মতামত

ভিআইপি তৈরির কারখানা

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

মোহাম্মদ আবু নোমান

বাংলাদেশই একমাত্র দেশ পরপর পাঁচবার দুর্নীতি ব্যাপকতার ধারণার সূচকে শীর্ষে অবস্থান করেছিল। এই শীর্ষ অবস্থানের কারণ হতে গিয়েই কি এ দেশে হয়েছে ভিআইপি তৈরির কারখানা! যে কারখানা এখনো ক্রিয়াশীল রয়েছে পূর্ণোদ্যমে! আমজনতার রক্ত চুসে নিচ্ছে ভিআইপি! স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা স্মারক হিসেবে দেওয়া ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতি করা হয়। আমলাতন্ত্র ও শোষক ছাউনির উচ্চাভিলাষে প্রমাণ হয়েছে, মানুষের অসীম-অনন্ত চাহিদা বা নিজের কু-মানসিকতা তাকে নিয়ে যায় এক অন্ধ জগতে। নৈতিকতার অবক্ষয় কোন পর্যায়ে, তা ক্রেস্ট জালিয়াতির ঘটনা থেকে বোঝা গিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের উত্তরাধিকার। সু-অধিকারী কখনো তার উত্তরাধিকারকে বিক্রি করে না। অথচ এ দেশে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও চেতনাকে বিক্রি করে জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অবশ্য সবার জন্য কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য নয়। সামনে হয়তো ‘ভিআইপি’ সার্টিফিকেট বিক্রি করার সুযোগ হবে!

দেশের সব টাকা যাদের কাছে। বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানি, উল্টোপথে সেই গাড়ি; সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক কিংবা আমেরিকায় চিকিৎসা, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কান্ট্রিগুলোয় অবকাশ; লন্ডনে ফাস্ট, দুবাইয়ে সেকেন্ড, মালয়েশিয়ায় থার্ড হোম, কলকাতায় ঈদের কেনাকাটা। এসব ‘অতিবিশিষ্ট’ জনদের স্ট্যাটাসের সঙ্গে আমাদের রাস্তাঘাট যায় না! কারণ তাদের এসি গাড়িতে বসে থাকতে কষ্ট লাগে! সেদিন হয়তো আর দূরে নয় যখন আমরা শুনবো এ দেশের এসব অতিবিশিষ্ট ভিআইপিরা নিজেদের জন্য আলাদা শহর দাবি করছে!

যাদের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে, উন্নয়ন হয়। এমপি, মন্ত্রী আমলাদের বেতন-ভাতা হয়। তাদের জীবন, যৌবন, উদ্যম সব খরচ হবে যানজটে। মুরগির খাঁচার মতো গাদাগাদি করে, বাদুড়ের মতো ঝুলে। এমনিতেই ভিভিআইপি চলাচলের জন্য প্রতিদিনই ঢাকার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, জরুরি সেবার ছুতায় তার ওপরে আবার আলাদা লেন! এ যেন মরারে কবর থেকে উঠিয়ে আবার পোস্টমর্টেম করার মতো অবস্থা! এ দেশের সাধারণ মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রক্ত পানি করে দেশকে তিল তিল করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর সুবিধার ওপরেও সুবিধা ভোগ করবে কথিত ভিআইপিরা! জনগণের সময়ের মূল্য নেই, তাদের বরাদ্দ শুধু তলার ভাঙা, ধুলা ও ময়লার রাস্তা।

যারা চাকরি চাইতে গেলে ঘুষ চায়, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গাড়ি-বাড়ি চালায়। আমরা শেয়ারবাজারে দিয়েছে, ব্যাংক দিয়েছি, রিজার্ভ দিয়েছি, ত্রাণের টিন, কম্বল দিয়েছি, রিলিফের গম, দুম্বার মাংস সবই দিয়েছি; আজ বেকুব জনতা একটু হুঁশ করে রাস্তা ছেড়ে দিতে পারব না! ফুটপাতে দোকান ও যানবাহনের তীব্র চাপে রাস্তায় যখন প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকে, ফুটপাতে হাঁটতে পারা যায় না দোকানপাটে ভরা থাকায়। ফুটপাতের দোকানিদের খুব ভাব! তারা টাকা দিয়েই ফুটপাত দখল করে এবং ভিআইপি নামধারী চোরদের পকেটে যায় সেই টাকা! যে দেশে বেশির ভাগ মানুষ গরিব, কোটি বেকার, যে দেশে ত্রাণ ও জাকাতের কাপড় নিতে পায়ের নিচে পিষ্ঠে মরে, লাখ লাখ লোক খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়, সে দেশের রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছা ভিআইপি, শ্রমিক নেতা, আয়রোজগারহীন ছাত্রনেতা আর বুদ্ধিজীবীদের জন্য একটু আলাদা লেন করে দিলে এমন কী ক্ষতি?

নির্বোধ গর্দভ বেকুব জনতা যখন শাসক বদলাতে পারে না, শাসকরাই পছন্দমতো জনগণ বানায়Ñসে দেশ তো সীমাহীন ক্ষমতার দাপটে গজিয়ে ওঠা, অবাধ স্বাধীনতা ভোগকারী স্বেচ্ছাচারী ভিআইপিদের জন্যই! একেবাক্যে বলা যায়, ‘বাই দ্য ভিআইপিজ, অব দ্য ভিআইপিজ, ফর দ্য ভিআইপিজ’! যেখানে ভিআইপি তন্ত্রের ছড়াছড়ি সেখানে আর যাই থাকুক স্বতন্ত্র লেনও থাকবে না এটা কি হয়!

আলাদা লেনের প্রস্তাব কোনো বিশেষ মহলকে অসাংবিধানিক ও অনৈতিক সুবিধার উদ্যোগ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য আত্মঘাতী বলেই মনে করেন অনেকেই। সাইকেল আরোহী ছাড়া পৃথিবীর কোথাও ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন আছে বলে আমাদের জানা নেই। আলাদা লেন না করে যানজট কীভাবে কমানো যায় তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

abunoman1972@gmail.com

"