বিশ্লেষণ

আসল-নকলের দ্বন্দ্ব

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

জোনাকি আসল। এর আলোও আসল। হোক যত ক্ষীণ, যতই ক্ষুদ্র। তার যেটুকু, সেটুকু একান্তই তার, নিজের আলো। সে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, জ্যোতিষ্ক, তারা কিছুই না। নিজের জীবন পূর্ণ করে মিটিমিটি স্বকীয় আলো জ্বালিয়ে ভুবন ভরিয়ে দেয়। তার প্রাণোল্লাস অন্তহীন। চাঁদের মতো সে কারো কাছ থেকে ধার করে এনে আলো জ্বালায় না। সে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সব ঋণমুক্ত। অন্তরের আপন শক্তিতে সে শক্তিমান। আঁধারের সব বাঁধন ছিন্ন করে, সব বিপত্তি উপেক্ষা করে সোনা আলোর উজ্জ্বল কণা জ্বালিয়ে উড়ে। জগতের সব আলোর স্রোতধারায় তার ক্ষীণ আলোকে বিলীন করে আপন করে নিয়েছে সব দীপ্তিমহিমা। আলোকের অবারিত ঝরনাধারায় তার ক্ষুদ্র অবদান তাই এত মহিমাময়। নকল আলো আর দেহজোড়া কলঙ্ক সত্ত্বেও চাঁদের এত কদর? এত আদর সমাদর? কেন? কারণ নিরেট খাঁটি সোনায় অলঙ্কার গড়ানো যায় না। উৎকৃষ্ট এ ধাতুর সঙ্গে নিকৃষ্ট বস্তুর মিশেল তখন জরুরি। আসল সোনার সঙ্গে মেশাতে হয় নকল জিনিস, খাদ। নির্ভেজাল সোনার সঙ্গে ভেজাল খাদের এমন আসর না জমালে অলঙ্কারের বাসর মাটি। আবার সব খাঁটির অর্থ সব সময় খাঁটি নয়। চোয়ানো বা দেশি মদের অপর নামও খাঁটি। যারা এমন খাঁটির খদ্দের প্রকৃত খাঁটির মূল্যমান যা-ই হোক সে খাঁটি তাদের নেশা ধরাবে না নিশ্চিত। বল আসল, ছল নকল। আকৃতি আসল, বিকৃতি নকল। হাত আসল, অজুহাত নকল। সত্য আসল, মিথ্যা নকল। সত্য সুন্দর, মিথ্যা কদাকার।

জল যেমন সত্য। জলোচ্ছ্বাসও সত্য। অকল্যাণ করে বলে তো জলোচ্ছ্বাস মিথ্যা নয়। হ্যাঁ সত্য। না মিথ্যা। আবার সব না-ই নেতিবাচক নয়। সব না-ই মিথ্যা নয়। মিথ্যাকে যখন না বলা হয়, তখন এর চেয়ে চরম সত্য জগতে কিছু নেই। মিথ্যা বন্ধ্যা। তবে সর্বাংশে নিষ্ফলা নয়। মিথ্যাও ফল ফলাতে পারে। সে ফলের নাম পাপ। সে ফল স্বর্গের নিষিদ্ধ ফলের অনুকার। সে ফলে স্বর্গলাভ হয় না; স্বর্গচ্যুতি ঘটায়। যদ্যপি না দেখিবে আপন নয়নে-বিশ্বাস করিও না গুরুর বচনে। প্রবচনের মানে যদি এ হয়, যা দেখা যায় তা-ই বিশ্বাস্য, তা-ই আসল। তাহলে এ কথা সর্বাংশে সত্য নয়। ঈশ্বর নিরাকার। আমরা তাকে দেখতে পাই না। তাই বলে কি আসলেই ঈশ্বর নেই? প্রতিমাকে দেখা যায়। তাই বলে কি তা-ই একমাত্র সত্য? না। ঈশ্বর আসল। প্রতিমা ঈশ্বরের অনুকার। সব দেখাই আসল নয়। দেখার মধ্যে গোলকধাঁধার দৌরাত্ম্য দেখা যায়। সেই দেখাটা তখন নকল। রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে লাইন বরাবর দূরে তাকিয়ে দেখলে মনে হবে সমান্তরাল লাইন দুটোর মধ্যখানের দূরত্ব কমে এসেছে। আসলে কি তাই? না। বাস্তবে তা নয়। তাহলে এই দেখা আসল দেখা নয়। নকল। দৃষ্টিভ্রম। আবার বিস্তীর্ণ মাঠের ওপারে তাকালে মনে হবে আকাশ মাটি ছুঁয়েছে। দিগন্তরেখা সসীমে ধরা পড়েছে। আসলে কি আকাশের সীমানা সেখানেই শেষ? না। এ দেখা আসল নয়; নকল, দৃষ্টি বিভ্রাট, দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তো আর আমার চোখের দেখাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারে না; কারণটাই জানাতে পারে মাত্র। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি সে দেখা কি আসল দেখা? স্বপ্নের কি বাস্তব অবয়ব আছে? নেই। কায়া আছে! না। তাও নেই। তবে এর ছায়া আছে। এ ছায়া আসল মনের নকল ছায়া। সব দেখাই আসল নয়। এই আসল দেখার মধ্যেও নকলের নোক্তা ধরা যায়।

মরু মরীচিকা, আলেয়ার আলো দেখা যায় বটে, তবে তা আসল নয়। মরীচিকা সূর্যের কিরণে চিকচিক জলভ্রান্তি। আলেয়া মিথ্যার ঝিকিমিকি। মায়ার আলো। তারা উভয়েই নকল। বৃথা আশা। ছলনা। আসল সত্যের মতো নির্জলা নির্ভেজাল। নকল জাল, ভেজাল। আসল মৌলিক। নকল কৃত্রিম। মিথ্যার বেসাতিই নকলের কাজ। নকল প্রকৃত রূপ নয়; প্রতিরূপ। মূললিপি নয়, ছায়ালিপি, প্রতিলিপি, অনুলিপি। নকল মূলবস্তু নয়, বিম্ব, প্রতিবিম্ব। মীর মশাররফ হোসেন যখন বলেন, এ সংসার আর্শির নকল, ছায়ার খেলাÑতখন বুঝতে পারি আয়নায় যার ছায়াটা প্রতিবিম্বিত হয়েছে, সেটা মৌলিক; তাই আসল। বিম্বিত ছায়াটা নকল। অনুসরণ আসল; অনুকরণ নকল। টুপি ফেরিওলার দেখাদেখি বানর দলের তাদের মাথার টুপি খুলে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কাজটি ফেরিওলার কাজের অন্ধ-অনুকরণ। অনুকরণ ঘটেছে কাজের; নিমিত্ত বা উদ্দেশ্যের নয়। বানররা নিমিত্ত জানত না। জানলে তারা অনুকরণ নয়; অনুসরণ করত। তাই অনুকরণ নকল, অনুসরণ আসল। অনুকরণ বাহ্যিক, অনুসরণ আদর্শিক। বাহ্যিক আচরণে অন্তর্গত আদর্শের মাহাত্ম্য থাকে না। তাই অনুসরণ উত্তম, অনুকরণ অধম। অনুসরণের চেষ্টায় ব্যর্থতা অন্ধ অনুকরণের সাফল্যের চেয়ে শ্রেয়। অনুসরণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্থির। আমরা প্রায়ই বলতে শুনি তিনি এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। এ কথার মধ্যে যার সুখ্যাতি করা হলো, তার মহত্ত্ব হয়তো উচ্চকিত হলো। কিন্তু যিনি অনুকরণ করলেন তার পাত নিপাত গেল।

অন্ধ অনুকরণে উদার নিমিত্ত নেই, ঐশ্বর্য নেই, মহিমা নেই। বরং অনুসরণে আছে নিমিত্ত, আছে আদর্শিক চর্চা। আছে অনুসরণকারীর মেধা ও সৃজনশীলতার অনুসৃতি। আছে মহিমময়তা। যদি বলা হয়Ñঅনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব তাহলে উভয়েই বরণীয় হতে পারেন এই অর্থে, অনুসৃতিতে থাকে আদর্শিক সৃজনশীলতা, যা অনুকৃতিতে অনুপস্থিত। কারণ তা অন্ধ অনুকরণ। নিমিত্তহীন। পথ দেখে না, গন্তব্য জানে না। তার নিরুদ্দেশ যাত্রা। অন্ধ অনুকরণ সম্ভব। অন্ধ অনুসরণ সম্ভব নয়। নেতাকে যারা অনুসরণ করেন তারা অনুসারী, অনুকারী নয়। অনুকরণ বাহ্যিক, আবয়বিক। অনুসরণ আত্মিক। অনুকরণ উত্তম কাজ নয়। নয় বুদ্ধিগম্য। এটা নিতান্তই ভান, বালসুলভ আচরণ। অনুকরণ সহজ পথে চলে পাঁকে পড়ে। আর অনুসরণ কঠিন পথে চলে। ক্লিষ্টে হলেও গন্তব্যে ধায়। যদি অনুকরণকারী অনুকরণকেও আপন সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হনÑতবে তা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে আসল হয়ে উঠতে পারে। রোমান্টিক কবি শেলির ভাষায়Ñএই অশ্রুপাতের মতো আসল আর কী হতে পারে? আবার রবীন্দ্র কাব্যে ‘অশ্রু এসেছে অশ্রুজল হয়ে। অশ্রু নিজেই যেখানে চোখের জল’ সেখানে বাড়তি জল কী ফল ফলায়? হ্যাঁ। নিশ্চয়ই ফলায়। নইলে শব্দের ভুল ব্যবহার রবীন্দ্রনাথও অশ্রু ঝরাতেন। কবিদের জন্য এমন দোষের দায়মুক্তির ফরমান জারি আছে। তাদের এমন মধুর স্বেচ্ছাচারিতা সর্বগ্রাহ্য। স্বাধীনতার অপব্যবহারের পক্ষে যে পরোয়ানা বা অনুমতিপত্রের সুবিধা তারা আপনা-আপনিই ভোগ করে থাকেন, সেটাকে কাব্যিক অনুজ্ঞাপত্র কিংবা পয়েটিক লাইসেন্স বলা যায়। ময়ূরের পেখম আসল। ময়ূরীর পেখম নকল। কারণ ময়ূরই পেখম মেলে। ময়ূরীর তেমন পাখা নেই। তাই তার পালকপুচ্ছ বিস্তার অসম্ভব। অনেক কবিকেই বলতে শুনি মনময়ূরী পেখম মেলেছে। কিন্তু হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে বললে আমরা পেখম তোলা ময়ূরকেই পাই। সোনা বিত্তের বাহার বাড়ায় বটে, চিত্তের বৈভব, রূপ সুষমা বাড়ায় না।

সূর্য কিরণ জীবন দেয়। জীবিকা দেয়। শস্য দেয় প্রাণ প্রাচুর্য বিলায়। সূর্য থেকে আলো নিয়ে চাঁদ ছড়িয়ে দেয় রুপোলি আলোর স্নিগ্ধতা। নকল বলে এর কদর কিন্তু কম নয়। অবোধ শিশুটির কাছেও তার সমাদরের কমতি নেই। পরাক্রমশালী সূর্য নয়, স্নিগ্ধ চাঁদই তার প্রিয় চাঁদমামা। এ চাঁদই প্রেমিকের ফাঁদ। প্রেমিকের মুখশ্রীর কন্তিরূপ চাঁদের উপমায় উদ্বেল। কখনো উপমেয়, কখনো উপমান, কখনো তুল্য কখনো অতুল্য। জার্মান মহাকবি হাইনরিক হাইনের ভাষ্যটা অনেক মজাদার। যারা কবির রচনাতে নির্ভেজাল অরিজিনালিটি খোঁজে তারা চিবাক মাকড়ের জাল। একমাত্র মাকড়ই তার জালটি তৈরি করে আপন পেটের মাল দিয়ে, ষোলোআনা অরিজিনাল; আমি কিন্তু খেতে ভালোবাসি মধু, যদিও বেশ ভালোভাবেই জানি, মধুভা-ের প্রতিটি ফোঁটা ফুলের কাছ থেকে চোরাই করা মাল। রাজনীতিবিদ আসল; রাজনীতিজীবী নকল। রাজনীতি রাজনীতিজীবীর বৃত্তি। তার পুঁজি। এই পুঁজিই আয়ের উৎস। জীবন ধারণের একমাত্র উপায়। দানাপানির নিতান্ত নিদান। আইন যেমন আইনজীবীর মূলধন। আইনের পাঁজিই তার পুঁজি। কিন্তু রাজনীতিজীবী পরজীবী, সুবর্ণলতার মতো। জনগণের বিত্তরসে তারা প্রতিপালিত। মানুষের আশ্রয়ে তাদের জীবন-জীবিকা। তারা দেয় না, নেয়। খাওয়ায় না, খায়। জনতাকে তোষণের হাতিয়ারে শোষণ করে। বিদ বিদ্যার বরপুত্র। বিদ্বানের সমার্থক। বিদ যখন আদর্শ বিলায়, জীবী তখন বিত্ত ভরে বিষয়ী গোলায়। বিদের পরিতৃপ্তি ত্যাগে। রাজনীতিজীবী ত্যাগের সাগর পাড়ি দেয় না। ভোগের লোভের লাভায় সাঁতরায়। রাজনীতিজীবীর, পরিতৃপ্তি জৈবিক যোগে। রাজনীতিবিদদের হৃৎপি- ও হৃদয়Ñদুই-ই থাকে। আর রাজনীতিজীবীর হৃৎপি- থাকে; হৃদয় থাকে না। যেমন সব জীবিত লোকেরই হৃৎপি- আছে; কিন্তু সব জীবিত লোকেরই হৃদয় থাকে না। এখন আমাদের দরকার সক্রিয় হৃদয়বান রাজনীতিকের।

লেখক : লেখক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

"