মতামত

জাতীয় নির্বাচন ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

যদিও আগামী নির্বাচনের প্রায় এক বছর বাকি, তবু বর্তমানে বাংলাদেশে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, মনে হচ্ছে নির্বাচন বোধ হয় নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছু আগেই অনুষ্ঠিত হতে পারে। অবশ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ওই সম্ভাবনাকে নাকোচ করে দিয়েছেন। সরকারের সামনে এমন কোনো সংকট নেই, যে কারণে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। মনে হয় সরকারি দল থেকে কৌশলগত কারণে নির্বাচনের ইস্যুটা এমনভাবে করা হয়েছে, বিদ্যমান সব রাজনৈতিক দল আগ্রহান্বিত হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরেকটা বিশেষ কারণ, বোধহয় বিএনপিকে একটু বাজিয়ে দেখা, কেননা নির্বাচন এলেই তারা যে তা বয়কটের কথা বলে, অন্ততপক্ষে এবারও তা বলবে কি না। নির্বাচনী বলটা বিএনপির কোর্টে এমনভাবে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তাদের কিছু না কিছু খেলতে হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে যথেষ্ট সময় নেওয়া হয়েছে। প্রায় সব দলের সঙ্গে আলাপ করা হয়েছে এবং বেশ কিছুটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এমনকি কমিশন গঠনের ব্যাপারে বিএনপি কোনো বিরূপ মতামতও প্রকাশ করেনি। বরং প্রধান নির্বাচন কমিশনার যথাসময়ে সংবিধানসম্মতভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে সর্বাত্মকভাবে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

নির্বাচন সম্পর্কে খালেদা জিয়ার একই কথা। শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। তারা দাবি করেছেন, সহায়ক সরকারের। যা মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প। বর্তমান সাংবিধানিক ধারায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকারই হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সে সরকারে কারা থাকবেন, তা নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। তবে আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে শেখ হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কীভাবে তিনি কাদের নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবেন। তবে ওই সরকারকে সীমিত আকারে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নীতিনির্ধারণের কোনো বিষয় নিয়ে সরকার পরিচালনা পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট করা হবে না। এমনকি প্রশাসনকেও নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বে কাজ করতে হবে। সেনাবাহিনী নির্বাচনে দায়িত্বে নিয়োজিত করা হবে কি নাÑতাও নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। অনেকের ধারণা, নির্বাচন যেভাবেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন, এবার বিএনপি নির্বাচন থেকে দূরে সরে থাকবে না। অতীতে যে ভুল তারা করেছে এবং সে কারণে যে বিপর্যয় তাদের ওপর নেমে এসেছে, তার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে সক্ষম না হলেও, বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে।

অবশ্য এর বাইরেও কিছু কথা রয়েছে। বিএনপি ও তার সহযোগী দল জামায়াত-শিবির চক্রের বা আন্তর্জাতিক কোনো গোষ্ঠীর যদি এমন এজেন্ডা থেকে থাকে, হঠাৎ করে শেখ হাসিনা সরকারকে হটিয়ে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। তাহলে তারা সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় আসবে না এবং নির্বাচনেও আসতে রাজি হবে না। অবশ্য দেশের মানুষ নির্বাচন চায়। অস্বাভাবিকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হোকÑএটা কেউ চায় না। কিন্তু সব সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। যেখানে পরপর দুটো সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, সেখানে যে বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ঘটনা ঘটবে না, এরূপ দাবি করা বোধহয় সমুচিত নয়। বরং বাংলাদেশের ব্যাপারে যারা মোড়লিপনা করে থাকেন, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্টের কথা বিবেচনায় নিলে, এখানে যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক হত্যাকা- সংগঠিত করে ক্ষমতার রদবদল সম্ভব করার প্রক্রিয়ায় তো অনেকে হয়তো নিয়োজিত আছেন। বিশেষ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যে দলগুলোর ক্ষমতাসীন হওয়া অসম্ভব, যারা শেখ হাসিনাকে তাদের এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং বারবার তাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং চালাচ্ছেন, তারা যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, কিছুই করবেন না, এরূপ চিন্তারও অবকাশ নেই।

একবার ভেবে দেখা যাক, নির্বাচন বেশ কিছুটা অবাধ ও নিরপেক্ষ এবং অংশীদারিত্বপূর্ণ হলে, ফলাফল কী হতে পারে? অনেকে বলে থাকেন, যারা ক্ষমতাসীন তাদের বিরুদ্ধে স্বভাবতই জনমত থাকে। কেননা, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে এমন কাজ করতে হয়, যা সাধারণ মানুষ আপাতদৃষ্টিতে তাদের স্বার্থবিরোধী বলে মনে করেন। ধরা যাক বিদ্যুতের ব্যাপার। দিনে দিনে প্রতি ইউনিটের দাম বেড়েই চলেছে। এখন এমন একটা পর্যায়ে এসেছে, অনেকেই তা অসহনশীল মনে করছেন। কিন্তু ৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে যে হাজার হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বহির্বিশ্বের ঋণ নিতে হয়েছে, যেভাবে দিনের পর দিন উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে তো জনগণের একটু বোঝা বইতেই হবে। প্রায় ৬০ শতাংশ জনগণের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয়েছে অবশ্যই জনগণের কর বৃদ্ধি করে। আর এ কর বৃদ্ধি করেই উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে হয়, এটাই তো বাস্তবতা। পদ্মা সেতু আমাদের একটা প্রাইভেট প্রকল্প। আমরা নিজস্ব সম্পদে এই সেতু নির্মাণ করছি। এই সেতু তৈরি হলে, প্রতিদিন যে এর ওপর দিয়ে হাজার হাজার গাড়ি চলবে, তা থেকে ট্যাক্স আদায় করেই তো পদ্মা সেতুর ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর এভাবেই ক্রমাগত ট্যাক্স বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যমান অর্থনীতির এটাই তো বৈশিষ্ট্য। সার্ভিস খাতে যে বিপুল জনকল্যাণমুখী অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, তার ব্যয়ভারও তো জনগণকেই বইতে হবে। এসব যদি জনগণের ক্ষোভের কারণ হয় এবং সে কারণে যদি জনগণ ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, তাহলে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি হবে কী করে? জনগণ দেখবে যে, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের কারণে সরকার তাদের কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য দিতে সক্ষম হয়েছে। তারা তখন বিবেচনায় নেবেন, আওয়ামী লীগের ১০ বছর আগে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিগত ১০ বছরে কতটুকু উন্নয়নকাজ করেছে এবং তার দ্বারা জনগণ কতটুকু উপকৃত হয়েছিল। নিরপেক্ষ নির্বাচনী ভোট দিতে হলে অবশ্যই বিবেচনা হবে, শেখ হাসিনা এমন কিছু করেছেন, জনমতের ওপর ভর করে নির্বাচনে বিজয়ী হবেন। তিনি প্রত্যাশা করতে পারেন, সেই জনমত তার পক্ষেই আছে এবং আগামী এক বছরেও জনমত ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে। কারণ ওই সময়ের ভেতর অনেক বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে এবং জনগণ তার সুফল ভোগ করতে শুরু করবে। দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে ও বহির্বিশ্বে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে ক্রমাগত এগিয়ে চলবে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদকে সার্থকভাব মোকাবিলা করে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সুসংহত করে, জনগণের জীবন-যাত্রার মান বৃদ্ধি করে, দেশে খাদ্য নিরাপত্তার মান নিশ্চিত করে, ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের ভেতর উন্নত দেশে রূপান্তর করার যে প্রচেষ্টায় দিন-রাত শেখ হাসিনার সরকার কাজ করে যাচ্ছে, তা জনগণ নির্বাচনের আগে অবশ্যই বিবেচনায় নেবে।

সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ যোগ্য সরকারকে ভোট দেবে। আর সে ভোটের ফলাফল যে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের হাতে থাকবে, তা প্রায় নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাই আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে কারচুপি করার তো প্রশ্নই আসে না। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই শেখ হাসিনা তার দলীয় অনুসারীদের বলেছেন, নির্বাচনে বিজয় সুনিশ্চিত করতে হলে, জনগণের আস্থা অর্জন করুন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীরাই মনোনয়ন পাবেন। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। সুতরাং, আগামী জাতীয় নির্বাচনে কারচুপির সম্ভাবনা একেবারেই অমূলক ও অগ্রহণযোগ্য।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

"