উন্নয়ন দর্শন

শ্বেত বিপ্লবের গল্প ও একজন গোয়ালা

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০২

এস এম মুকুল

ভারতের সাদা বিপ্লবের জনক বলে খ্যাত, দেশটির বিখ্যাত দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি আমুলের প্রতিষ্ঠাতা ভারগিস কুরিয়েন। কুরিয়েনকে সারা বিশ্বেই দুগ্ধশিল্পের বিকাশে অন্যতম পথিকৃৎ বলে মানা হয়। তার হাত ধরেই ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম গড়ে ওঠে। তার ভাবনা এবং পরিশ্রমেই ভারতে দুগ্ধশিল্পের নয়া বিকাশ ঘটে, যা ‘সাদা বিপ্লব’ বলে পরিচিতি লাভ করে। এ ছাড়া কুরিয়েনের চেষ্টা এবং উদ্যোগেই ভারত বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে প্রতিদিন ২০০টি ডেইরিতে অন্তত ১ কোটি দুগ্ধ খামারি ২ কোটি লিটার দুধ সরবরাহ করেন। সহজ কথায় দুধ বিপ্লবেরই আরেক নাম কুরিয়েন। ‘আমুল’-এর বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ আজ আড়াই শ কোটি টাকা! অথচ তিনি নিজে বলতেন, ‘দুধ একদম খাই না।’ কুরিয়েন বিশ্বাস করতেন, উন্নয়নের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, উন্নয়নের হাতিয়ারকে মানুষের হাতে তুলে দেওয়া।’ আমুলের আজকের এ অর্জন যাকে ঘিরে তিনি প্রতিষ্ঠাতা কুরিয়েন। যিনি দুধ আমদানিকারক দেশ থেকে ভারতকে পরিণত করেছেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুগ্ধসামগ্রী রফতাতানিকারক দেশে। পরে ভোজ্য তেলেও ভারতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন তিনি। কুরিয়েন খেতাব পেয়েছেন ‘সাদা বিপ্লবের জনক’ কিংবা ‘মিল্কম্যান অব ইন্ডিয়া’।

২০০৭ সালে সিনোভ্যাটের জরিপে ভারতের শীর্ষ ব্র্যান্ড হয় আমুল। প্রথম থেকেই ড. কুরিয়েন দু-তিনটি ব্যাপারে মনস্থির করে রেখেছিলেন। এক. গ্রামীণ শিল্পকে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আধুনিক শিল্পের রূপ দেওয়া। দুই. গ্রামের মানুষকে নিয়েই শিল্প গড়ে তোলা এবং তিন. সরকারের ওপর নির্ভরতা থেকে শত হস্ত দূরে থাকা। গান্ধীর রাজ্যে কুরিয়েনের শিল্প-মডেল স্বনির্ভরতার নীতিতেই দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই সাফল্যের রহস্য কী? উৎপাদনের গুণমান তো বটেই, কুরিয়েন নিজেও সবচেয়ে বেশি জোর দিতেন ওটার ওপরেই। সেই সঙ্গে ছিল অনবদ্য প্রচার কৌশল। ‘আমুল’ বিজ্ঞাপনের ৫০ বছর পূর্তির স্মারকগ্রন্থে কুরিয়েন নিজে লিখেছেন, ‘পেছনে তাকিয়ে বুঝি, স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক ছিল!’ কুরিয়েন ছিলেন গোটা ভারতে বহুল পরিচিত ‘শ্বেত বিপ্লবের’ অগ্রপথিক। বদলে দিযয়েছিলেন দুগ্ধ খামারের ব্যবসার ধরন এবং তার সমবায়ের মাধ্যমে ভারতের কঠোরবর্ণ প্রথাকে সমতায় পরিণত করেন, যেখানে সদস্যরা তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সমান সুবিধা ভোগ করতেন। তরল দুধ ছাড়াও বাজারে রয়েছে আমুলের গুঁড়ো দুধ, বাটার, পনির, ঘি, চকোলেট, দধিসহ প্রায় ১৭৩টি পণ্য। ৫০টি সেলস অফিস, ৫ হাজার পাইকার ও ৭ লাখ খুচরা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে পুরো ভারতে রয়েছে আমুলের বিপণন ব্যবস্থা। এ ছাড়া ৪০টি দেশে রফতানি হয় এ ব্র্যান্ডের পণ্য। গ্রাম থেকে শুরু করে রাজ্য পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে দুধ বিক্রিতে তিনটি মডেল অনুস্মরণ করে আমুল। দুধ উৎপাদনকারী এবং ভোক্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন। ফলে বাদ পড়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা। দুধ উৎপাদনকারী কৃষকরাই উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মার্কেটিংয়ের বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। রয়েছে প্রফেশনাল ব্যবস্থাপনাও।

ভারতের দুগ্ধ সমবায়ের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোড (এনডিডিবি) গঠনের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে আমুলের গল্প ছড়িয়ে দিতে কুরিয়েনকে আমন্ত্রণ জানান। এর পরই ‘শ্বেত বিপ্লব’ পরিচিত হয়ে উঠে অপারেশন ফাড হিসাবে। তারও আগে ১৯৪৯ সালের গুজরাত। জেলা, আনন্দ। ছমাসের চুক্তি শেষ। ২৮ বছরের যুবকটি ব্যাগ গুছিয়ে সোজা মুম্বাই রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি। এমন সময় স্থানীয় বাসিন্দা ত্রিভুবনদাস পটেলের অনুরোধ, ‘আর ক’টা দিন থেকে যাওয়া যায় না? আমাদের সমবায়টা তাহলে একটু মজবুত করে নেওয়া যেত!’ ত্রিভুবনদাসের অনুরোধ ফেলতে না পেরে ভার্গিজ কুরিয়েন সেই যে থেকে গেলেন, তার থেকেই জন্ম নিল একটা বিপ্লব। এ দেশের গ্রামীণ সমবায় শিল্পোদ্যোগের ইতিহাসকে ‘আমুল’ বদলে দেওয়ার বিপ্লব যার দৌলতে গুজরাতের গ্রামে ৩২ লাখ মানুষ আর্থিকভাবে স্বনির্ভর, যার দৌলতে ভারত বিশ্বের পয়লা নম্বর দুধ উৎপাদক দেশ। ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যন্ত্র কৌশলের ওপর পড়াশোনা শেষে করে, কুরিয়েন আনন্দের একটি সরকারি ননী তোলার কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন গুজরাট কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন (জিসিএমএমসি) এবং ২০০৬ সালে ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে পদ ছেঁড়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত এটির চেয়ারম্যান ছিলেন। শুরু হয়েছিল মাত্র দু’টি গ্রাম নিয়ে, দিনে ২৪৭ লিটার দুধ আসত। ১৯৫৫ সালের মধ্যে এলাকা যেমন বাড়ল, তেমনই বাড়ল দুধের পরিমাণ। দৈনিক ২০ হাজার লিটার। গরুর দুধে আটকে না থেকে মহিষের দুধকে কাজে লাগানোর পথিকৃৎ কুরিয়েনের সমবায়। কুরিয়েন অনুভব করলেন, এবার একটা ‘ব্র্যান্ডনেম’ দরকার। এদের মধ্য থেকেই একজন বললেন, ‘আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড!’ ১৯৫৫ সালে আত্মপ্রকাশ করল ব্র্যান্ড ‘আমুল’! এই ফেডারেশনটি চালু করে আমুল ব্র্যান্ডÑঅনেকটা সংস্কৃত শব্দ অমূল্য থেকে নামটি নেওয়া, যার অর্থ মূল্যাতীত। মাত্র দুটি গ্রামের সমবায় আর ২৪৭ লিটার দুধ নিয়ে যাত্রা শুরু করে আমুল এখন ২ হাজার কোটি ডলারের একটি ব্র্যান্ড। শুধু দুধই নয় এর পাস্তুরিত ও প্যাকেটজাত করার ক্ষেত্রেও গুণমান রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ছিল সজাগ দৃষ্টি। আমুল ব্র্যান্ডের মধ্যে আছে, শিশুদের গুঁড়ো দুধ, মাখন, পনির, আইসক্রিম, দই এবং এমনকি চকলেটও। ভারতের তিনটি প্রজন্ম আমুল পণ্যের ‘আটারলি বাটারলি ডেলিসিয়াস’ স্লোগানের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে।

চলচ্চিত্রেও সমবায় প্রয়াসের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন কুরিয়েন! তার নেতৃত্বে ‘অপারেশন ফান্ড’-এর চমকপ্রদ কাহিনি নিয়ে শ্যাম বেনেগাল তৈরি করেন বিখ্যাত ছবি, ‘মন্থন’ (১৯৭৬)। গল্পটা লিখতে সাহায্য করেন কুরিয়েন নিজেই। ছবির খরচ জোগান, যাদের নিয়ে গল্প, তারাই। গুজরাত সমবায় প্রকল্পের পাঁচ লাখ দুধ উৎপাদক দুই টাকা করে চাঁদা দিলেন। গিরিশ কারনাড-স্মিতা পাটিলকে নিয়ে তৈরি হলো ‘মন্থন’। পরে ‘আমুলে’র বিজ্ঞাপনেও বেজেছে সেই গান, ‘মেরো গাম কথা পারে ঝা দুধ কি নদিয়া বাহে...।’ অর্ধশতক আগে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে দুধ উৎপাদনকারীদের যে সমবায় গড়ে ওঠে, কালক্রমে আজ তা ভারতের বিশ্বব্র্যান্ড। শুধু দুধের বাজার নয়, দুগ্ধপণ্য উৎপাদনেও ভারতকে শীর্ষ দেশে পরিণত করেছে ‘আমুল’। দেশ ও বিশ্ববাজারে সমাদৃত ভারতের সর্ববৃহৎ এ ফুড ব্র্যান্ড বাণিজ্যিক যাত্রায় ছুঁতে যাচ্ছে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক। বিভিন্ন অঞ্চলে আমুল ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রিকারীদের আয় মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় দুগ্ধপণ্যের এ ব্র্যান্ড এ বছর ২০ হাজার কোটি রুপির (৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি রুপির টার্নওভার। শ্বেত বিপ্লব, অপারেশন ফাড, ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, গুজরাত কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন... আরো যত ধাপই পেরোক না কেন কুরিয়েনের কর্মযজ্ঞ, শুরুটা ওই ‘আমুল’ থেকেই। ‘আমুলে’র সাফল্যে উদ্দীপিত হয়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী উদ্যোগী হলেন ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা এনডিডিবি (১৯৬৫) গড়ার কাজে। কুরিয়েনই তার কর্তধার হলেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৭০ সালে দেশজুড়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ‘অপারেশন ফাড’-এ নামল এনডিডিবি। গুজরাতে অবশ্য ‘আমুল’-মডেল তার আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল। গোটা রাজ্যের দুগ্ধ সমবায়গুলোকে এবার এক ছাতার তলায় আনলেন কুরিয়েন। ১৯৭৩ সালে গড়ে উঠল গুজরাত কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন। আনন্দ-এর চৌহদ্দি ছাড়িয়ে গোটা গুজরাতের প্রতিনিধি হয়ে উঠল ‘আমুল’ সারা ভারতের মুখে স্বাদ জোগানো অদ্বিতীয় ব্র্যান্ড, ‘দ্য টেস্ট অব ইন্ডিয়া!’ বর্তমানে, আমুল প্রতিবেশী বাংলাদেশ, নেপাল, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে ৩৭টি দেশে গুঁড়ো দুধ, মাখন ও পনির রফতানি করে। এ ব্র্যান্ডের সফলতার চাবিকাঠি হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের নির্মূল করা। এর পরিবর্তে সমবায়টি বিক্রি থেকে লব্ধ অর্থের তিন-চতুর্থাংশ উৎপাদনকারীদের দিয়ে দেয়। বাকিটা পুঁজি বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়।

‘শ্বেত বিপ্লবের’ জনক লাখো কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি তার দুগ্ধ সমবায়ের মাধ্যমে কঠোর বর্ণ প্রথাকে সমূলে উৎপাটন করেন। ৯০ বছরে বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ৮ সেপ্টেম্বর ২০১২ রোববার ভোরে গুজরাটের আনন্দে। এই রাখালী শহরটি সুপরিচিত দুগ্ধ ঘাটতির দেশে থেকে ভারতকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে তার নেতৃত্বের জন্য। এই প্রক্রিয়ায় তিনি অগণিত ভারতীয়কে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেন এবং পারিবারিক নামে পরিণত হন। অর্থনীতিবিদ এস.এল.রাও বলেন, ‘চিনি বা বস্ত্র সমবায়ের মতো নয়, কুরিয়েন রাজনীতিবিদদের দূরে রেখে দুগ্ধ সমবায় আন্দোলনকে সুসংহত করেছিলেন। তার ছিল দূরদৃষ্টি, মহান নেতৃত্বের গুণাবলি, সততা, মানব দক্ষতা এবং কঠোর শ্রমের প্রতি খাঁটি মনোবল।’

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

"