সার্থক হবে শিশুর নিরাপত্তায়, শিশুর প্রতি সহনশীল আচরণ আর ভালোবাসায়।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

shofiullahansari@gmail.com 

"