নিবন্ধ

আফ্রিকার রাজনীতি ও অর্থনীতি

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

হাসান জাবির

আফ্রিকা মহাদেশ মানুষের আঁতুড়ঘর। বিজ্ঞানীদের মতে, ৫০ থেকে ৮০ লাখ বছর আগে হোমোস্যাপিয়েন্সের উৎপত্তি হয়েছিল এই মহাদেশে। এরপর বিভিন্ন বিবর্তন শেষে আফ্রিকা থেকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষ। পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা আফ্রিকা মহাদেশ সভ্যতার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আয়াতন ও জনসংখ্যায় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ আফ্রিকা নিয়ে প্রচলিত আছে অসংখ্য মিথ। অন্যদিকে ইতিহাসের অনেক বিলুপ্ত সভ্যতার নিদর্শন আছে আফ্রিকা মহাদেশে। বিশেষত, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো মিসরীয় সভ্যতাও অবস্থিত উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসরে। বর্ণবাদের বর্বর ইতিহাস সত্ত্বেও অনুন্নত আফ্রিকা মহাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর আফ্রিকা মহাদেশ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাসের কোনো একসময় অর্থাৎ উনিশ শ শতকের শেষ দিকে মহাদেশটির উল্লেখযোগ্য অংশ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। যদিও গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আফ্রিকায় নবজাগরণ ঘটে। ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে মানুষ। এই ধারাবাহিকতায় সত্তর থেকে আশির দশকের মধ্যেই আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার পরিসমাপ্তি ঘটে। স্বাধীন হয় অনেক দেশ। ফলে সিনাই উপত্যকা দ্বারা এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত আফ্রিকা মহাদেশ বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে একসময় ইউরোপীয় শিল্প-বণিকদের কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্র আফ্রিকা মহাদেশের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ওপর দৃষ্টি দেয় অন্য দেশগুলো। পৃথিবীর মোট ভূ-পৃষ্ঠের ৬ শতাংশ ও মোট স্থলভাগের ২০ শতাংশ নিয়ে গঠিত আফ্রিকা মহাদেশের মোট চুয়ান্নটি দেশেই কিছু না কিছু সম্পদ আছে। এতদসত্ত্বেও মহাদেশটি ব্যাপকভাবে দারিদ্র্যপীড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকা মহাদেশের গুটি কয়েক দেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা অগ্রসর হয়েছে সত্যি। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো নাজুক। কয়েক দশক থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আফ্রিকার গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই সূত্রধরে মোট এক শ কোটি জনসংখ্যার বাসস্থান আফ্রিকা অঞ্চলে বর্হিস্থ শক্তিসমূহের সামরিক কর্মকা-ও সম্প্রসারণশীল। এক ধরনের আধিপত্য বিস্তারে মনোনিবেশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত, ফ্রান্সসহ শক্তিধর দেশসমূহের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য পাচ্ছে আফ্রিকা। অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট মহাদেশটিতে অপ্রচলিত সন্ত্রাসবাদেরও প্রকোপ আছে। উল্লেখ্য, আফ্রিকার ৪৭ শতাংশ মানুষ মুসলিম। এখানকার দ্বিতীয় বৃহৎ ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ শতাংশ। এ ছাড়া এই অঞ্চলে অসংখ্য আদি ধর্ম প্রচলিত আছে। আফ্রিকা মহাদেশ বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য। এই মহাদেশের অনেক শহর আছে যেগুলোতে গভীর রাতে হায়েনার মতো হিংস্র প্রাণীরা বিচরণ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইথিওপিয়ার সারাব শহরের অধিবাসীদের সঙ্গে এই হায়েনাদের আছে সখ্য। মধ্যরাতে সারাব শহরের যত্রতত্র হায়েনারা ঘুরে বেড়ায়। আর তখন স্থানীয় লোকজন এদের খাদ্য সরবরাহ করে নিজেদের ভালোবাসা প্রকাশ করে। যদিও এসব বন্যপ্রাণী আফ্রিকার সম্পদ। মাত্র কয়েক বছর আগে আফ্রিকার সবচেয়ে অগ্রসর দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা বাণিজ্যিকভাবে বন্যপ্রাণী পালনের আইন অনুমোদন করে। আর এতে করে দেশটির অর্থনৈতিক চেহারা গতিশীলতা পায়।

আফ্রিকা মহাদেশের চুয়ান্নটি দেশের রাজনৈতিক সংগঠন আফ্রিকান ইউনিয়ন। মূলত আফ্রিকা ঐক্য সংহতি ও উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে এই প্ল্যাটফরম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু উপনিবেশ-উত্তর কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না আফ্রিকা। পুরো মহাদেশে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ঘাটতি আছে। ফলে মানবাধিকার সূচকে পিছিয়ে আছে তারা। শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে আফ্রিকা অনেক পিছিয়ে। একই সঙ্গে জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আফ্রিকার অবস্থা তথৈবচ। যদিও জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ায় মজুদ আছে প্রচুর জ্বালানি। অন্যদিকে ঘানা পর্যটকদের জন্য খুবই প্রিয় দেশ। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, প্রযুক্তির অপ্রতুলতার কারণে এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না। আর যেটুকু সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে, তা বেশির ভাগই বর্হিস্থ দেশের সহযোগিতায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আফ্রিকায় ফরেইন ইনভেস্টমেন্টের সুনির্দিষ্ট চাহিদা লক্ষ করা যায়।

আজ আফ্রিকার সম্পদের দিকে নজর দিয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। যে কারণে এই বিনিয়োগের সুফল সম্পূর্ণভাবে ভোগ করতে পারছে না আফ্রিকার জনগণ। এ ক্ষেত্রে মহাদেশটির নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তির অভাব আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আফ্রিকা মহাদেশ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে অনেক পরাশক্তি। বিশেষত আফ্রিকায় অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অঞ্চলটির সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্য বিনির্মাণে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। চীন আফ্রিকা ফোরাম, ভারত আফ্রিকা ফোরাম নামে আফ্রিকায় আধিপত্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহাদেশটির বিদ্যুৎ সেক্টরে বিশেষ বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আবার নাইজেরিয়া, কেনিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের অপ্রচলিত সন্ত্রাস দমনে এখানে বিশ্ব শক্তিগুলো ক্রিয়াশীল। উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্তির কারণে আফ্রিকায় অপ্রচলিত সন্ত্রাসের উত্থানরোধ করা বহির্বিশ্বের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বিশ্ব শক্তিগুলো। পাশাপাশি জাতিসংঘ এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

সম্প্রতি আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে। মূলত ওই দুই দেশের সরকার পতনের কারণ ছিল দুর্নীতি। দুটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তারা পদত্যাগ করেন। এই দুই ঘটনা ছাড়াও আফ্রিকা মহাদেশের আরো অনেক ঘটনা প্রমাণ করে, এই মহাদেশে দুর্নীতি একটি গুরুতর সমস্যা। সুতরাং সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে সমাজের বিভিন্ন স্তরে জেঁকে বসা দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করতে হবে। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে।

বিভিন্ন কারণেই গত কয়েক দশক থেকে আফ্রিকা অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে পরাশক্তিগুলো। সম্প্রতি ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রথম সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে চীন। যদিও সংশ্লিষ্ট দেশে আগে থেকেই সামরিক ঘাঁটি আছে আরো কয়েকটি দেশের। অন্যদিকে ভারতও আফ্রিকায় সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। মূলত সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিবৃত্ত করে মানবিক তৎপরতার লক্ষ্যে বিশ্ব শক্তিগুলো সামরিক উপস্থিতির কারণ হিসেবে ধরা হয়। তথাপি আফ্রিকা ঘিরে সম্ভাব্য রণকৌশলে এগিয়ে থাকাই এর মূল লক্ষ্য। তাই আফ্রিকার সম্পদ ঘিরে ভিন্নমাত্রার নতুন এই সমীকরণ দেখা যাছে। যেখানে ঔপনিবেশিক যুগের কর্মকা- প্রতীয়মান হচ্ছে। তাই আফ্রিকার সামনের দিনগুলো কিছুটা উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। এই প্রেক্ষাপটে আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের কতটা পরিবর্তন ঘটবে তা বলা মুশকিল। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, উন্নত আফ্রিকা ইউরোপের অভিবাসী সংকট সংকুচিত করতে পারে। ইউরোপে অভিবাসী সংকট কমিয়ে আনতে সেখানে ইউরোপীয় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে, যা ইউরোপ-আফ্রিকা দুই মহাদেশকেই লাভবান করতে পারে। সুতরাং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে নতুন করে। ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করে, আফ্রিকা ইউরোপ সম্পর্ক দৃঢ় করাই নতুন বিশ্ব পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

লেখক : বিশ্লেষক (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা)

"