নিবন্ধ

উন্নয়নের রোল মডেল

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

যারা একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিল, তারা আজ এ দেশকে উন্নয়নের রোল মডেল মনে করছে। এটা আমাদের জন্য এক বিরাট প্রাপ্তি ও গৌরবের বিষয়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বিষয়টি আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ‘মানুষ যতক্ষণ না মুক্ত, স্বাধীন ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে বাস করতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। স্বাধীন হওয়ার কারণেই বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পরই বাংলাদেশে অনেকগুলো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ২০১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ আয়োজিত ‘দ্য ভিশন অ্যান্ড দ্য জার্নি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আলোচনা সভায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন নোবেল বিজয়ী এই অর্থনীতিবিদ। তার ভাষ্য মতে, বাংলাদেশের যে অর্জন তার জন্য এ দেশের মানুষের গর্ববোধ করা উচিত। স্বাধীনতার ৪০ বছরে দেশের পোশাকশিল্প বিশ্ববাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করেছে। মানবিক উন্নয়ন ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২৫ মিলিয়ন নারীকে ক্ষুদ্রঋণের আওতায় এনেছে এবং অভিবাসীদের পাঠানো মোটা অঙ্কের রেমিট্যান্সের কারণে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে দেশটিতে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষায় দেশের ভূমিকা প্রশংসাযোগ্য- বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ভুক্তভোগী হিসেবে বাংলাদেশের উচিত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়া। কারণ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে দেশটির অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। এ ছাড়া সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ভারতের চেয়েও অনেক এগিয়ে বয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও স্পিকার নারী। ৩৫০ আসনের জাতীয় সংসদের ৬০ জনের বেশি নারী সদস্য রয়েছেন।

যখন বাংলাদেশে এ ধরনের উন্নয়ন ঘটেছে, তখন সন্ত্রাস, ধর্মান্ধতা এবং অব্যাহত সংখ্যালঘু নির্যাতনের কারণে পাকিস্তানের অবস্থান অনেক নিচে নেমে গেছে। প্রায় সবগুলো সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। নারী ও জেন্ডার বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে যে শিক্ষা নেওয়ার আছে, তা হলো কেবল রাষ্ট্রীয় নীতিমালার কারণে নয়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উদ্যোগের কারণেও সে অর্জন হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নে নারীদের মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অনন্য উদাহরণ। আজ থেকে ৪৭ বছর আগে বাংলাদেশের অবস্থা এ রকম ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। খাদ্য উৎপাদন হতো ১ কোটি ১০ লাখ টন। সে খাদ্য দিয়ে দেশের মানুষের তিনবেলা পেটপূর্তি হতো না। খাদ্যের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সে সময় দেশি আউস ও আমনের চাষ হতো বেশি। বিলের নিচু এলাকায় সামান্য পরিমাণ জমিতে হতো বোরো ধানের চাষ। ফলন ছিল খুব কম। বিঘায় তিন থেকে চার মণ। চৈত্র-বৈশাখ মাসে কত লোক মিষ্টি আলু খেয়ে দিন কাটাত তা বলে শেষ করা যাবে না। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে দেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে এক নীরব বিপ্লব হয়েছে। দেশের অক্লান্ত পরিশ্রমী কৃষক, মৎস্যচাষি এবং পোলট্রি ও গো-খামারিরা এ বিপ্লবের নায়ক। এ নীরব বিপ্লবে কৃষি ও প্রাণীবিজ্ঞানীদের নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়।

বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক কাজে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়েছেন। কৃষক শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন। অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন তাদের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা ও সমস্যা-সম্ভাবনা। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ৮৫ শতাংশ মানুষ গ্রাম-বাংলায় বাস করত। জাতীয় আয়ের অর্ধেকের বেশি আসত কৃষি থেকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে প্রাথমিক হিসেবে খাদ্য ঘাটতি ছিল ৩০ লাখ টন। স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেই যেসব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কৃষি খাত পুনর্গঠন ও উন্নয়ন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষি ও কৃষকের কল্যাণে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑ ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ। ১৯৭৩ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত মূল্যে ৪০ হাজার শক্তিচালিত লো-লিফট পাম্প, ২ হাজার ৯০০ গভীর নলকূপ ও তিন হাজার অগভীর নলকূপ স্থাপন। ১৯৭২ সালের মধ্যে অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিনা মূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে ১৬ হাজার টন ধানবীজ, ৪৫৪ টন পাটবীজ ও ১ হাজার ৩৭ টন গমবীজ কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা। পাকিস্তান সরকারের দায়ের করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা হতে কৃষকদের মুক্তি দেওয়া এবং তাদের বকেয়া ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা রহিত করা। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখা হবে না। নিরলসভাবে কাজ করে দেশে কৃষি বিপ্লব করুন।’ তিনি আরো বলতেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’ ২০০৮ সালে বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কৃষি ক্ষেত্রে কতগুলো বাস্তব ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পদক্ষেপগুলো হলো গত নয় বছরে কৃষিকে ভর্তুকি প্রদান ৬০ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। ফসলের প্রতিকূলতাসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল ১৭৯টি নতুন জাত উদ্ভাবন। চার দফা নন-ইউরিয়া সারের দাম হ্রাস করে টিএসপি প্রতি কেজি ২২ টাকা, এমওপি ১৫ টাকা এবং ডিএপি ২৫ টাকা মূল্য নির্ধারণ, ৯ লাখ ৮১ হাজার ১৯৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, ২ কোটি ৫ লাখ ৪৪ হাজার ২০৮ জন কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান। ৯১ লাখ ৯০ হাজার কৃষকের ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, খামার যান্ত্রিকীকরণে ১৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা ভর্তুকি প্রদান এবং ৪৯৯টি এআইসিসি, কৃষি কল সেন্টার, কৃষি কমিউনিটি রেডিও চালু। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয় ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৯২ হাজার টন। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ স্থান ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট ১ কোটি ৬০ লাখ ৪২ হাজার টন সবজি উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। শুধু সবজি ও দানাদার শস্যেই নয়, বাংলাদেশ মাছও মাংস উৎপাদনেও স্বয়সম্পূর্ণতা অর্জন করে। আইলা, সিডর ও মহাসেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের কোনো ধরনের সাহায্য ছাড়াই পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু করে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড়বড় প্রকল্প হাতে নেয়। এ ছাড়া আগামী এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে মহাকাশে। এর ফলে বাংলাদেশ হবে তথ্যপ্রযুক্তি আর বিজ্ঞানে আধুনিক এক রাষ্ট্রব্যবস্থার মডেল। বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত এসব কর্মকা- সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং দেশটিকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করে।

বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ সফলভাবে এমডিজি অর্জন করেছে। বিগত দশকে বাংলাদেশে জিডিপি ছিল গড়ে ছয় ভাগের বেশি, গত বছর অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ১১ ভাগ। ফলে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের হার ২৪ দশমিক ৮ ভাগ এবং হতদরিদ্র মানুষের হার ১১ দশমিক ৯ ভাগে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার এবং মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছরে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। শিক্ষার হার বেড়েছে। কমেছে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার। এসব অর্জন কোনো দিনই সম্ভব হতো না, যদি ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন না হতো।

লেখক : কৃষি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

netairoy18@yahoo.com

"