পরীক্ষা

পদ্ধতির হঠাৎ পরিবর্তন

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য্য

চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় কর্তৃপক্ষের সব ধরনের পদক্ষেপ মূলত ব্যর্থ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা সব ধরনের পদক্ষেপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক প্রশ্ন পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ফাঁস করেছে। অতীতেও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তবে এ বছরের মতো এত নগ্ন এবং দম্ভ নিয়ে কোনো চক্র প্রশ্ন ফাঁস করেনি। আবার এত ব্যর্থতাও চোখে পড়েনি। বিষয়টি আর কোনো গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। তাই আগে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও এবার তদন্ত কমিটি গঠন এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। মুড়ি মুড়কির মতো প্রশ্ন বিক্রি হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেসব প্রশ্ন কিনতে রীতিমতো হুড়মুড়িয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা এবং এই প্রবণতা খুব স্বাভাবিক। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক এমনকি চিন্তিত খোদ প্রশাসন মহল। যেকোনো মূল্যে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে হবে এ চিন্তাভাবনা সবার মধ্যে। এ বিষয়ে স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজছে প্রশাসন।

প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর স্থায়ী পরামর্শ হিসেবে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটানোর চিন্তাভাবনা চলছে। পরিবর্তন জরুরি কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা মঙ্গলজনক তা বোঝার জন্য আরো একটু সময় দরকার। মূলত আগামীতে দুটি বিষয়ে পরিবর্তন করার চিন্তাভাবনা চলছে। প্রথমত, ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং দ্বিতীয়ত, প্রশ্নপত্র থেকে এমসিকিউ অংশ বাদ দিয়ে পুরো অংশই সৃজনশীল করা। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক আরো কিছু পরিবর্তন বা পরিমার্জনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিভিন্ন সময় আমরা পত্রপত্রিকা থেকে জানতে পেরেছি। কিন্তু এই পরিবর্তন ছাত্রছাত্রীদের ভালো এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভালোর জন্য করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কতটুকু ভালো করবে তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে যেকোনো পদ্ধতি পরিবর্তনের পেছনে যেমন কোনো ইতিবাচক কারণ থাকে, তেমনি অনেক সময় তা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রেও সে রকম কিছু যাতে না হয় তার জন্য আরো একটু সময় এবং গবেষণার দরকার আছে বলেই মনে হয়। হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত সুখকর কোনো ফল বয়ে আনতে পারে না বলেই বহুজনের বিশ্বাস।

মাধ্যমিক পর্যায়ে এমনকি প্রাথমিক পর্যায়েও এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্ন বদলে লিখিত প্রশ্ন করার চিন্তাভাবনা করছে। এটি করার আগে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে, যাদের জন্য এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে তারা এটা নিয়ে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হবে কি না, তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ কোনো সমস্যা সমাধানে পদ্ধতির প্রয়োগ করা হলে তার সুবিধা-অসুবিধা উভয় দিক বিবেচনা করতে হবে। এ কথা সত্যি, যেকোনো পদ্ধতির পরিবর্তন করা হলে তা কিছুটা সমস্যার জন্ম দিতে পারে এবং এটুকু সবাইকে স্বীকার করতে হয়। প্রশ্ন ফাঁস রোধ করার জন্য এমসিকিউ পদ্ধতি তুলে দেওয়ার চিন্তায় যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কারণ চলতি বছর এই এমসিকিউ অংশই বেশি ফাঁস হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে এই অংশটি থেকে দ্রুত সময়ে উত্তর করা সম্ভব। কিন্তু সৃজনশীল অংশ থেকে এত দ্রুত উত্তর সমাধান করা সম্ভব না। ফলে ফাঁস হলেও তার সমাধান বের করে পরীক্ষায় লেখা অনেকটাই দুরহ হয়ে যাবে। তাই ফাঁস হওয়ার ঘটনাও কমে আসার কথা। কিন্তু এটা একটা সম্ভাবনামাত্র। এর প্রয়োগের পরই দেখা যাবে এই পদ্ধতি কতটুকু সফল হয়।

২০১২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অন্তত ৮০টি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় ৬৩টি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে চালু হওয়া এমসিকিউ প্রশ্ন পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব একটু সময় নিয়ে এবং বিশেষজ্ঞদের গভীর পর্যবেক্ষণের পরই হওয়া উচিত। কারণ এই সিদ্ধান্তের পর অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করে এবং কোনোভাবেই ছাত্রছাত্রীদের গিনিপিগ করা উচিত হবে না।

এমসিকিউ অংশের একটা সুবিধা আছে। তা হলো অভীক্ষা মূল্যায়নে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের ক্ষমতা। উত্তরপত্র মূল্যায়নে যতই নির্দিষ্ট মানদ- থাকুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় অনেকেই এই মানদ- অনুসরণ করেন না। চলচি বছর পিইসি পরীক্ষায় উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নে প্রায় ৮০০০০ ছাত্রছাত্রী আবেদন করেছিল। এই বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী মনে করেছে, তাদের উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়নি। এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। এমসিকিউ প্রশ্নে আরো একটা সুবিধা ছিল। বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে অনেক দুর্বল ছাত্রছাত্রী প্রশ্ন লিখতে সমস্যায় ভোগে। এমনকি অনেক শিক্ষকও সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন সঠিকভাবে করতে পারে না। কিন্তু এমসিকিউ প্রশ্নে অনেক দুর্বল ছাত্রছাত্রীই এই এমসিকিউ অংশে ভালো উত্তর করতে পারত। বিষয়টি যাই হোক না কেন, প্রশ্ন ফাঁস জাতির জন্য একটা বড় ক্যানসার হিসেবে দেখা দিয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই ক্যানসার সারাতে হবে। কিন্তু তার জন্য হুটহাট পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন করে ছাত্রছাত্রীরা যেন গিনিপিগ করা না হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

"