শিল্প

বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গী

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

লুঙ্গি বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী পোশাক। যদিও বাঙালি মেয়েরা লুঙ্গি পরেন না। তবে বাংলাদেশের উপজাতীয় মহিলারা থামি নামক লুঙ্গির মতো দেখতে এক ধরনের পোশাক পরিধান করেন। বাংলাদেশের লুঙ্গি, মিয়ানমারে লোঙ্গাই, ইয়েমেনে ‘মা আউইস’ নামে পরিচিত। অনেক দেশে সুতা ও জরির কাজ করা লুঙ্গি অনুষ্ঠানে পরা হলেও লুঙ্গি বাংলাদেশি পুরুষদের জন্য নিত্যদিনের অনানুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবে জনপ্রিয়। আধুনিক সভ্যতায়, প্রযুক্তির পরশের পরিবর্তন লেগেছে লুঙ্গির গায়েও। লুঙ্গি নিঃসন্দেহে বাঙালির আভিজাত্যের প্রতীক। লুঙ্গি পরার মধ্যে শুধু আরাম নয়Ñআছে নান্দনিকতা এবং শৈল্পিকতার ছাপ। অনেকের ধারণা, এ যুগের আধুনিক তরুণরা এখন আর লুঙ্গি পরে নাÑ তাই বুঝি লুঙ্গির দিন শেষ হয়ে আসছে। কথাটি মোটেও সত্যি নয়। বরং লুঙ্গির চাহিদা দিনকে দিন বাড়ছেই এবং নিজস্ব ব্র্যান্ডের স্বতন্ত্র পরিচয়ে শুধু দেশে নয় বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের লুঙ্গি। এখন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানের লুঙ্গি বাংলাদেশেই তৈরি হয়।

প্রচলিত আছেÑপুরান ঢাকা ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ ব্যবসায়ীরা দামি লুঙ্গি পরে গদিতে বসার রেওয়াজ ধরে রেখেছেন আজো। লুঙ্গি বাঙালির নিত্য ব্যবহার্য এবং অপরিহার্য এক পোশাক। তবে বাংলাদেশে সাধারণত বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরিধান করা না হলেও নকশা করা, বাটিক বা, সিল্কের তৈরি লুঙ্গিগুলো অনেক সময় ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ের সময় বরকে উপহার দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। আবার অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও অঞ্চলে শিক্ষক এবং ইমামদের লুঙ্গি উপহার দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। তবে এই আধুনিক সময়েও লুঙ্গি বাংলাদেশ, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় সমধিক জনপ্রিয়। গবেষণা পর্যালোচনায় জানা যায়, লুঙ্গির সূচনা হয় দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়–তে। ভারতের তামিলনাড়– রাজ্যের ‘ভেস্তি’ নামক এক ধরনের পোশাক থেকে লুঙ্গির উদ্ভব। সম্পূর্ণ দেশীয় উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে লুঙ্গির চাহিদার প্রায় পুরোটাই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে লুঙ্গির দেশীয় চাহিদা বার্ষিক প্রায় দুই কোটি পিস। তবে রমজান মাসে ঈদের আগে শুধু জাকাতের জন্যই এর চাহিদা অন্য মাসগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একসময় অল্পবিস্তর ও পরোক্ষভাবে লুঙ্গি রফতানি হলেও কয়েক বছর ধরে তা সরাসরি রফতানি করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। লুঙ্গি প্রস্তুত ও রফতানিতে বাংলাদেশ নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ে আগ্রসর হচ্ছে।

সোমালিয়াতে অফিসের সময় বাদে অন্য সময়ে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ সবাই লুঙ্গি পরে থাকেন। তবে সেখানে লুঙ্গির সঙ্গে বেল্টও পরিধান করা হয়। লুঙ্গির প্রচলন আছে জাপানে। উৎসবের পোশাক হিসেবে সেখানে লুঙ্গি পরে। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় লুঙ্গিকে সারং বলা হয়। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো এই দুই দেশে লুঙ্গির ভেতর জামা ইন করে পরা হয়। সোমালিয়ার মতো তারা বেল্টও পরেন। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কায় লুঙ্গির প্রচলন বেশি দেখা গেলেও মালদ্বীপ, আফ্রিকার অনেক দেশ, পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ, ক্যারিবীয় অঞ্চল এমনকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয়ও লুঙ্গি বেশ জনপ্রিয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে লুঙ্গির বেশ প্রচলন আছে। কেরালায় নারী-পুরুষ উভয়েই লুঙ্গি পরেন। এখানে লুঙ্গিকে কিছুটা দরিদ্র পোশাক হিসেব বিবেচনা করা হয়। মিয়ানমারে লুঙ্গিকে লোঙ্গাই ডাকা হয়। লুঙ্গি মিয়ানমারের জাতীয় পোশাক। পুরুষরা এটি ঘরে-বাইরে সর্বত্রই পরে থাকেন। মহিলাদের লুঙ্গি এখানে তামাইন হিসেবে সুপরিচিত। ইয়েমেনে লুঙ্গিকে ডাকা হয় মা’আউস।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, স্বাধীনতার পর একসময় কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর, দোহার, নবাবগঞ্জ ও শ্রীনগরের হস্তচালিত তাঁতের (হ্যান্ডলুম) তৈরি লুঙ্গি প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রচালিত তাঁতে (পাওয়ারলুম) লুঙ্গি তৈরি শুরু হলে উৎপাদন বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বর্তমানে পাবনা, সিরাগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর ও কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যন্ত্রচালিত তাঁতেই চাহিদার অধিকাংশ লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। সুতির চেক ও প্রিন্টের লুঙ্গির পাশাপাশি কারুকাজ করা জ্যাকেট লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে দেশে। লুঙ্গির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বসে সিরাগঞ্জের শাহজাদপুর, নরসিংদীর বাবুরহাট ও টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। এখান থেকেই সারা দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা লুুঙ্গি কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে লুঙ্গির বাজারের। রং ও ডিজাইনে বৈচিত্র্যে লুঙ্গি সবার কাছে আকর্ষণীয়, আরামদায়ক পরিধেয়। একসময় নামে-বেনামে বিক্রি হওয়া লুঙ্গি এখন পরিচিতি পাচ্ছে নিজস্ব ব্র্যান্ডে।

দেশের অন্যতম শাড়ি, লুঙ্গি ও অন্যান্য দেশীয় বস্ত্র কারখানাগুলো নরসিংদীকেন্দ্রিক। তাই এসব বস্ত্র কোম্পানিগুলোর প্রধান শোরুম রয়েছে বাবুরহাটে। একসময় নরসিংদী, কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর, দোহার, নবাবগঞ্জ ও শ্রীনগরের হস্তচালিত তাঁতের তৈরি লুঙ্গি প্রসিদ্ধ ছিল। ১৯৯৮ সালের দিকে যন্ত্রচালিত তাঁতের লুঙ্গি এই শিল্পে নতুন পথ খুলে দেয়। এখন যন্ত্রচালিত তাঁতেই চাহিদার ৯৫ শতাংশ লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। জানা গেছে, ছোট-বড় মিলিয়ে লুঙ্গি উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সহস্রাধিক। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নরসিংদী জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে লুঙ্গি প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার। কথার প্রচলন আছে লুঙ্গি মানেই বাবুরহাটের লুঙ্গি। গুণে-মানে ভালো থাকায় ক্রেতাদের কাছে বাবুরহাটের লুঙ্গির কদর ব্যাপক। তামাই সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার একটি গ্রামের নাম। লুঙ্গি শিল্পের গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে তাঁত। জানা গেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত লুঙ্গির ৬০ শতাংশই এই গ্রামে তৈরি হয়। শোনা যায়, সুদূর অতীতে এখানকার উৎপাদিত এক ধরনের সূক্ষ্ম ও মিহি উরানি চাদরের প্রসিদ্ধি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাবনা জেলার ইতিহাস প্রায় ১০০ বছর আগের তামাইয়ের তাঁতের সংখ্যা ছিল ৫০০টি। বর্তমানে এই সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামটিতে দৈনিক লুঙ্গি উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় এক লাখের মতো। পাকিজা, আমানত শাহ, স্ট্যান্ডার্ড, এটিএম, অনুসন্ধান, স¤্রাট, মেমোরি, ফজর আলী, হিমালয়, পপুলারের মতো বাংলাদেশের যতো নামি লুঙ্গির ব্র্যান্ড রয়েছে, তারা সবাই এ গ্রাম থেকে লুঙ্গি কিনে থাকে। তামাই গ্রামের লুঙ্গি ভারত, ফিলিপাইন, নেপাল, বার্মা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় রফতানি হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তর পাবনাসহ কয়েকটি জেলার তাঁতিদের তৈরি লুঙ্গির সুনাম ও কদর দেশের গ-ি পেড়িয়ে এখন বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন সৌদি আরব, আমেরিকা, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে।

ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার তাঁতে বোনা লুঙ্গির সুনামও দেশজুড়ে। সারা দেশে লুঙ্গির যে কটি হাট রয়েছে, তার মধ্যে জয়পাড়ার লুঙ্গির হাট প্রসিদ্ধ। প্রায় ১০০ বছর আগে তাঁতে বোনা লুঙ্গির গোড়াপত্তন হয়েছিল এখানে। একসময় খুবই জমজমাট ছিল দোহারের জয়পাড়া লুঙ্গির হাট। রুহিতপুরি লুঙ্গি উপমহাদেশে বিখ্যাত। তাঁতের লুঙ্গি বেলকুচি উপজেলার অন্যতম ঐতিহ্য। বিশ্ববাজারে নরসিংদীর লুঙ্গির ব্যাপক কদর ও সমাদর। বাংলাদেশের লুঙ্গির দিকে এখন নজর বিদেশিদেরও। ব্যবসায়ীদের অভিমত, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের লুঙ্গির মান সবচেয়ে ভালো। এ কারণে রফতানিতেও অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। রঙে, ডিজাইনে, গুণগত মানে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লুঙ্গি বিদেশে রফতানি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতানুযায়ী, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি লোকের চাহিদার আলোকে দেশের লুঙ্গির একটি রেডি মার্কেট আছে। বিশ্বের ২৫টি দেশে প্রায় দুই কোটি পিস লুঙ্গি রফতানি করে বছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে বাংলাদেশ।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

Writetomukul36@gmail.com

"