নিবন্ধ

বিজয়ের প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধ

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

আলতাফ হোসেন খান

ত্রিশ লাখ বীর শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে বাংলার বুকে তৈরি হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। জাতীয় স্মৃতিসৌধ আমাদের অহঙ্কার, গৌরব ও স্মৃতিজড়িত মহান শ্রদ্ধার ইতিহাসখ্যাত সৌধ। জাতীয় স্মৃতিসৌধ লাল ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা চারদিক। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী অসংখ্য শহীদের স্মরণে তৈরি বিভিন্ন স্মৃতিসৌধ ও ভাস্কর্যের মধ্যে প্রধানতম সাভারের এই জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধ আপামর জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাভারে নির্মিত এই সৌধ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধ আমাদের অস্তিত্ব আর জাতীয়তাবোধের প্রতীক। আমাদের ইতিহাসের স্মারক। প্রতিবছর স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে জাতীয়ভাবে এই স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু এই জাতীয় স্মৃতিসৌধ শুধু মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি স্মরণের জন্যই নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের আরো ইতিহাস। যে ইতিহাস, যে ঘটনা আমাদের স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে দ্রুত গতিতে এবং স্বল্পসময়ে। আমরা হয়ে উঠেছি অপ্রতিরোধ্য। একটি স্বাধীন দেশের নেশায় বাংলার নারী-পুরুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে, ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। ১৫০ ফুট বা ৪৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটিতে রয়েছে ৭টি ফলক। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর্যায়কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাতটি পর্যায়ের প্রথমটি সূচিত হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। এরপর চুয়ান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অগ্রসর হয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা বিবেচনা করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচনা করে রূপদান করা হয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সৌধটি ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। স্থপতি মইনুল হোসেন সৌধের মূল কাঠামোটি কংক্রিটের এবং কমপ্লেক্সের অন্যান্য স্থাপনা লাল ইটের তৈরি করেন। মূল সৌধের গাম্ভীর্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য এই পার্থক্য। এর দ্বারা রক্তের লাল জমিতে স্বাধীনতার স্বতন্ত্র উন্মেষ নির্দেশ করা হয়েছে। পুরো কমপ্লেক্সে রয়েছে কৃত্রিম জলাশয়, বাগান এবং গণকবর।

১৯৭১-এ সাভারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের এক বড় যুদ্ধ হয়। অনেক মুক্তিযোদ্ধা সে যুদ্ধে শহীদ হন। এই চূড়ান্ত যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় ও পাকিস্তানের পরাজয় নির্ধারিত হয়। এর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সাভার এলাকার গ্রাম থেকে অনেক বাঙালিকে বন্দি করে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়। অসংখ্য গ্রামবাসীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে নিচু জমিতে ফেলে রাখা হয় বা মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়। যুদ্ধের পর এই এলাকায় আবিষ্কৃত হয় বধ্যভূমি ও গণকবর। এই গণকবরগুলো স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সে অবস্থিত। জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামোর সামনেই রয়েছে একটি জলাশয়। এখানে প্রতিফলিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো এবং জাতীয় পতাকা। এই জলাশয়ে ফুটে আছে অসংখ্য শাপলা ফুল। বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ১৯৭২ সালে। সে সময় ২৬ লাখ টাকা খরচ করে ভূমি অধিগ্রহণ ও সড়ক নির্মাণের কাজ করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৭৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কাজ চলে। এ সময় ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা খরচ করে গণকবরের এলাকা, হেলিপ্যাড, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, চত্বর ইত্যাদি নির্মিত হয়। ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয় মূল স্মৃতিসৌধ তৈরির কাজ। ৮৪৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় স্মৃতিসৌধ। এরপর এখানে তৈরি হয় কৃত্রিম লেক, সবুজ বেষ্টনী, ক্যাফেটেরিয়া, রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক এলাকা।

স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক দিয়ে কেউ যখন এ এলাকায় প্রবেশ করেন তখন তিনি প্রথমেই স্মৃতিসৌধটি চোখের সামনে দেখতে পান। যদিও সৌধ পর্যন্ত যেতে হলে তাকে অনেক দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। এই পথের মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো উঁচু-নিচু চত্বর। এই চত্বরগুলো পার হতে হলে তাকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে বেশ কয়েকবার ওঠানামা করতে হয়। তারপর পার হতে হয় বড় একটি কৃত্রিম জলাশয়। জলাশয় পার হওয়ার জন্য রয়েছে সেতু। এই পথের দুপাশে রয়েছে গণকবর। এই প্রতিটি চত্বর ও সিঁড়ি লাল ইটের তৈরি। স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য জাতিকে যে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। তার প্রতীক এই দীর্ঘ হাঁটা পথ। স্বাধীন স্বদেশ পাওয়ার জন্য যে রক্ত দিতে হয়েছে তার প্রতীক লাল ইট। জলাশয় অশ্রুর প্রতীক। আর গণকবর স্মরণ করিয়ে দেয় শহীদদের আত্মদানের ইতিহাস। পুরো এলাকাটি ৩৪ হেক্টর এলাকা নিয়ে নির্মিত। এর চারপাশে আরো ১০ হেক্টর জায়গাজুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের বেষ্টনী। এই সবুজ বেষ্টনী সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের প্রতীক। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিশেষ জাতীয় দিবসে এখানে লাখো জনতার ঢল নামে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের প্রতি নিবেদিত হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি। স্বাধীনতা অর্জনে প্রতিটি রক্তের কণিকায় বাংলার অটুট সাহসী মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক হয়ে যারা এ দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে তাদের প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

"